বনহুরও বিলম্ব না করে তাকে অনুসরণ করলো।
ওপাশে লম্বা টানা বারান্দা।
শামস হুসাইন দৌড় দিলো।
বনহুর ওকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলছে। শামস হুসাইন বুঝতে পেরেছে ওর হাত থেকে নিস্তার নেই, তাই সে মরিয়া হয়ে ছুটছে। বারান্দা পার হয়ে ছাদের রেলিং বেয়ে এগুতে শুরু করলো শামস হুসাইন। এবার সে ভাবলো, ও বুঝি তাকে অনুসরণ করতে সক্ষম হবে না।
কিন্তু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই, সেও শামস হুসাইনকে অনুসরণ করে রেলিং বেয়ে এগুতে লাগলো।
শামস হুসাইন একটা পাইপ বেয়ে উঠে গেলো উপরে। বনহুরও সেই পাইপ বেয়ে উপরে উঠে পড়লো। কিন্তু কোথায় শামস হুসাইন! বনহুর এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো।
হঠাৎ বনহুর দেখলো অদূরে উঁচু আর একটি পাইপ বেয়ে শামস হুসাইন তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে।
বনহু মুহূর্ত বিলম্ব না করে ছাদের রেলিং বেয়ে এগুতে লাগলো। একে রাত, তারপর সম্পূর্ণ অজানা, অচেনা জায়গা। ভাগ্যি জ্যোছনা ছিলো, তাই সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো বনহুর। শামস হুসাইন যখন একটি এগারো তলার পাইপ বেয়ে উপরে উঠে চলেছে তখন বনহুর তার রিভলভার উদ্যত করে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে তার মন বললো……না না, ওকে হত্যা করো না, তাহলে হীরাঝিলের গভীর রহস্য উদঘাটন হবে না……বনহুর রিভলভার সহ হাতখানা নামিয়ে নিলো। পরক্ষণেই রিভলভার প্যান্টের পকেটে রেখে তর তর করে পাইপ বেয়ে উপরে উঠে চললো।
শামস হুসাইন একবার তাকিয়ে দেখে নিলো। ততক্ষণে বনহুর অনেকটা পাইপ বেয়ে উঠে এসেছে। বনহুর যখন মাঝামাঝি এসে পৌচেছে তখন শামস হুসাইন এগারো তলার একটি কক্ষে পিছন জানালা দিয়ে প্রবেশ করে।
বনহুর কক্ষটাকে লক্ষ্য রেখে দ্রুত এগুতে লাগলো। কয়েক মিনিটেই এসে পড়ে সেই কক্ষের পিছন জানালাটার পাশে। মুহূর্ত বিলম্ব না করে সেও লাফিয়ে পড়ে জানালা দিয়ে ভিতরে।
বনহুর কক্ষের মেঝেতে লাফিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পায় শামস হুসাইন ওদিকের দেয়ালে একটা সুইচে হাত রাখলো। মাত্র এক সেকেন্ড, বনহুর অনুভব করলো তার পায়ের নিচের মেঝেটা যেন স করে একপাশে সরে গেলো। মুহূর্ত বিলম্ব না করে বনহুর হাতের কাছে একটা রড পেলো সেটা ধরে ফেললো খপ করে। মেঝে থেকে প্রায় দশ হাত নিচে সেই রডখানা ছিলো। বনহুর তাকিয়ে দেখলো, একেবারে এগারো তলার নিচে পাথুরে মেঝে, আর একটু হলেই। এতোক্ষণে তার দেহটা থেতলে একখণ্ড মাংসপিণ্ডে পরিণত হতো।
বাদুড়ের মত ঝুলছে বনহুর, পায়ের নিচে শূন্য, ফাঁকা। কত গজ নিচে যে একতলার মেঝেটা আছে জানে না সে। তবে এটুকু বুঝতে পারছে তার হাত দু’খানা খুলে গেলে আর নিস্তার নেই, মৃত্যু তার হবেই।
