বিস্ময় ভরা অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠে নাসিমা-কেন?
মিস নাসিমা, আমি বাঙ্গালী হলেও আসলে বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি নয়।
বাংলাদেশ আপনার জন্মভূমি নয়!
না।
তাহলে……
আপনাকে বলেছি আমার জীবন স্বাভাবিক জীবন নয়। আমার জন্ম সভ্যসমাজে হলেও আমি মানুষ হয়েছি অস্বাভাবিক পরিবেশে। গভীর অরণ্যে হিংস্র জীবজন্তুর মধ্যে আমি বড় হয়েছি। অরণ্যের ফল ভক্ষণ করে আমার শরীর পুষ্ট হয়েছে। কাজেই আমি নিজেও অস্বাভাবিক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জন্ম আমার অজানা এক দেশে……
নাসিমা বলে উঠলো-অরণ্যের আলো-বাতাসে বড় হয়েছেন, অরণ্যের জীবজন্তুর সঙ্গে বাস করেছেন মেনে নিলাম কিন্তু সে তো বাংলাদেশেরই কোনো এক অরণ্য……
না।
তবে?
সে এক অজানা দেশ, বাংলাদেশ নয়।
বাংলাদেশ নয়?
না। আপনি হয়তো শুনে থাকবেন কান্দাই বলে কোনো একটা দেশ আছে?
হাঁ, আমি শুনেছি। কান্দাই সে তো বহু দূরদেশ।
সেই কান্দাই-এর কোনো এক অরণ্যে আমার বাসভূমি।
আপনি, আপনি তাহলে……
হাঁ, আমি কান্দাই থেকে এদেশে এসেছি। শত শত বাঙ্গালী ভাই-মা-বোনদের করুণ কান্না আমাকে টেনে এনেছে এদেশে।
আপনি তাহলে বাংলাদেশে যাবেন না?
কাজ শেষ হলে আমাকে আবার জন্মভূমিতে ফিরে যেতে হবে মিস নাসিমা। তাই বলছি। আপনি বাংলাদেশে আপনার পিতার কাছে ফিরে যান।
কিন্তু…
বলুন কি বলতে চান আপনি?
কিন্তু আমার সে ফিরে যাওয়া ব্যর্থ হবে মিঃ হাসান।
কেন?
না না, আমি আর বলতে পারবো না।
জানি আপনি কি বলতে চেয়েও পারছেন না। মিস নাসিমা, আপনি ভুলে যাচ্ছেন আমি একজন ডাকু, একজন দস্যু।
তবু আমি আপনাকে ত্যাগ করতে পারবো না।
জানতাম এ কথাই আপনি বলবেন। মিস নাসিমা, আপনার পিতার অনুরোধ রক্ষার্থে আমি আপনাকে শত্রুর কবল থেকে উদ্ধার করেছি, আপনাকে ভালবেসে নয়।
মিঃ হাসান।
হাঁ মিস নাসিমা, কারণ কর্তব্য আমার কাছে অনেক বড়। আমি আপনার আব্বাকে কথা দিয়েছিলাম, আপনাকে রক্ষা করেছি। যতক্ষণ না আপনাকে আপনার আব্বার কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি ততক্ষণ আমার কর্তব্য বাকি রয়ে গেছে……
না না, আমি আপনাকে ছাড়া বাংলাদেশে ফিরে যাবো না মিঃ হাসান। আপনি কাজ শেষ করুন, আমি ততদিন আপনার জন্য অপেক্ষা করবো। আপনি না গেলে আমি যাবো না।
সেকি! আপনি আপনার আব্বার কাছে ফিরে যেতে চান না মিস নাসিমা?
