আমি তার নাম জানি।
তাই নাকি?
হাঁ।
বলো দেখি কি নাম তার?
বলবো না।
অট্ট হাসিতে ভেঙে পড়ে বনহুর।
নূরী বলে-হাসছো কেন বলো?
বলবে না?
না।
আজ রাতে আমি আমার প্রিয়া কস্তুরীবাঈ এর সঙ্গে মিলিত হবো।
দাঁতে দাঁত পিষে বললো নূরী–এতো বড় সাহস তোমার? আমার সম্মুখে ঐ নিকৃষ্ট অস্পৃশ্য নর্তকীর নাম ধরতে লজ্জা হলো না তোমার?
জানো তো মানুষ–মানুষই দস্যু বনহুরের কাছে নিকৃষ্ট বা অস্পৃশ্য কেউ নয়। মেথর-মুচি ডোম তার চেয়েও যদি নিকৃষ্ট কেউ থাকে সেও আমার কাছে আমারি মত পবিত্র।
পবিত্র, তুমি আবার পবিত্র নাকি? নূরী মুখভাব গম্ভীর করে নিয়ে কথাটা বললো।
ঠিক সেই সময় পিছনে এসে দাঁড়ালো রহমান–হাঁ নূরী সর্দার পবিত্র। তাঁর চরিত্রের কাছে যে কোন মানুষ পরাজিত হতে বাধ্য।
ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত ফোঁস করে উঠলো নূরীরহমান জানো না আজকাল তোমাদের সর্দার দস্যুতা ত্যাগ করে প্রেমাভিনয় ধরেছেন………
নূরী তুমি অযথা সর্দারকে………
বনহুর রহমানকে ইংগিৎ করলো চুপ হতে।
রহমান কথা শেষ না করে থেমে গেলো, হাসলো সে মনে মনে।
নূরী বুঝতে পারলো রহমান কোন জরুরী কথা নিয়ে এসেছে। তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
রহমান সর্দারকে কুর্নিশ জানিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো তারপর বললো–সর্দার বহু বিলম্ব হয়ে গেলো।
কি ব্যাপারে?
সর্দার, অনিন্দপুরে অনিন্দন মহারাজের বেশে চরম এক শয়তান সেজে বসেছে। রাজ্য পরিচালনার নাম করে সে প্রজাদের উপর চালাচ্ছে নির্মম অন্যায় অত্যাচার। আর গোপনে চালিয়ে চলেছে চোরাচালানি কারবার।
এ সংবাদ কে বহন করে এনেছে?
আবদুল মালেক।
কোথায় সে?
বাইরে অপেক্ষা করছে।
ডাকো তাকে।
রহমান বেরিয়ে যায়, একটু পর আবদুল মালেক সহ ফিরে আসে।
কুর্ণিশ জানায় মালেক।
বনহুর সোজা হয়ে বসলো, গম্ভীর কণ্ঠে বললো–কি খরব মালেক?
সর্দার, খবর অত্যন্ত জটিল। দু’সপ্তাহ পূর্বে আমি অনিন্দপুরে যাই এবং গোপনে সেখানকার সমস্ত সংবাদ সংগ্রহ করি।
কতটুকু জেনেছো?
সর্দার, যতটুকু প্রয়োজন বলবো সর্দার?
