যে পুরস্কার তুমি আমাকে দিয়েছে তা আমার জীবনে চরম পুরস্কার।
বনহুর হেসে বলে–তাই নাকি? মা-ডাক শুনার জন্য………
নূরী বনহুরের মুখে হাত চাপা দেয় লজ্জায় রাঙা হয়ে তার মুখমণ্ডল।
হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে চমকে উঠে বনহুর আর নূরী। যমদূতের মত বীভৎস চেহারা একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার দেহটা পুড়ে এবড়ো থেবড়ো হয়ে গেছে একেবারে। চিনতে বাকী রইলো না যমদূতটা অন্য কেহ নয় নাইট-ক্লাবের সেই নর-শয়তান শ্যামসিং। হাতে তার সূতীক্ষ্ণ ধার একখানা ছোরা চক্ চক্ করছে।
বনহুর নূরীকে সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়, চোখ দুটো তার তীব্রভাবে জ্বলে উঠে।
[পরবর্তী বই পাতালপুরিতে দস্যু বনহুর]
বনহুর প্রচণ্ড এক ঝটকায় যমদূত ও বলিষ্ঠ লোক দু’টির হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিলো; তারপর সরে দাঁড়ালো দ্রুতগতিতে।
বৃদ্ধা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো ভূতলে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের ছোরাখানা বিদ্ধ হলো বৃদ্ধার তলপেটে। একটা বিকট আর্তনাদ করে উঠলো সে। সেকি ভীষণ চিৎকার ধ্বনি! কানে তালা লেগে গেলো যেন সবার। ভূতলে পড়ে বৃদ্ধা ছটফট করতে লাগলো। রাঙা হয়ে উঠলো মেঝেটা। খানিকক্ষণ ছটফট করার পর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নীরব হয়ে গেলো ওর দেহটা।
বৃদ্ধার জীবনবায়ু হাওয়ায় মিশে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সেই বলিষ্ঠ লোক দুজন ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো; একটিবার তারা ফিরেও তাকালো না।
ওপাশে পড়ে আছে সদ্য হত্যা করা একটি মৃতদেহ। বৃদ্ধা তার রক্ত পান করেছে শুধু, মাংস ভক্ষণ করার সুযোগ সে পায় নি। বনহুর একবার বৃদ্ধার মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে ফিরে তাকালো সাদা আলখেল্লায় ঢাকা যমদূতের দিকে।
যমদূত মুহূর্ত বিলম্ব না করে বৃদ্ধার দেহ থেকে ছোরাখানা তুলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো বনহুরের উপর। ঠিক ঐ দণ্ডে একখানা ছোরা এসে বিদ্ধ হলো যমদূতের পিঠে। বনহুরের বুকে ছোরা বসিয়ে দেবার সুযোগ পেলো না যমদূত। আর্তনাদ করে ছোরা হাতেই ঢলে পড়লো বৃদ্ধার পাশে।
বনহুর ফিরে তাকালো, এ ছোরা এলো কোথা থেকে! তাকাবার সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখ দুটো আনন্দে দীপ্ত হয়ে উঠলো-রহমান আর রামসিংকে দেখতে পেলো সে। ছোরা নিক্ষেপ করেছে। রহমান।
ওরা বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো।
রহমান দ্রুতহস্তে বনহুরের হাতের বাঁধন খুলে দিলো। তারপর বললো-সর্দার, সবাইকে খতম করেছি। আসুন আমার সঙ্গে।
বনহুর বললো-তোমরা কি করে এখানে এলে?
