বনহুর চিন্তিত কণ্ঠে বললো-আশ্চর্য বটে!
রামসিং বললো-সর্দার, চলুন আমরা সুড়ঙ্গ মধ্য থেকে বেরিয়ে কাওসারের সন্ধান করি।
ঠিক ঐ মুহূর্তে একটা শব্দ ভেসে এলো, মনে হচ্ছে কুকুরের গলার আওয়াজ।
রহমান বলে উঠলো-সর্দার, কুকুরের গলার আওয়াজ পাচ্ছি।
হাঁ, ঐ রকমই মনে হচ্ছে। বললো বনহুর।
রামসিং বললো-মনে হচ্ছে এ সেই কুকুরের কন্ঠস্বর।
হাঁ, তাই হবে। চলো আমরা শব্দ লক্ষ্য করে চলি। বনহুর এগুলো।
রহমান আর রামসিং তাকে অনুসরণ করলো।
শব্দটা কোন্দিক থেকে আসছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না তবু এগুচ্ছে তারা। কিছুদূর এগুতেই সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ দেখতে পেলো। কিন্তু এখনও কুকুরের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে আওয়াজটা।
বনহুর বললো-নিশ্চয়ই আরও কোনো পথ আছে। সুড়ঙ্গপথের এটাই শেষ নয়। বনহুর সুড়ঙ্গমধ্যে সন্ধান করে দেখতে লাগলো।
হঠাৎ এক জায়গায় একটি শিকল ঝুলছে দেখতে পেলো বনহুর। রহমান আর রামসিংকেও দেখালো। বনহুর বললো-এই যে শিকল ঝুলছে এটা কি পরীক্ষা করে দেখতে চাই। এতে বিপদও আসতে পারে, মৃত্যুও ঘটতে পারে……
বনহুর শিকল ধরে জোরে টান দিলে সঙ্গে সঙ্গে একটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো। একটা সুন্দর দরজা বেরিয়ে এলো। এবার কুকুরের গলার আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
বনহুরের চোখ দুটো আনন্দে দীপ্ত হয়ে উঠলো, বললো-এবার আমি পথের খোঁজ পেয়েছি।
তোমরা এসো আমার সঙ্গে।
বনহুর সেই ঝুলন্ত শিকল বেয়ে উপরে উঠে গেলো। উপরে উঠে হাত বাড়ালো রহমানের দিকে। রহমান বনহুরের হাত ধরে উপরে এলে, পুনরায় রামসিংকে তুলে নিলো বনহুর। –
সুন্দর আর একটি সুড়ঙ্গপথ।
এখানে তেমন অন্ধকার নেই, বেশ স্বচ্ছ আলো আসছে পৃথিবী থেকে। বনহুর বললো-এ পথ কোথায় গেছে কে জানে!
কুকুরের কণ্ঠস্বর আর শোনা যাচ্ছে না।
বনহুর, রহমান আর রামসিংচারদিকে লক্ষ্য রেখে এগুচ্ছে। সুড়ঙ্গ পথটা বেশ প্রশস্ত, কাজেই দাঁড়িয়ে চলতে পারছে তারা।
রহমান বললো-সর্দার, আবার কোনো বিপদ আসবে বলা যায় না।
হাঁ, ঠিকই বলেছো রহমান, প্রতি মুহূর্তে আমাদের বিপদ আসতে পারে। তোমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকবে। ..
