রামসিং-এর এ নামটা বড় পছন্দ হলো, সে বললো-খুব ভাল হবে এ নামটা ওর জন্য।
বনহুর বললো-তোমরা সবাই ওকে বাঘা বলেই ডাকবে।
বনহুর বাঘাকে তুলে নিলো কাঁধে। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।
রহমান বললো-সাবধান সর্দার, দেখবেন ওখানে নতুন কোনো বিপদ ওঁৎ পেতে আছে কিনা।
বনহুর অল্পক্ষণেই বাঘাকে কাঁধে করে ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে উপরে পৌঁছতেই বুঝতে পারলো, যে কক্ষমধ্যে সে এসে পৌঁছেছে ঐ কক্ষটা পৃথিবীর বুকে-ভূগর্ভে নয়।
বনহুর ইংগিত করলো তার অনুচরদের উপরে উঠে আসার জন্য। কুকুরটা তখন বারবার লেজ নেড়ে চলেছে।
অল্পক্ষণেই উঠে এলো তারা।
উপরে এসে সবাই দেখলো, তারা একটি পরিচ্ছন্ন আলোময় কক্ষের মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছে। কক্ষমধ্যে তেমন কোনো আসবাবপত্র নেই। একপাশে কয়েকটা চেয়ার, মাঝে একটি টেবিল।
কুকুরটা কখন যে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা খেয়াল করেনি।
বনহুর বললো-বাঘা কিছু বলতে চায়। ঐ দেখো সে বারবার টেবিলটার দিকে তাকাচ্ছে। বনহুর বাঘার মাথায় হাত রেখে বললো-ওখানে কি আছে বাঘা?
বাঘা যেন বনহুরের কথা বুঝতে পারলো, সে এক লাফে একটা চেয়ারের উপরে চেপে টেবিলটা শুঁকতে লাগলো।
বনহুর ভালভাবে টেবিলটা লক্ষ্য করতেই চমকে উঠলো, দেখলো জমকালো টেবিলটার উপরে চাপ চাপ রক্ত জমাট হয়ে আছে। বাঘা সেই রক্ত শুঁকছে। সবাই অবাক হয়ে দেখলো।
বনহুর বললো-এখানে কাউকে হত্যা করা হয়েছে…….
বনহুরের কথা শেষ হয় না। বাঘা লাফ দিয়ে নিচে নেমে ছুটে গেলো ওপাশে। ওখানে একটা ছোট্ট আলমারী। বাঘা পা দিয়ে আলমারীর দরজা আঁচড়াতে লাগলো।
বনহুর বললো-এর মধ্যে কিছু আছে। রামসিং, রহমান এবং কাওসার সবাই বলে উঠলো-সর্দার, আমাদেরও মনে হচ্ছে ওর মধ্যে কিছু আছে।
বনহুর খুলে ফেললো আলমারীর দরজাটা এক টানে, সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট আওয়াজ করে উঠলো-নরমুণ্ড!
রামসিং, রহমান আর কাওসারের চোখেও বিস্ময় ফুটে উঠলো। তারা দেখলো আলমারীর মধ্যে একটা রেকাবির উপরে একটি নরমুণ্ড রয়েছে।
বনহুর রেকাবিসহ নরমুণ্ডটা বের করে আনলো। সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। এ কি, কাওসারের মাথা!
কাওসার নিজেও অবাক হয়ে গেছে, ঢোক গিলে বললো-সর্দার, একি কাণ্ড!
