হাসলো বনহুর, বললো–বেশ তাহলে আমাকে সহায়তা করো। বনহুর একটা তার সংগ্রহ করে নিলো, তারপর তারখানা নিয়ে কৌশলে বারুদের কক্ষে প্রবেশ করলো! তারের মুখ বারুদের কক্ষে রেখে ব্যালকুনির রেলিং বেয়ে আবার ফিরে এলো বনহুর কস্তুরীবাঈ-এর কক্ষে।
কস্তুরীবাঈ তখন মেসিনগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো, সেও বনহুরকে তার বসানো ব্যাপার নিয়ে সাহায্য করে চললো।
বনহুর আর কস্তুরীবাঈ দ্রুত কাজ করে যাচ্ছিলো। তাদের কানে ভেসে আসছিলো নাইট ক্লাবের শয়তান মালিক এবং তার অনুচরদের ব্যস্ততা ভরা ক্রুদ্ধ আলাপ আলোচনা। এদিকে কেউ আসবে না এই ধারণা নিয়েই তারা ওদিকে খোঁজ করে চলেছে। কারণ এদিকটা মেসিন ঘর আর পাকার বারুদে পরিপূর্ণ, তাছাড়া এদিকটায় কড়া পাহাড়ার ব্যবস্থা আছে এ কারণেই ওরা এদিকে খোঁজ না করে নাইট-ক্লাবের বিভিন্ন অংশে সন্ধান করে চলেছে।
ততক্ষণে বনহুর আর কস্তুরীবাঈ তাদের কাজ শেষ করে নেয়।
বারুদের কক্ষে তার বসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে বনহুর কস্তুরীবাঈ-সহ। বনহুরের হাতের মুঠায় তারের শেষ অংশ এবং সুইচ রয়েছে।
বাইরের মুক্ত আকাশের নিচে এসে দাঁড়ালো ওরা দু’জনা। নাইট ক্লাবটা ছিলো শহরের এক প্রান্তে আশে-পাশে তেমন কোন বাড়ী-ঘর ছিলো না। বনহুর আর কস্তুরীবাঈ দ্রুত সরে যেতে লাগলো। বেশ কিছুদূর সরে যাবার পর ওরা দাঁড়িয়ে পড়লো।
বনহুর বললো–ভোর হবার পূর্বেই আমি ওদের নিঃশেষ করে ফেলতে চাই কস্তুরী।
হাঁ আমার ইচ্ছাও তাই। তাছাড়া এখন ওরা সবাই নাইট-ক্লাবের অভ্যন্তরেই আছে। এখনই হলো সুবর্ণ সুযোগ।
বনহুর আর কস্তুরীবাঈ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। বনহুর সুইচে চাপ দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে দূরে নাইট-ক্লাবটার মধ্যে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হলো, সেকি ভয়ঙ্কর শব্দ। মুহূর্তে যেন প্রলয়কাণ্ড ঘটে গেলো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো নাইট-ক্লাব গৃহটা। যেখানে প্রতি সন্ধ্যায় শহরের কতকগুলোবিশিষ্ট নারী-পুরুষের সমাবেশ ঘটতো হাসি গানে ভরে উঠতো স্থানটা। আর ভিতরে চলতো এক জঘন্য কুৎসিত কুকর্ম। সেই নরক-পুরি এই দণ্ডে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হলো।
যে মুহূর্তে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটলো সেই মুহূর্তে কস্তুরীবাঈ ভীতভাবে জড়িয়ে ধরেছিলো বনহুরকে।
বনহুরও কস্তুরীবাঈকে গভীরভাবে টেনে নিয়েছিলো।
এক সময় সম্বিৎ ফিরে এলো কস্তুরীবাঈ-এর।
কস্তুরীবাঈ দ্রুত সরে দাঁড়াতে গেলো।
বনহুরের বাহু দুটি আরও নিবিড়ভাবে আকর্ষণ করলো তাকে। কস্তুরীবাঈ মুক্তি পেলো না ওর বাহুবন্ধন থেকে।
কস্তুরীবাঈ বনহুরের গালে প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিতেই বনহুর হেসে উঠলো হাঃ হাঃ করে তারপর বললো–প্রিয়ে তুমি আমার জীবন মন সর্বস্ব। তোমাকে আমি চাই…
কস্তুরীবাঈ মুখের আবরণ আরও ভালভাবে টেনে দিয়ে বলে–ভোলানাথ তোমাকে আমি পবিত্র নিষ্পাপ বলেই জানতাম। তুমি যে এতোখানি হীন জঘন্য তা জানতাম না।
আবার অট্টহাসিতে ভেঙে পড়লো বনহুর, তার মুখে ফুটে উঠলো একটা বৈচিত্র্যময় ভাবের পরিবেশ।
কস্তুরীবাঈ নির্বাক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো বনহুরের মুখের দিকে।
অদূরস্থ নাইট-ক্লাবের অগ্নি-কুণ্ডের আলোকরশ্মিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো সব। বনহুর বললো–কাজ শেষ হলো কস্তুরীবাঈ এবার চলো তোমাকে কোথায় পৌঁছে দিতে হবে?