সর্দার, মৃত্যুভয়ে আমরা ভীত নই। শুধু আশংকা আপনার জন্য।
রহমানের কথা শুনে হাসলো বনহুর।
কিছুক্ষণ চলার পর একটা ঘড় ঘড় শব্দ কানে এলো তাদের। এটা কিসের শব্দ তারা বুঝতে পারলো না। বনহুর বললো-চুপ, খুব ধীরে ধীরে চলো তোমরা।
বনহুরের কথামত খুব আস্তে আস্তে এগুতে লাগলো রহমান আর রামসিং।
ক্রমেই যেন স্বচ্ছ আলো মুছে গিয়ে ঝাপসা অন্ধকার লাগছে। আরও কিছুটা এগুতেই দেখতে পেলো তারা, এখানে এসে সুড়ঙ্গ মুখ সোজা নিচের দিকে নেমে গেছে। এখানে আলোটা তেমন স্পষ্ট নয়; কেমন যেন একটা ঝাপসা ভাব।
বনহুর বললো-শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গে সম্মুখে তাকিয়ে দেখলো, অদূরে একটি লোক বসে আছে, পাশে বসে একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে। তারই নাক থেকে একটা ঘড় ঘড় আওয়াজ বের হচ্ছে।
রহমান আর রামসিং বলে উঠলো-ঐ সেই কুকুর।
বনহুর বললো-আর যে লোকটা দেখতে পাচ্ছো ঐ সেই কাওসার।
রহমান বলে উঠলো-সর্দার, তাই মনে হচ্ছে।
রামসিং আনন্দধ্বনি করে উঠলো-কাওসার!
কুকুরটার কানেই শব্দটা আগে এসে পৌঁছে। সে হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করে উঠলো ভীষণভাবে।
কাওসার ছুটে আসে-সর্দার, আপনারা এসে গেছেন…বেঁচে আছেন……
বনহুর বললো-হা কাওসার, বেঁচে আছি। তারপর, তুমি কি করে এখানে এলে?
সর্দার, সে এক আশ্চর্য কাহিনী।
সংক্ষেপে বলো-বললো বনহুর।
কাওসার বললো-রামসিং আর রহমান সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছি ঠিক ঐ সময় কুকুর আমার কাপড় কামড়ে ধরলো। আমাকে কিছুতেই সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করতে দিলো না।
তারপর? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো বনহুর।
রহমান ও রামসিং-এর চোখেমুখেও বিস্ময়। ওরা শুনছে আশ্চর্য হয়ে সব কথা।
কাওসার বললো-আমি কুকুরটার সঙ্গে সরে এলাম সুড়ঙ্গ মুখ থেকে কুকুর আমার কাপড় ধরে টেনে নিয়ে চলেছে। একটা ঝোঁপের পাশে গিয়ে কুকুর আমার কাপড়টা ছেড়ে দিলো। তারপর একটা গাছের গুঁড়ির পাশে গিয়ে পা দিয়ে আচড়াতে লাগলো। আমি গাছের গুঁড়িটার নিকটে গিয়ে ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখছি হঠাৎ নজরে পড়লো একটা গর্ত। গর্তটা গাছের ঠিক কোটর বলে মনে হলেও সেটা কোটর নয়-একটা সুড়ঙ্গমুখ।
তারপর কি করলে তুমি? বললো বনহুর।
কাওসার বলে চলেছে-আমি সেই সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করলাম। হাঁ আর একটা কথা, আমি সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করার পূর্বেই কুকুরটা প্রবেশ করেছিলো; কাজেই আমি মনে নানা দ্বন্দ্ব নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। তারপর দেখতে পেলাম সুন্দর একটা পথ। সেই পথে কুকুরটা আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললল। চলেছি তো চলেছি-কতদূর এগুনোর পর আমার পা যেন অবশ হয়ে এলো বিশেষ করে আপনার জন্য মনটা আমার অস্থির হয়ে উঠলো; আর এগুতে পারলাম না, বসে পড়লাম। কুকুরটাও বসে পড়লো, হয়তো ও বুঝতে পারলে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। একসময় আমার চোখ দুটো আপনা আপনি বন্ধ হয়ে এলো, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই। হঠাৎ রামসিং-এর গলায় আমার নাম শুনে জেগে উঠে দেখি সর্দার আপনি….
বনহুর ফিরে তাকালো কুকুরটার দিকে।
কুকরটা সাধারণ কুকুর নয়-বিরাট দেহ; চোখ দুটোতে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। মস্তবড় মুখটার মধ্যে বড় বড় ঝকঝকে ধরালো দাঁত। জিভটা সরু অথচ লাল টকটকে, বেরিয়ে এসেছে মুখের ভিতর থেকে বাইরে। বনহুর ওর দিকে তাকাতেই লেজ নাড়তে লাগলো, যেন সে কত পরিচিত।
