ক্যাপ্টেন হার্লিং এবং তার অনুচরদলও কম শক্তিশালী নয় কিন্তু এমন অবস্থায় তারাও ভিজে বিড়ালের মত চুপষে গেছে যেন। ক্যাপ্টেন ভেবে পাচ্ছে না হঠাৎ মিঃ সেনের মধ্যে এমন পরিবর্তন হলো কি করে। বাধ্য হয়ে হার্লিং লৌহ আলমারী খুলে দু’লাখ টাকার ফাইলগুলো বের করলো।
মিঃ সেন বললো–আমার ওভারকোটের পকেটে ফাইলগুলো রাখো।
মিঃ সেন মুহূর্তের জন্য হাতের রিভলভার বেঠিক্ করলো না।
তার রিভলভার সর্বক্ষণ হার্লিং এর বুক লক্ষ্য করে আছে। হার্লিং বাধ্য ছাত্রের মত টাকার ফাইলগুলো মিঃ সেনের পকেটে রাখলো।
মিঃ সেন একখানা ভাঁজকরা কাগজ ক্যাপ্টেন হালিং–এর হাতে গুঁজে দিয়ে বললো– তোমার কোন দোষ নেই হালিং। টাকার রসিদ দিলাম।
মিঃ সেন রিভলভার ঠিক রেখে পিছু হটে বেরিয়ে গেলো ক্যাবিনের বাইরে। তারপর ক্যাবিনের দরজা বন্ধ করে দিলো মজবুত করে।
মিঃ সেন বেরিয়ে যেতেই হার্লিং কাগজখানা মেলে ধরলো চোখের সম্মুখে, বিস্ময়ে আরষ্ট হলো অস্ফুটকণ্ঠে পড়লো–
–মহারাজ ক্যাপ্টেন হালিং সম্পূর্ণ নিরপরাধ। জাহাজের সমস্ত মাল আমিই পুস্তদ্বীপবাসীদের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছি। ক্যাপ্টেনের নিকট হতে আমি দু’লাখ টাকা নিয়ে গেলাম। সময়মত দেখা করবো।
–দস্যু বনহুর।
ক্যাপ্টেন হার্লিং-এর হাত থেকে কাগজখানা খসে পড়লো ভীতকণ্ঠে বললো সেদস্য বনহুর।
ক্যাবিনের মধ্যস্থ সবাই একসঙ্গে ভয়ার্তভাবে উচ্চারণ করলো-দস্যু বনহুর।
ততক্ষণে দস্যু বনহুর জাহাজের শেষ অংশের একটা নির্জন ক্যাবিনে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলো, মেঝের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো বনহুর। মেঝের একস্থানে পা দিয়ে চাপ দিতেই মেঝের কিছুটা অংশ লিফটের মত স স করে নীচের দিকে নেমে চললো।
মাত্র কয়েক মিনিট।
বনহুর জাহাজের তলদেশে এসে পৌঁছে গেলো। লিফটের মুখেই ছোট্ট একটা ডুবো ক্ষুদ্র জাহাজ, কতকটা সাবমেরিনের মত। বনহুর সেই ক্ষুদ্র জাহাজটির মধ্যে চেপে বসলো। সাবমেরিনটার মধ্যে প্রবেশ করতেই লিফটের মত জিনিসটা সাঁ করে উপরে উঠে গেলো।
বনহুর সাবমেরিন চালনা জানতো সে অভিজ্ঞ চালকের মত মেসিনে স্টার্ট দিলো।
মুহূর্ত ছুটতে শুরু করলো সাবমেরিনখানা।
ওদিকে তখন ক্যাবিনে আটকা পড়ে ক্রুদ্ধ জন্তুর মত ছটফট করছে ক্যাপ্টেন হার্লিং ও তার দলবল। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ক্যাবিনের দরজায় ধাক্কা মেরে চললো।
অল্পক্ষণেই জাহাজের অন্যান্য লোকজন এসে পড়লো। দরজা খুলে দিতেই ক্যাপ্টেন হার্লিং ঝড়ের বেগের ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে চিৎকার শুরু করলো–দস্যু বনহুর দস্যু বনহুর গ্রেপ্তার করো। মিঃ সেনকে। গ্রেপ্তার করো কোথায় সেই সেনরূপী দস্যু..
