কুকুরটা কাওসারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলো, মনে হলো যেন সে ওর মনিব।
বনহুর সরে এসে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো-এর জন্যই আমার জীবন রক্ষা পেয়েছে।
রহমান বলে উঠলো-হ সর্দার, এই কুকুরটা যদি আমাদের পথের নির্দেশ না দিতো তাহলে আমারা ঠিক সময় পৌঁছতে সক্ষম হতাম না। আশ্চর্য এই কুকুরটার আচরণ।
সত্যি বলেছো রহমান, এ কুকুরটা শুধু আশ্চর্যকর নয়, এ আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ কুকুরটা হঠাৎ কোথা থেকে আবির্ভূত হলো আর তোমাদের সে কেনই বা পথ দেখিয়ে নিয়ে এলো। আরও আশ্চর্য, কাওসারকে সে এবার কোথায় নিয়ে চলেছে কে জানে……
কুকুরটা বনহুরের হাত চাটতে শুরু করেছে। বারবার লেজ নাড়ছে সে, আর সবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছে। কিছু যেন বলতে চায় সে। তবে কাওসারকে যেন সে বেশি খাতির করছে।
বনহুর বললো আবার-এ আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে চায় দেখা যাক।
কুকুর কাওসারকে লক্ষ্য করে একটু শব্দ করলো।
বনহুর বললো-দেখো ও কি যেন বলছে।
কাওসার কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো-চল কোথায় যাবি, আমাদের নিয়ে চল।
কুকুরটা যেন ওর কথা বুঝতে পারলো, চলতে শুরু করলো সে আগে আগে।
বনহুর, রহমান, রামসিং আর কাওসার রওনা দিলো কুকুরটার পিছু পিছু।
সুন্দর সুড়ঙ্গপথ।
সুড়ঙ্গপথটার মাঝে মাঝে শ্বেতপাথর বসানো রয়েছে। তাই পৃথিবীর আলোকরশ্মি সুড়ঙ্গপথটাকে আলোকিত করেছে। পথ চলতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তাদের।
প্রায় কয়েক ঘণ্টা অবিরাম চলার পর কুকুরটা এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালো। পা দিয়ে দেয়াল বেয়ে উঁচুতে উঠতে চেষ্টা করছে।
সবাই বুঝতে না পারলেও বনহুর বুঝতে পারলো-কুকুরটা উঁচুতে কিছু দেখাতে চায়।
বনহুর লক্ষ্য করলো, সত্যি দেয়ালে একটা গোল সুইচ র য়ছে। বনহুর বললো-রহমান, ঐ দেখো একটি গোল সুইচ।
হাঁ সর্দার, একটা সুইচ দেখা যাচ্ছে।
ওটা নিশ্চয়ই কোনো একটা কিছুর সুইচ হবে। কুকুরটা ঐ সুইচ টিপার জন্য ইংগিত করছে। কথাটা বলে বনহুর সুইচে চাপ দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে একটা দরজা বেরিয়ে পড়লো।
কুকুরটা সেই দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। ওপাশে গিয়ে কুকুর বারবার লেজ নেড়ে তাদের ডাকতে লাগলো।
বনহুর বললো-চলো দেখা যাক কি হয়।
সবাই বনহুরকে অনুসরণ করলো।
আবার সেই সুড়ঙ্গপথ।
এগিয়ে চলেছে ওরা কয়েকজন।
ক্রমেই পথটা বেশ স্বচ্ছ হয়ে আসছে। একটা শব্দও শুনতে পাচ্ছে তারা সবাই মিলে। শব্দটা কোনো মেশিন বা যাতাকলের হবে, কারণ অবিরাম ক্যাচ-ক্যাচ শব্দ হচ্ছে।
ওরা সবাই থমকে দাঁড়ালো।
কুকুরটা তাদের থামতে দেখে যেন একটু ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো, কেমন যেন একটা গোঁ গোঁ শব্দ করছে সে।
