নাসিমা কোনো কথা বললো না। মাথা নিচু করে বসে রইলো।
বনহুর বাঘাকে লক্ষ্য করে বললো-চল বাঘা, দেখি ওরা কোথায় কি করছে।
বনহুর বাঘাকে সঙ্গে করে বেরিয়ে গেলো।
ওদিকে রহমান, কাওসার আর রামসিং খাবার যোগাড়ে ব্যস্ত। কোথা থেকে এক বস্তা ময়দা জোগাড় করেছে, তাই রুটি তৈরি করছিলো ওরা।
বনহুর হেসে বললো-তোমরা এখানে খাবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ওখানে দেখবে যাও, মস্ত একটা সাপ বেরিয়েছিলো।
সাপ! বললো কাওসার।
হাঁ সাপ কিন্তু সেটাকে হত্যা করেছি, অবশ্য সাপটা হত্যার কৃতিত্ব বাঘার। বাঘা যদি সাপটা দেখে চিৎকার না করতো তা হলে সাপটা আজ নাসিমাকে কামড়ে দিতে তাতে কোনো ভুল নেই।
রহমান বললো-সর্দার, এখানে মিস নাসিমাকে রাখা মোটেই উচিত হবে না, কারণ এ বাড়িটা বহুদিনের পুরানো বাড়ি। নানা রকম বিষাক্ত জীবজন্তু আছে।
হাঁ রহমান, এখানে প্রতিমুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে, কাজেই নাসিমাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়াই ভাল। কিন্তু ওকে কোথায় রাখা যায় ভাবছি। ওকে নিয়েই আমার বড় দুশ্চিন্তা।
নাসিমা আড়াল থেকে বনহুরের কথাগুলো শুনতে পায়। আনন্দে চোখ দুটো তার ছল ছল করে উঠে। ভাবে নাসিমা, তার জন্য মিঃ হাসানের চিন্তার অন্ত নেই। নিশ্চয়ই সে তাকে ভালবাসে।
কিছুক্ষণ পূর্বে মিঃ হাসানের উপর নাসিমার যে রাগ বা অভিমান হয়েছিলো সব মুছে যায়। ফিরে যায় সে নিজের কক্ষে।
*
হীরাঝিল।
নির্জন পাহাড়িয়া জায়গায় সাদা পাথরে তৈরি বিরাট বাড়ি। এ বাড়িটার মধ্যে প্রায় পাঁচশ, কুঠির বা কক্ষ আছে।
বাড়িটার সম্মুখে এক বড় পাহাড়িয়া ঝরনা বয়ে চলেছে। সুন্দর স্বচ্ছ পানি ছোট-বড় পাথর গড়িয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। বাড়িটার আশেপাশে কোনো লোকালয় নেই। চারিদিকে শুধু ছোট-বড় টিলা।
বাড়িটার মাঝখানে একটি বড় ঘর আছে, এটা হীরাঝিলের নাচঘর। হীরাঝিলের মালিক জাফর হুসাইনের অন্তর্ধানের পর এই নাচঘরে কোনো উৎসব হয়নি। জাফর হুসাইন থাকাকালে প্রায়ই এই নাচঘরে নাচ পরিবেশন হতো।
নাচঘর অন্ধকারময়।
শুধু গভীর রাতে এই নাচঘরে করুণ কান্নার আওয়াজ শোনা যায়।
জাফর হুসাইনের অনুচরবর্গ প্রতিরাতে হীরাঝিলের বাঙ্গালী বন্দী নারীদের ধরে এনে এখানে তাদের উপর চালায় নানারকম অকথ্য অত্যাচার।
হীরাঝিলে পাঁচশ, কুঠিরে প্রায় পাঁচ হাজার বাঙ্গালী বন্দী আটক করে রাখা হয়েছে। নারীদের রাখা হয়েছে পৃথক করে। এদের মধ্যে যারা তরুণী তাদের রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ আলাদা।
মাঝে মাঝে গ্রাহক আসে, এই সব তরুণীকে বাছাই করে উচিত মূল্য দিয়ে নিয়ে যায়। যার সৌন্দর্য যত বেশি তার মূল্য তত অধিক। জাফর হুসাইন এ সব তরুণীকে বিনামূল্যে পায়নি, সেও অন্যান্য মহাজনের কাছ থেকে ক্রয় করে নিয়েছিলো।