না থাক্ এখন।
*
অনিন্দপুর।
গভীর রাত।
সমুদ্র তীরে একখানা জাহাজ অপেক্ষা করছিলো। জাহাজে কোন আলো ছিলো না। কতকগুলো লোক জাহাজের রেলিং এ দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের দেহেই ডোরাকাটা ফুলপ্যান্ট আর হাফ হাতা সার্ট। অন্ধকারে এক একটা জমদূতের মত দাঁড়িয়ে কিসের যেন প্রতিক্ষা করছে।
চারিদিক নিস্তব্ধ নিঝুম।
সমুদ্রের জলরাশির কল কল ছল ছল শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছিলো না।
এমন সময় একটা মাল বোঝাই ট্রাক্ এসে থামলো সমুদ্র তীরের অনতিদূরে। ট্রাকটি থেমে পড়তেই ট্রাকের ড্রাইভিং আসনের পাশে দাঁড়িয়ে একটি লোক আলো নাড়তে লাগলো।
সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের ডেকেও জলে উঠলো তীরস্থ আলোটির অনুকরণে অপর একটি আলো। পরক্ষণেই জাহাজ থেকে একটা সিঁড়ি নেমে এলো নিচে।
আলোর তেমন কোন কারবার নেই শুধুমাত্র ঐ দুটি আলোর বিন্দুর সাহায্যে চললো আলাপ।
সিঁড়ি নেমে আসাতেই ট্রাক থেকে কতকগুলো কাঠের বাক্স নামানো হলো।
সিঁড়ি বেয়ে ততক্ষণে নেমে এসেছে জাহাজের ডেকের লোকগুলো ট্রাক থেকে নামানো। কাঠের বাক্সগুলে তুলে নিলো তারা মাথায় তারপর অন্ধকারে জাহাজের দিকে এগুলো।
একজন দাঁড়িয়ে বাক্সগুলোর গায়ে চাটি দিয়ে ক্র চিহ্ন এঁকে দিচ্ছিলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাকটির পাশে আর একটি ট্রাক এসে থামলো। প্রথম ট্রাক অন্ধকারে চলে গেলো। প্রথম ট্রাকের স্থানে দ্বিতীয় ট্রাক স্থান দখল করে দাঁড়ালো।
আবার মাল নামালো, বোঝাই হলো জাহাজের অভ্যন্তরে একটি নয় পর পর কয়েকটা ট্রাক এলো এমনি মাল বোঝাই হয়ে, একইভাবে কাঠের বাক্সগুলো স্থান পেলো জাহাজটায়।
সিঁড়িতুলে নেবার পূর্বে জাহাজ থেকে নেমে এলো একজন সাহেব।
তীরে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি। তার দেহে অভার কোট, মুখে দাঁড়ি। পায়ে ভারী বুট, চোখে কালো চশমা। রাতের অন্ধকারে তাকে ভয়ঙ্কর লাগছিলো।
জাহাজের সাহেবটি নেমে এসে দাঁড়ালো কালো চশমা পরিহিত লোকটার পাশে। বললো– সাহেব–মিঃ সেন মাল পৌঁছে গেলে আপনি সংবাদ পাবেন। আর এই নিন টাকা।
কালো চশমা পরা লোকটা বললো–কত আছে এতে?
আজকের মালের মূল্য দু’লাখ টাকা আছে এতে।
বেশ দাও। হাঁ মনে রেখো একটা পয়সা হিসাবে গরমিল হলে তুমি মরবে ফিলিংম্যান।
স্যার, অবিশ্বাসের কিছু নেই।
তাহলে যেতে পারো। বললো চশমা পরিহিত ব্যক্তি। ফিলিং সাহেব বললো–স্যার, যাবেন না আপনি?
না, আজ যাওয়া সম্ভব নয় কারণ মহারাজ স্বয়ং যাবেন বলে জানিয়েছেন আমাকে।
মহারাজ স্বয়ং যাবেন?
হাঁ-তোমাদের মালিককে বলো আগামী অমাবস্যায় যে মাল চালান যাবে তার সঙ্গে যাবেন মহারাজ স্বয়ং। কারণ বোমসিং আর মোদন মোহনের মৃত্যুর পর কান্দাই-এ নতুন কোন পার্টি তেমন করে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছেন না। আজকাল কান্দাই পার্টি ঝিমিয়ে পড়েছে যেন একেবারে।
দ্বিতীয় পার্টির সঙ্গে কেমন কারবার চলছে স্যার?
খুব ভাল না এবং সে কারণেই মহারাজ অনিন্দন স্বয়ং যাবেন কান্দাই। হাঁ আর একটা কথা, তোমাকে যে ভাবে পূর্বে বলেছিলাম সেইভাবে কাজ করবে, বাইরের লোক কেউ যেন টের না পায়।
সব কথা মনে আছে স্যার। কথাটা বলে ফিলিং সাহেব জাহাজের দিকে পা বাড়ালো।
ওভার কোটের পকেটে টাকার ফাইলগুলো রেখে মিঃ সেন তার গাড়ির দিকে এগিয়ে। চললো।