হঠাৎ এমন একটা অবস্থায় পড়বে ভাবতে পারেনি বনহুর। শয়তানটাকে হাতেনাতে ধরবে এটাই ছিলো তার উদ্দেশ্য। কিন্তু ব্যাপার ঘটে গেলো সম্পূর্ণ আলাদা।
বাদুড় ঝোলার মত ঝুলছে বনহুর। হঠাৎ তার কানে গেলো অট্টহাসির আওয়াজ! বনহুর মুখ। তুলে তাকালো উপরের দিকে, সঙ্গে সঙ্গে নজরে পড়লো সেই মুখখানা। শামস হুসাইন তার অবস্থা লক্ষ্য করে হাসছে।
রাগে-ক্ষোভে দৃষ্টি নত করে নিলো বনহুর! শূন্য ফাঁকার উপরে ঝুলন্ত অবস্থায় অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে তবু মুখমণ্ডলে তার দৃঢ়তার আভাস।
কানে এলো বনহুরের সেই কণ্ঠ একটু পূর্বে যে কণ্ঠে সে শুনতে পেয়েছিলো হাসির শব্দ। বলছে শামস হুসাইন-কেমন, এবার নিজকে রক্ষা করো। এসেছিলো আমার জান নিতে……কথাটা শেষ করে আবার অট্টহাসি হাসতে শুরু করে।
বনহুর বারবার হাত বদলাচ্ছে। লালে লাল হয়ে উঠেছে তার হাত দুটো।
আবার শামস হুসাইনের বিদ্রূপ ভরা কণ্ঠ-কতক্ষণ ঝুলবে বাছাধন। তোমার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজাটা……কোন একটা সুইচে হাত দিলো শামস হুসাইন। সঙ্গে সঙ্গে লৌহ রডটা দুলতে শুরু করলো।
ভীষণভাবে দুলছে রডটা, বনহুরের হাত দু’খানা ক্রমে শিথিল হয়ে আসছে। সমস্ত দেহ ঘেমে নেয়ে উঠেছে, বারবার অধর দংশন করছে সে।
শামস হুসাইন দাঁতে দাঁত পিষে বললো-এইবার তোমার মৃত্যু। আমি দ্বিতীয় সুই চাপ দিলেই খসে পড়বে রডখানা, সঙ্গে সঙ্গে এগারো তলার নিচে পাথরের মেঝেতে পড়ে তোমার দেহটা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। মৃত্যুর পূর্বে বলো কে তুমি, আর কেনই বা এখানে এসেছিলে?
বনহুরের মুখে কঠিন এক দৃঢ়ভাব ফুটে উঠে, বলে সে-মৃত্যুকে ভয় করে নিজের পরিচয় তোমার মত শয়তানকে জানাবো এমন কু’মনোবৃত্তি আমার নেই।
আচ্ছা! এই মনোবৃত্তি তোমার কোথায় থাকে দেখি……কথাটা বলে শামস হুসাইন পিছনের দেয়ালে একটি সুইচের দিকে হাত বাড়ায়।
সঙ্গে সঙ্গে একখানা ছোরা এসে বিদ্ধ হয় শামস হুসাইনের দক্ষিণ হাতে। শামস হুসাইনের সুইচ অন করা আর হলো না, তীব্র একটা আর্তনাদ করে উঠলো সে।
বনহুর ঝুলন্ত অস্থায় তাকালো শামস হুসাইনের মুখের দিকে। দেখলো শামস হুসাইনের মুখখানা বিকৃত হয়ে উঠেছে, বাম হাত দিয়ে ডান হাতখানা চেপে ধরে আছে শক্ত করে। ডান হাতের মধ্যে বিদ্ধ হয়ে আছে একখানা সূতী ছোরা। ঝর ঝর করে রক্ত ঝরে পড়ছে।
শামস হুসাইন ছোরাখানা খুলে ফেললো তার ডান হাতের কজা থেকে, তারপর বাম হাতখানা বাড়িয়ে দিলো আবার সেই সুইচটার দিকে।
বনহুর বুঝতে পারলো এবার শামস হুসাইনের ইচ্ছা পূর্ণ হবে। আর এক মুহূর্ত, তাহলেই তার দেহটা প্রাণহীন মাংসপিণ্ডে পরিণত হবে। কিন্তু সেই দণ্ডে রহমান কোথা থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো শামস হুসাইনের উপর।