এখন জাফর হুসাইন না থাকলেও তারা অনুচরগণ আছে, এরাই ব্যবসা চালিয়ে চলেছে। জাফর হুসাইনের প্রধান অনুচর শামস হুসাইন, সেই এখন হীরাঝিলের মালিক।
শামস হুসাইন জাফর হুসাইনের শুধু অনুচরই নয়, তার আত্নীয়ও বটে। কাজেই হীরাঝিলের উপর তার দাবীও আছে।
শামস হুসাইন জাফর হুসাইনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যেমন সে দুষ্ট-শয়তান লম্পট, তেমনি বলিষ্ঠ জোয়ান, ভীষণ শক্তিশালী। প্রতিরাতে সে ইচ্ছামত মেয়েদের বেঁধে নিয়ে আসে এবং তাদের উপর চালায় অত্যাচার।
জাফর হুসাইন না থাকায় তার বেশি সুবিধা হয়ে গেছে। তার খুশিমত কাজ করে, যা মনে হয় তাই করে সে।
অন্যান্য দিনের মত আজও শামস হুসাইন হীরাঝিলের মাঝখানের হলঘরটায় বসে শরাব পান করে চলেছে আর চারপাশে চারজন লোক বসে তাল যুগিয়ে চলেছে।
রাত বেড়ে আসছে। হীরাঝিলের বাতিগুলো নিভে গেলো টপ টপ করে।
শুধু ডিমলাইটগুলো নীলাভো আলো ছাড়াচ্ছে।
শামস হুসাইন ও তার সঙ্গীরা মদের নেশায় বুদ। এমন সময় দু’জন লোক একটি তরুণীকে নিয়ে হাজির হলো। তরুণীর দুবাহু ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে এলো তারা। তরুণীর চুল এলায়িত, বস্তুাঞ্চল ভূতলে লুটোপুটি খাচ্ছে। ভীত আতঙ্কিত মুখমণ্ডল। রীতিমত হাঁপাচ্ছে তরুণীটি।
শামস হুসাইন তরুণীটিকে দেখবামাত্র উঠে দাঁড়ালো। দু’চোখে তার লালসাপূর্ণ ভাব। কুৎসিত শব্দ করে হাত বাড়ালো তরুণীটির দিকে।
ঠিক ঐ মুহূর্তে উদ্যত রিভলভার হাতে শামস হুসাইনের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো জমকালো পোশাকপরা একটি লোক। গম্ভীর কণ্ঠে বলে-খবরদার, ওকে স্পর্শ করো না।
শামস হুসাইন মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালো, তারপর কঠিন কণ্ঠে বললো-কে তুমি?
আমি তোমার আজরাইল।
এ্যা, কি বললে তুমি আজরাইল? কথাটা বলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো শামস হুসাইন। সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লো সে জমকালো পোশাক পরা লোকটার উপর।
শুরু হলো ধস্তাধস্তি।
অন্যান্য যারা শামস হুসাইনের সঙ্গে ছিলো তারা ভীত হয়ে যে যেদিকে পারলো ছুটে পালিয়ে গেলো।
যমকালো পোশাকপরা ব্যক্তি অন্য কেউ নয় স্বয়ং দস্যু বনহুর।
যত শক্তিশালীই হোক শামস হুসাইন, বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠা ওর মুশকিল ছিলো। ইচ্ছা করলে বনহুর ওকে গুলী করে হত্যা করতে পারতো কিন্তু বনহুর তাকে হত্যা করবে না, কারণ হীরাঝিলের চাবিকাঠি রয়েছে শামস হুসাইনের হাতে। বনহুর ওকে জীবিত পাকড়াও করতে চায়। ভীষণ ধস্তাধস্তি চলছে, হঠাৎ একসময় শামস হুসাইন বনহুরের হাত থেকে নিজকে ছাড়িয়ে নিয়ে লাফ দিলো পাশের মুক্ত জানালা দিয়ে বাইরে।