সব পরে বলছি সর্দার, আসুন।
দাঁড়াও। বনহুর একটানে যমদূতের মুখের আলখেল্লা সরিয়ে ফেললো।
সঙ্গে সঙ্গে রহমান ও রামসিং অস্কুট ধ্বনি করে উঠলো-এ যে গুলবাগ হোটেলের মালিক মিঃ প্রিন্স
হাঁ, যমদূত সেই শয়তানই। আজ থেকে কয়েকদিন আগে আমি তাকে ইরান সাগরে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিলাম কিন্তু তার মৃত্যু হয়নি। সে ইরান সাগর থেকে কোনো ক্রমে বেঁচে গিয়েছিলো এবং আমার পিছনে ধাওয়া করেছিলো। রহমান, ঐ যে ডাইনী বুড়ী দেখছো, ওটাও এই শয়তান যমদূতের এক সৃষ্টি। এই বৃদ্ধার দ্বারা সে নরহত্যা সাধন করেছে। একটু থেমে বললো বনহুর-দুটো শয়তান খতম হলো। প্রথম জাফর হুসাইন, দ্বিতীয় মিঃ প্রিন্স খান। জাফর হুসাইনের হীরাঝিল আর মিঃ প্রিন্সের হোটেল গুলবাগ। রহমান, রামসিং, আর এখানে বিলম্ব নয়; এবার আমি রওনা দেবো হীরাঝিলে। হীরাঝিল থেকে বন্দী বাঙ্গালীদের উদ্ধার করে তারপর গুলবাগ…থাক, আর দেরী নয় চলো।
বনহুর, রহমান আর রামসিং চালাঘর থেকে বেরিয়ে আসে বাইরে। চালাঘরের মেঝেতে। পড়ে থাকে নরখাদক বৃদ্ধা আর যমদূতের লাশ।
বনহুর বাইরে এসে বললো-রামসিং, নাসিমা ভাল আছে তো?
হাঁ সর্দার, নাসিমা ভাল আছে-বললো রামসিং।
এবার বনহুর রহমানকে লক্ষ্য করে বললো-কি করে তোমরা সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করেছিলে রহমান?
সর্দার, সে এক অদ্ভুত কাণ্ড। ঐ দিন হঠাৎ আপনি আমার পাশ থেকে কোথায় যে উঠে গেলেন, আমি আর আপনাকে খুঁজে পেলাম না। অনেক চিৎকার করে ডাকলাম…সর্দার, সর্দার কোথায় আপনি কিন্তু কোনো সাড়া পেলাম না। মনে আমার ভীষণ আতঙ্ক জাগলো। ভাবলাম, শেষ পর্যন্ত সর্দারকে হারালাম। কান্দাই ফিরে গিয়ে কি জবাব দেবো মা মনি আর বউ রাণীদের কাছে, কি জবাব দেবো নূর আর জাভেদের কাছে। আপনাকে ফিরে পাবার জন্য আমি চালা ঘরের দরজায় ভীষণ আঘাত করলাম কিন্তু আশ্চর্য, চালাঘরের দরজা এতটুকু শিথিল হলো না।
তারপর কি করলে? বললো বনহুর।
রহমান জবাব দিলো-তারপর আর একটুও বিলম্ব না করে অন্ধকারেই ছুটতে শুরু করলাম। কোন্ দিকে চলছি জানি না; তবে আমার উদ্দেশ্য আমাদের সেই পোড়োবাড়ি, যেখানে গিয়ে রামসিং, কাওসার এদের সঙ্গে করে আনবো এবং সন্ধান চালাবো আপনার সমস্ত রাত অবিরাম, ছুটে চলছি। অন্ধকারে বালুকারাশির মধ্যে কতবার যে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম তার ঠিক নেই। সমস্ত ক্লান্তি-অবসাদ ভুলে গেছি। পা আর চলছে না তবু এগুচ্ছি। একসময় ভোর হয়ে এলো। হঠাৎ সম্মুখে তাকিয়ে দেখি আমাদের সেই পোড়াবাড়িটার প্রায় কাছাকাছি এসে গেছি। খোদার কাছে শুকরিয়া করে নিলাম, তারপর গন্তব্যস্থানে পৌঁছে রামসিং আর কাওসারকে সব খুলে বললাম। সব শুনে তারা অস্থির হয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ আমাদের মধ্যে চললো সলা-পরামর্শ। তারপর হারুনকে মিস নাসিমার পাহারায় রেখে আমরা রওনা দিলাম। সর্দার, আশ্চর্য ব্যাপার, আমরা যখন নির্জন প্রান্তরে এগিয়ে চলেছি তখন একটা কুকুর আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো।