চাই-কিন্তু আপনাকে সঙ্গে করে।
আপনি শিক্ষিতা তরুণী অথচ……
মিঃ হাসান, আমি যে আপনাকে মনে প্রাণে গ্রহণ করেছি। আপনি ছাড়া আমি কাউকে ভাবতে পারি না। আমার জীবনের চেয়ে আমি আপনাকে বেশি ভালবেসে ফেলেছি মিঃ হাসান।
নাসিমার কথায় বনহুরের মুখমণ্ডল গম্ভীর হলো, কুঞ্চিত করে বললো-আপনি ভুল করেছেন মিস নাসিমা, কারণ আপনার ভালবাসা গ্রহণ করার মত আমার……
নাসিমা বনহুরের পাশে সরে এসে, তার মুখে হাতচাপা দেয়-না না, আপনি এখন কথা বলবেন না, যা আমার মনকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবে। মিঃ হাসান, আজ আমি বড় অসহায়, বড় একা…
বনহুর নীরবে সিগারেট পান করে চলে। দৃষ্টি তার সম্মুখের জানালা দিয়ে চলে গেছে দূরে সীমাহীন আকাশে। নাসিমার কথাগুলো তার হৃদয় স্পর্শ করে কিন্তু সে তো নিরুপায়। নাসিমার মত একটি উচ্চশিক্ষিতা সুন্দরী তরুণী তাকে ভালবাসে, এতে তার আনন্দিত, গর্বিত হওয়ার কথা। তা হয় না বনহুরের, বরং তার মন ব্যথাকাতর হয়ে উঠে। মনে পড়ে শাম্মীর কথা…বেচারী শাম্মী তাকে ভালবেসে প্রাণ দিলো। আবার নাসিমা এসেছে তার প্রেম, তার ভালবাসার কাঙ্গালিনী হয়ে……
নাসিমার বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ-আপনি আমাকে ভালবাসতে পারবেন না-তবে কেন, কেন আমাকে রক্ষা করতে গেলেন?
মিস নাসিমা, আপনি অবুঝ হচ্ছেন কেন? আমি আপনাকে ভালবাসি না, একথা আপনাকে কে বললো?
তবে কেন আমার ভালবাসা আপনি গ্রহণ করতে চান না? কেন আপনি আমাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে চান?
সে কথা আপনাকে পূর্বেই বলেছি। আপনার আব্বা আপনার জন্য প্রতীক্ষা করছেন। যতদিন না আপনি বাংলাদেশে ফিরে যান ততদিন তিনি নিশ্চিন্ত নন।
জানি, আব্বা আমার জন্য অধীর চিত্তে অপেক্ষা করছেন, কিন্তু……কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে আসে নাসিমার, কথা শেষ করতে পারে না সে।
হঠাৎ বাঘা ঘেউ ঘেউ করে উঠে।
বনহুর উঠে গিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে-কিরে, অমন করছিস কেন?
বাঘা তবু ঘেউ ঘেউ শব্দ করে চললো।
বনহুর তাকালো ঐদিকে যেদিকে লক্ষ্য করে বাঘা আওয়াজ করছিলো। বনহুর দেখলো, বিরাট একটা সাপ ফাটলের মধ্য থেকে মাথা বের করে দিচ্ছে। বাঘা সাপটাকে লক্ষ্য করে চিৎকার করছিলো। বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে প্যান্টের পকেট থেকে রিভলভার বের করে সাপটার মাথায় গুলী করলো।
সঙ্গে সঙ্গে সাপটা সম্পূর্ণ বেরিয়ে এলো ফাটলটার ভিতর থেকে। মাথাটা থেতলে গেছে একেবারে। কয়েকবার ওলটপালট করে নীরব হয়ে গেলো সাপটা।
নাসিমার দু’চোখে বিস্ময়।
বনহুর বললো-পোড়োবাড়ি, এখানে অনেক হিংস্র জীব রয়েছে। বাঘা যদি না দেখতে সাপটা পিছন থেকে দংশন করতে আপনাকে।
সেই ভাল হতো মিঃ হাসান।
কেন?
জানি না।
জানেন না। নিজে মরতে চাইছেন অথচ জানেন না কেন মরতে চান? আশ্চর্য……।
বেঁচে থাকার ইচ্ছা আর আমার নেই।
কারণ?
মা-ভাই-বোন সবাইকে হারিয়ে আমার বেঁচে থেকে লাভ কি? আব্বা বৃদ্ধ, ক’দিনই বা বাঁচবেন তিনি।
হু, তা ঠিক তবু আপনাকে বাঁচতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সগ্রামে আপনার মত বহু বোন সর্বস্বহারা হয়েছে, তাই বলে সবাই কি আত্মহুতি দেবে? মিস নাসিমা, আপনি বুদ্ধিমতী শিক্ষিতা, সবই আপনি বোঝেন। আপনাকে আমি আপনার পিতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছি, আপনি এতে অমত করবেন না।
