হ সর্দার, আমি এখনও তাই ভাবছি।
ঐ তো, প্রথম হলো সে জানতে এখানে কেউ আসবে না; আর দ্বিতীয়তঃ হলো সে হিংসাত্নকভাবে চাবিটা নরমুণ্ডে পাশে রেখে সে নিজকে বেশি গর্বিত মনে করেছিলো। কিন্তু মিঃ প্রিন্সের সব আশা, সব স্বপ্ন মুছে দিয়েছি…..হাঃ হাঃ হাঃ-প্রিন্স ভেবেছিলো তার চক্রান্ত, তার শয়তানি চিরস্থায়ী হবে। একটু থেমে বললো বনহুর-রহমান, আরও একটি কথা তোমরা শুনে রাখো; শয়তান মিঃ প্রিন্স যমদূতের বেশে তারই হোটেলে গুলবাগের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মিস শাম্মীকে হত্যা করেছিলো। শুধু হত্যাই করেনি, শাম্মীকে আমি আমার একটি অংগুরি উপহার দিয়েছিলাম; শয়তান সেই অংগুরি তার আংগুল থেকে খুলে নিয়েছিলো। বনহুরের চোখ দুটো আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠলো-প্রিন্সকে হত্যা করে তুমি ভুল করেছিলে রহমান। আমি তার কাছে জেনে নিতে পারলাম না শাম্মীর আংগুলের অংগুরি সে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে। শাম্মী বলেছিলো, আমি কোনদিনই আপনার এ দান আমার কাছ থেকে সরাবো না। কিন্তু……শয়তান যমদূত তার সে আশা পূর্ণ হতে দেয়নি। জানো রহমান, এখানেই কোনো এক গোপনপথ আছে, যে পথে মিঃ প্রিন্সের শয়নকক্ষে প্রবেশ করা যাবে।
রহমান বললো-হ সর্দার, সেই রকমই মনে হচ্ছে। আপনি বলেছিলেন মিঃ প্রিন্সের কক্ষের দেয়ালে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিলো। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ঐ ভূতলকক্ষ থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো এবং এসব কক্ষে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়তো।
বনহুর বললো-ঠিক তাই ছিলো। আমরা মিঃ প্রিন্সের বাসভবনের অতি নিকটে পৌঁছে গেছি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রহমান, এই ধনভাণ্ডারের গোপনপথ আমাদের মানচিত্রে একে রাখতে হবে, কারণ আমরা প্রয়োজনমত এখানে আসবো। এখন চলো যাওয়া যাক।
বনহুর, রহমান, কাওসার আর রামসিং বেরিয়ে এলো ধনভাণ্ডারের মধ্য থেকে। বনহুর পুনরায় তালাবদ্ধ করে দিলো। আবার তারা ফিরে চললো সেই পথে, যে পথে এখানে এসেছিলো।
এবার বাঘা কিছুতেই ফিরে যাবে না, কেমন যেন মুখ ভার করে বসে রইলো।
সবাই মিলে অনেক টানাটানি করলো তবু নীরব বাঘা। এমনকি কাওসার পর্যন্ত পরাজয় বরণ করলো ওকে সঙ্গে নিতে।
যখন কাওসারও হতাশ হয়ে পড়লো তখন বনহুর এগিয়ে এলো, বাঘার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো-বাঘা, যাবি না আমাদের সঙ্গে? ‘
বাঘা নীরব।
বনহুর ওর গলায়-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললো আবার-চল, তুই এখন থেকে আমার সঙ্গে থাকবি। তোকে কোনোদিন তাড়িয়ে দেবো না।
বাঘা বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো, সে যেন তার কথাগুলো বুঝতে পারছিলো। এবার বাঘা বনহুরের হাত চাটতে লাগলো।
বললো বনহুর-কাওসার, বাঘা রাজি হয়ে গেছে, এবার সে যাবে আমাদের সঙ্গে। চলো, রওনা দেওয়া যাক।
বনহুর অগ্রসর হলো।
বাঘা এবার অনুসরণ করলো তাকে।
রহমান হেসে বললো-সর্দার, বাঘা ঠিক আপনার কথা বুঝতে পেরেছে। দেখুন সে আপনাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছে।
বনহুর আবার একটু নত হয়ে বাঘাকে আদর করে নিলো, তারপর বললো-বন্ধু, আমার জীবন রক্ষা করেছে, এখন আমাকে ছেড়ে যাবে! চলো, তুমি আবার আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চল।
*
নাসিমা অবাক হয়ে বনহুরের কথাগুলো শুনছিলো। অদূরে বসে আছে বাঘা, দু’পায়ের মাঝখানে মাথা রেখে পিট পিট করে তাকাচ্ছিলো বনহুর আর নাসিমার দিকে। সে যেন বুঝতে পারছে ওরা তারই কথা নিয়ে আলোচনা করছে।
বনহুর বললো-এবার আমি জীবনরক্ষা পেলাম বাঘার বুদ্ধিবলে, তাতে কোনো ভুল নেই।
নাসিমা সব শুনে বাঘার প্রতি একটা বিপুল প্রীতিভাব নিয়ে তাকালো। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলো সে। বাঘা লেজ নেড়ে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে লাগলো।
বনহুর কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললো-মিস নাসিমা, এখন আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত, কারণ জাফর হুসাইন এবং মিঃ প্রিন্স উভয়েই পরপারে চলে গেছে। বলুন, এবার আপনি কোথায় যেতে চান?
নাসিমার মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে পড়লো, সে কোনো জবাব দিলো না। মাথা নত করে রইলো শুধু।
বনহুর একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে গা এলিয়ে বসলো, তারপর বললো-মিস নাসিমা, আপনি জানেন পাকিস্তান আপনার জন্য মঙ্গলময় স্থান নয়। তাছাড়া আপনার আব্বা বাংলাদেশে পৌঁছেও শান্তি পাচ্ছেন না যতক্ষণ না আপনি তার কাছে পৌঁছেছেন। কাজেই আপনি বাংলাদেশে ফিরে যান।
নাসিমা তাকালো বনহুরের মুখের দিকে, চোখেমুখে একটা ব্যথারুণ ভাব, বললো সে-আপনি যদি বাংলাদেশে ফিরে যাবেন তাহলে আমিও যাবো, নাহলে আমি পালিয়ে বাঁচতে চাই না।
বনহুর নাসিমার কথায় বিস্ময়ভরা চোখে সোজা হয়ে বসলো, বললো-আপনি এসব কি বলছেন মিস নাসিমা?
হাঁ, আমার জীবন আপনি রক্ষা করেছেন, কাজেই আমি আপনার কাছে চিরঋণী। আপনাকে একা ফেলে আমি যেতে পারি না।
হাসলো বনহুর। আবার সে গা এলিয়ে দিয়ে সিগারেট থেকে ধূয়া নির্গত করে চললো।
নাসিমা তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখমণ্ডলের দিকে। দৃষ্টি যেন তার পড়তে চায় না। ভাবছে। সে বনহুরের সেই মুহূর্তগুলোর কথা। তাকে রক্ষার জন্য তার কত না উদ্দীপনা, সে কি সংগ্রাম-শেষ পর্যন্ত জয়ী হলে বনহুর।
নাসিমাকে ভাবতে দেখে বলে বনহুর-মিস নাসিমা, আপনি কি ভাবছেন জানি না কিন্তু আমি যা বলছি তা আপনাকে করতেই হবে। আপনি তো সব জানেন এখানে আমার অনেক কাজ। আছে। তাছাড়া বাংলাদেশে হয়তো আমার আর যাওয়া হয়ে উঠবে না……