কোথায় যাবো জানি না।
তবে চলো আমার সঙ্গে।
কোথায়?
যেখানে আমি থাকি।
বেশ চলো।
বনহুরের হাত ধরে কস্তুরীবাঈ রওনা দিলো।
*
বনহুরের আস্তানা।
বিশ্রাম কক্ষে বনহুর তার শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় বসেছিলো। তার সম্মুখস্থ টেবিলে স্তূপাকার ফলমূল থরে থরে সাজানো। নূরী বসে, এক একটি অংগুরের ঝোপা তুলে ধরছিলো বনহুরের মুখে। নিজেও খাচ্ছিলো দু’একটা করে।
নূরীর মুখভাবে একটা সহস্যময় প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। এক সময় বলে উঠলো নূরী–একটা কথা জিজ্ঞেস করবো সঠিক জবাব দেবেতো হুর। আংগুর চিবুতে চিবুতে জবাব দিলো বনহুর–কবে তোমার প্রশ্নে বেঠিক জবাব দিয়েছি বলো?
তবে সত্যি করে বলোতো গতরাতে তুমি কোথায় ছিলে?
ও এই কথা? একটা নাইট-ক্লাবে ছিলাম।
মুহর্তে নূরীর মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে পড়লো, রাগত কণ্ঠে বললো–আজকাল দস্যু বনহুর দেখছি দস্যুতা ত্যাগ করে নাইট-ক্লাবে রাত্রি যাপন শুরু করে দিয়েছে। ব্যাপার কি কোন সুন্দরী। প্রেয়সীর প্রেমে—
হাঁ নূরী সত্যি বলতে কি আমি একজনকে মন প্রাণে ভালবেসে ফেলেছি।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো নুরী–বনহুর।
শুধু তাকে ভালবাসি তা নয় তাকে আমি সমীহ করি কারণ সে আমার বহুকাজে সহায়তা করেছে এমন কি একদিন সে আমার জীবন রক্ষা করেছে নুরী।
এবার বুঝেছি। হু একটা নর্তকীর মোহ তোমাকে এতোখানি নীচে নামাতে পারে এ আমি কোনদিন ভাবতে পারিনি বনহুর।
বনহুর মৃদু হাসলো তারপর বললো–দস্যু বনহুর নীচে নামতে জানে না নূরী। সে শুধু উচ্চতর হতে উচ্চস্তরে আরোহণ করতে পারে।
তাহলে নাইট-ক্লাবের একটি নর্তকীর সঙ্গে এমন করে রাতের পর রাত কাটাতে পারতে না। বনহুর। জানি তোমার দুর্বলতা কোথায়?
আমার নয় তোমার। কারণ তুমি আজও আমাকে বিশ্বাস করতে পারো না। তাই আমাকে………থাক আজ আর নয়।
নূরী মাথা নিচু করে কিছু ভাবলো।
বনহুর বললো–সে নর্তকীর নাম কি শুনবে নূরী?
আমি শুনতে চাই না।
কেন বলোতো? হিংসে হয় বুঝি?