বনহুর বললো–আমাদের বিরতি দিলে চলবে না, দেখছো না ও কেমন চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
আবার চলতে শুরু করলো ওরা সবাই।
শব্দটা আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
আর বেশিদূর যেতে হলো না, তারা দেখতে পেলো অদূরে একটা কক্ষ, সেই কক্ষমধ্যে কোনো একটা মেশিন অবিরাম কাঁচ-কাঁচ আওয়াজ করে চলেছে। বনহুর বললো-এই মেশিনটারই শব্দ আমরা এতোক্ষণ শুনতে পাচ্ছিলাম।
রহমান বললো-সর্দার, এটা কিসের মেশিন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
রামসিং বললো-এটা বড় রহস্যময় মেশিন দেখছি।
বনহুর এগিয়ে গেলো, ভালভাবে পরীক্ষা করে বললো-এটা কোন বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনকারী মেশিন হবে।
বনহুরের কথা মিথ্যা নয়, ওটা একটি বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনকারী মেশিনই বটে। গভীর মাটির নিচে এই মেশিন বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বনহুর আর বিলম্ব না করে তার সহকারীদের নিয়ে অগ্রসর হলো।
কিন্তু কুকুরটা সম্মুখে না এগিয়ে উপরের দিকে বারবার তাকাতে লাগলো।
বনহুর বুঝতে পারলো সে ওখানে কিছু দেখাতে চায়। বললো বনহুর-রহমান, তোমরা উপর দিকে তাকিয়ে দেখো কিছু দেখা যায় কিনা।
রহমান, রামসিং আর কাওসার ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখতে লাগলো।
বনহুর নিজেও দেখতে লাগলো মনোযোগ সহকারে। হঠাৎ আনন্দধ্বনি করে উঠলো সে-ঐ দেখো একটা ছিদ্রপথ।
রহমানও বললো-হ সর্দার, ঐ ছিদ্রপথে আলোকরশ্মি দেখা যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
রামসিং এবং কাওসারও তাকিয়ে দেখলো। সবার চোখেমুখে আনন্দদীপ্ত ভাব ছড়িয়ে পড়লো। বনহুর অল্পক্ষণ চেষ্টা করেই ছিদ্রপথটা কি বুঝতে পারলো। ওপাশে প্রচুর পৃথিবীর আলো রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বনহুর বললো-রহমান, ঐ ছিদ্রপথটা বড় করবার কোনো কায়দা আছে নিশ্চয়ই। দাঁড়াও, আমি মেশিনটা পরীক্ষা করে বুঝতে পারবো।
বনহুর কথাটা বলে পুনরায় ফিরে গেলো সেই মেশিনটার পাশে। রহমান, রামসিংও গেলো তার সঙ্গে। বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষা করার পর একটা সুইচ দৃষ্টিগোচর হলো তার। বনহুর কৌশলে সুইচটা অফ করে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে মেশিনটা বন্ধ হয়ে গেলো। সবাই বিস্ময় নিয়ে দেখলো ঐ ছিদ্রপথটা ধীরে ধীরে প্রশস্ত হয়ে যাচ্ছে। আরো একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো-ঐ ছিদ্রপথে নেমে এলো একটি ঝুলন্ত সিঁড়ি।
বনহুর আনন্দধ্বনি করে উঠলো এবং ছোট্ট শিশুর মত জড়িয়ে ধরলো কুকুরটাকে। তারপর বললো-রহমান, আর বিলম্ব নয়, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতে হবে। কিন্তু তার পূর্বে আমাদের বন্ধু কুকুরটাকে তুলে নিতে হবে।
হা সর্দার, ওকে ছেড়ে আমরা উপরে যাবো না। বললো কাওসার।
বনহুর বললো-এর একটা নাম দেওয়া দরকার। আমরা একে ‘বাঘা’ বলে ডাকবো।