দস্যু বনহুর নাম শুনেই প্রথমে সবাই চমকে উঠলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মত এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ী করতে লাগলো।
ক্যাপ্টেন হালিং পুনরায় চিৎকার করে উঠলো–তোমরা হা করে আছো কেনো? যাও দেখো কোথায় সেই দস্যু বনহুর………
সবাই ছুটলো যে যেদিকে পারলো।
হার্লিং নিজেও ছুটাছুটি করে খুঁজতে লাগলো। অনেক খুঁজতেও যখন তারা মিঃ সেনকে জাহাজে পেলো না তখন হতাশ হয়ে পড়লো।
ক্যাপ্টেন হার্লিং-এর চোখ দুটো হঠাৎ জ্বলে উঠলো। সে তৎক্ষণাৎ ছুটলো জাহাজের পিছন অংশের দিকে।
তার নির্দিষ্ট ক্যাবিনের সম্মুখে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো ক্যাপ্টেন হালিং। দরজা ভিতর থেখে বন্ধ দেখে চোখ তার নিষ্প্রভ হয়ে এলো, বললো–সর্বনাশ হয়েছে। দস্যু বনহুর আমাদের সব নিয়ে ভেগেছে………
ততক্ষণের অন্যান্য সবাই এসে ভীড় জমে গেছে সেখানে।
মিঃ হালিং-এর আদেশে ক্যাবিনের দরজা ভেঙে ফেলা হলো। সঙ্গে সঙ্গে হার্লিং মেঝের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটা সুইচে পা দিয়ে চাপ দিলো। অমনি লিষ্টা সা সা করে নেমে গেলো নীচে। কিন্তু লিফটের মুখে পৌঁছে আর্তনাদ করে উঠলো সেখানে সাবমেরিনটা নেই। পাগলের মত ফিরে এলো ক্যাপ্টেন হার্লিং জাহাজের কামড়ায় যেখানে তার অন্যান্য অনুচরগণ অপেক্ষা করছিলো। মাথায় করাঘাত করে বসে পড়লো ক্যাপ্টেন হালিং–দস্যু বনহুর সর্বশান্ত করে গেছে, সে শুধু দু’লাখ টাকা নিয়েই উধাও হয়নি আমাদের যথাসর্বস্ব সাবমেরিন নিয়ে ভেগেছে।
ফিলিংম্যান বলে উঠলো–দস্য জানলো কি করে আমাদের এই গোপন পথের কথা?
ক্যাপ্টেন হাউ মাউ করে কেঁদে বললো–আমি কি জানতাম সে আসল মিঃ সেন নয়। তাকে নিয়ে আমি একদিন সমুদ্রগর্ভে অবতরণ করেছিলাম..
হায় হায় করে উঠলো সবাই।
ক্যাপ্টেন হার্লিং ধপ করে বসে পড়লো জাহাজের ডেকের উপর।
*
কস্তুরীবাঈ নাচ শেষ করে বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো। যদিও তার সম্পূর্ণ মুখমমণ্ডল দেখা যাচ্ছিলো না তবু বনহুর বুঝতে পারলো কস্তুরীবাঈ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পা দু’খানা কাঁপছে ওর।
বনহুর ধরে ফেললো ওকে তারপর মুখে কাছে মুখ নিয়ে বললো–তোমার ডিউটি শেষ হয়েছে কস্তুরীবাঈ এবার মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেলো। সঙ্গে সঙ্গে কস্তুরীবাই এর মুখ থেকে কালো ওড়নার আঁচলখানা খুলে ফেলে বনহুর এবং আবেগ ভরা কণ্ঠে ডাকে নূরী………
নূরী স্বামীর বুকে মাথা রাখে–তুমি আমাকে…….
দস্যু বনহুরের চোখে ধুলো দেয় এমনজন আছে কেউ? যে দিন কস্তুরীবাঈকে প্রথম দেখেছি সেদিন চিনেছিলাম নূরী তোমাকে। শুধু তোমাকে নাম ধরে ডাকিনি কারণ তোমার সহায়তা আমার নিতান্ত প্রয়োজন ছিলো। বলো কি পুরস্কার তুমি চাও?
