বনহুর বলে উঠলো-কুকুর।
হাঁ সর্দার আমরা যখন এগিয়ে চলেছি তখন হঠাৎ কোথা থেকে একটি বিরাট কুকুর এসে হাজির হলো। কুকুরটা প্রথমে আমাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে লেজ আর মুখ নাড়তে লাগলো। কিছু বুঝতে না পেরে আমরা কুকুরটাকে তাড়িয়ে দিতে গেলাম; কিন্তু কুকর কিছুতেই চলে গেলো না। সে আমাদের আগে আগে এগিয়ে চললো।
তারপর?
সর্দার, যে পথে কুকুর এগুতে লাগলো আমরাও সেই পথ অনুসরণ করলাম। আমরা বুঝতে পারলাম কুকুরটা আমাদের কিছু বলতে চায় বা এমন কোথাও নিয়ে যেতে চায় যেখানে গেলে আমরা উপকৃত হবে। কুকুটাকে অনুসরণ করে আমরা চলেছি। মনোভাব দেখি কুকুরটা আমাদের, কোথায় নিয়ে যেতে চায়।
হাঁ, তারপর?
তারপর ঠিক এই চালাঘরের পিছনে এসে থামলো কুকুরটা। পা দিয়ে সে মাটি আঁচড়াতে লাগলো। অবাক হয়ে দেখলাম সেখানে একটা ঢাকনা রয়েছে। রামসিং এবং আমি ঢাকনাটা তুলে ফেললাম। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলো একটি সুড়ঙ্গমুখ।
হু, বলো তারপর? বললো বনহুর, চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে।
রহমান বলে চললো-আমরা সেই সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করলাম। তখন আমরা ভুলে গেলাম ভয়-ভীতি সব কিছু। কিছুদুর এগুতেই আমরা শুনতে পেলাম মানুষের কণ্ঠস্বর। আমরা তখন দ্রুত এগুলাম, অল্পক্ষণেই আমরা ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেলাম। সম্মুখে তাকিয়ে দেখি সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য। নরশয়তান যমদূত উদ্যত ছোরা হাতে আপনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে। আমি মুহূর্ত বিলম্ব না করে আমার কোমরের বেল্ট থেকে ছোরাখানা খুলে নিয়ে যমদূতের পিঠ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলাম। সর্দার, তারপরের ঘটনা তো সব জানেন।
বনহুর বলে উঠলো–রহমান, তুমি ঠিক সময় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলে বলে আমার জীবন রক্ষা পেলো; না হলে আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হতো তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সে কুকুরটা গেলো কোথায় তাতে বললে না?
সর্দার, আমরা সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করার সময় কুকুরটার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম। এখন স্মরণ হচ্ছে কুকুরটার কথা। সর্দার, কুকুরটা গেলো কোথায় তাতো জানি না।
রামসিং আর বনহুর চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলো কিন্তু কোথাও কুকুরটিকে দেখতে পেলো না। রামসিং বললো এবার-সর্দার, দুটো লোক আমাদের বাধা দিয়েছিলো।
রহমান বলে উঠলো-হা সর্দার, সে কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, আমরা যখন সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করেছি তখন দুজন বলিষ্ঠ লোক আমাদের পথে বাধা দেয়। আমরা দুজন তাদের হত্যা করেছি।
বনহুর বলে উঠলো-সে লাশ দুটো কোথায়?
সেই সুড়ঙ্গমধ্যে পড়ে আছে। বললো রামসিং।
বনহুর বললো-চলো, আমি সুড়ঙ্গপথটা একবার দেখতে চাই। কিন্তু তার পূর্বে আমি পরীক্ষা করে দেখতে চাই চালাঘরটার দরজা। এতো ধাক্কার পরও কেন বাইরে থেকে ভোলা যায়নি বা ভেঙ্গে পড়েনি।
হ সর্দার, আমাদের মনেও এটা বড় নাড়া দিচ্ছে।
চলো, আগে ঘরের দরজাটা পরীক্ষা করে দেখি। বনহুর কথাটা বলে অগ্রসর হলো।
রামসিং আর রহমান তাকে অনুসরণ করলো। চালাঘরের ভিতরে প্রবেশ করেই বনহুর দরজা পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো। হঠাৎ বনহুর হেসে উঠলো। তারপর বললো-এই দেখো…বনহুর পা দিয়ে দরজার ওপাশে একটা চাকতির উপর চাপ দিতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেলো এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা লৌহপাত উঠে এলো নিচের দিক থেকে। বাইরে থেকে সে পাতখানা দেখা না গেলেও দরজার ভিতর অংশ মজবুতভাবে আটকে গেলো।
বনহুর বললো-এ জন্যই আমরা বাইরে থেকে দরজাটা কিছুতেই খুলতে পারিনি বা ভাঙ্গতে সক্ষম হইনি। পুনরায় বনহুর দরজার পাশে দ্বিতীয় চাকতির উপর চাপ দিলো; সঙ্গে সঙ্গে দরজার সম্মুখভাগ থেকে লৌহ পাতখানা স করে নিচে চলে গেলো। এবার বনহুর, রহমান আর রামসিং বেরিয়ে এলো বাইরে।
রহমান বললো-সর্দার, আমরা এবার সুড়ঙ্গমধ্যে ভাল করে দেখতে চাই, কারণ তখন আমাদের কোনো দিকে দেখার বা তাকাবার সময় ছিলো না।
বনহুর বললো-ঠিক বলেছো চলো।
ওরা সবাই মিলে চালাঘরখানার পিছনে গেলো। সেই সুড়ঙ্গ মুখ, ঢাকনাটা ভোলা অবস্থায় রয়েছে। এবার বনহুর প্রথমে প্রবেশ করলো, পরে রহমানও রামসিং সুড়ঙ্গমধ্যে ঢুকে পড়লো।
অল্প এগুতেই দেখলো পাশাপাশি পড়ে আছে দুটো মৃতদেহ। বনহুর দেখামাত্র চিনতে পারলো এই লোক দুজনই সেই লোক, যারা তাকে পাহারা দিয়ে রেখেছিলো। বললো বনহুর-এ দু’টাকে খতম করে ভালই করেছে তোমরা।
বনহুর, রহমান, রামসিং এরা তিনজন সুড়ঙ্গপথে এগুচ্ছে। লক্ষ্য করে দেখছে চারিদিক।
রহমান বললো-সর্দার, একটা কথা এখনও আপনাকে বলা হয়নি।
রামসিংও মাথা চুলকাতে লাগলো।
বনহুর বললো-কি কথা বলো?
রহমান বললো-সর্দার, আমরা যখন সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করেছিলাম তখন পিছনে তাকিয়ে দেখি কাওসার নেই।
কাওসার!
হাঁ, সেও আমাদের সঙ্গে আসছিলো।
সে কথা এতক্ষণ বলোনি কেন?
বলিনি আপনি ব্যস্ত হয়ে পড়বেন।
তোমরা ঠিক বলছো; কাওসার এসেছিলো তোমাদের সঙ্গে?
হ সর্দার।
তাহলে সে গেলো কোথায়?
আমরা সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করার পর ভেবেছিলাম সেও আমাদের সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। একটু পরই আমরা বুঝতে পারলাম কাওসার আমাদের সঙ্গে নেই কিন্তু তার সন্ধান করার পূর্বেই শুনতে পেলাম আপনার কণ্ঠস্বর। আমরা ভুলে গেলাম তার কথা। দ্রুত এগিয়ে গেলাম সম্মুখে তারপর দেখলাম আপনাকে। সর্দার, কাওসার গেলো কোথায় আর কুকুরটাই বা গেলো কোথা!