বাঘা কিন্তু ভীষণভাবে লেজ নাড়ছে।
বনহুর বললো-এই কারণেই বাঘা কাওসারকে এভাবে আপন করে নিতে পেরেছে। বাঘার মনিব ছিলো ঠিক কাওসারের মত একই চেহারার।
রামসিং, রহমান, কাওসার সবাই যেন একেবারে বোবা বনে যায়। কে এই ব্যক্তি ছিলো যার চেহারা কাওসারের সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে। বনহুর নরমুণ্ডটা ভালভাবে লক্ষ্য করে বললো-আজ একে হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে দুদিন পূর্বে।
রেকাবিসহ নরমুণ্ডটা পুনরায় রাখতে যাচ্ছে বনহুর, ঐ সময় হঠাৎ তার নজরে পড়লো নরমুণ্ডটার পাশে একটা চাবি। বনহুর রেকাবিটা রেখে চাবিটা তুলে নিলো হাতে। দেখলো পাশেই দেয়ালে একটি বিরাট তালা ঝুলছে। বনহুর চাবি দিয়ে তালাটা খুলে ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে একটা দরজা বেরিয়ে পড়লো, ওপাশে ছোট্ট একটা কুঠরী। বনহুর ভিতরে প্রবেশ করলো, দু’চোখে তার ধা ধা লেগে গেলো। ছোট্ট কুঠরীটার মধ্যে বহু মূল্যবান মণি-মুক্তা-হীরা থরে থরে সাজানো রয়েছে। রহমান, কাওসার ও রামসিং সবাইকে বনহুর ডেকে বললো-দেখো একটা গোপন কুঠরী, এখানে কত মূল্যবান মণি-মুক্তা-হীরা সাজান রয়েছে।
বনহুরের কথায় সবাই ভিতরে প্রবেশ করলো।
অবাক হয়ে গেলো ওরা।
বনহুর বললো-কাওসার, বাঘা তোমাকে ঠিক পথেই নিয়ে এসেছে। এখন থেকে বাঘা আমার সঙ্গে থাকবে। ও সত্যি বড় বুদ্ধিমান।
কাওসার বলে উঠলো-সর্দার, সব যেন কেমন রহস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।
হাঁ, রহস্যপূর্ণই বটে। কিন্তু এই সবের মূলে ছিলো ঐ গুলবাগের মালিক মিঃ প্রিন্স। এসব তারই চক্রান্ত। আমার মনে হচ্ছে, এই নরমুণ্ড যার তারই এই ধনভাণ্ডার এবং বাঘা তারই ছিলো।
রহমান বললো-বাঘা থাকতে তার মনিবকে কি করে হত্যা করলো ভেবে পাচ্ছি না আমি।
বনহুর গম্ভীর গলায় বললো-নিশ্চয়ই বাঘাকে আটকে রাখা হয়েছিলো এবং তার মনিবকে তারই সম্মুখে হত্যা করা হয়েছিলো।
আপনি কি করে এ কথা জানতে পারলেন সর্দার?
জানতে পারিনি তবে অনুমানে মনে হচ্ছে। বাঘার সম্মুখে মনিবকে হত্যা করা হয়, তারপর তার মাথাটা কেটে নেওয়া হয়। বাঘার মনিবেকে ঐ টেবিলে হত্যা করা হয়েছে তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি-টেবিলে চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে আছে।
হাঁ সর্দার, ঠিকই বলেছেন। কিন্তু মিঃ প্রিন্স তাকে হত্যা করলো কেন? প্রশ্নটা করলো রহমান।
হত্যা করেছে এই মূল্যবান বস্তুগুলোর লোভে।
তবে সে চাবিটা ওভাবে নরমুণ্ডটার পাশে রেখে গেছে কেন? এবারও রহমান জিজ্ঞেস করলো।
মিঃ প্রিন্স জানতো, এই দুর্গম সুড়ঙ্গপথে কেউ এখানে এসে পৌঁছবে না। তা ছাড়া নিচে যে মেশিন চলতে দেখেছিলে, ওটা ছিলো বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী মেশিন। ওটা চালু থাকলে কেউ কোনো সময় এই কক্ষে প্রবেশে সক্ষম হতো না, কারণ এ কক্ষের দেয়ালে ইলেকট্রিক কারেন্ট সংযোগ থাকতো। হাঁ, আরও একটি কথা, এই যে নরমুণ্ড দেখছো এটা নিশ্চয়ই মিঃ প্রিন্সের পরম বন্ধুলোক ছিলো। না হলে মিঃ প্রিন্স তার এই গোপন কুঠরীর সন্ধান পেতো না। যাক, আমরা এবার যে সম্পদ পেলাম এতে পাকিস্তানী বাঙ্গালী উদ্ধার ব্যাপারে আর আমাদের বিশেষ বেগ পেতে হবে না। ও, তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে চাবিটা সে নরমুণ্ডের পাশে কেন রেখে গিয়েছিলো?
