লোকটা বললো–ওকে নিয়ে যাও বন্দী করে রাখোগে। দেখো কোনক্রমে যেন ছাড়া না। পায়।
এবার বললো যুবতী–কেমন উপযুক্ত সাজা বাছাধন।
বনহুর একবার তাকিয়ে দেখে নিলো যুবতীর মুখের দিকে। লোকগুলো তখন বনহুরকে টেনে নিয়ে চললো সিঁড়ি বেয়ে নিচে।
বনহুরকে একটা কক্ষে আবদ্ধ করে রাখলো ওরা। তারপর সবাই চলে গেলো সেখান থেকে।
কক্ষটা কঠিন পাথরে তৈরি হলেও দরজাখানা ছিল লৌহ শিকলে তৈরি। বনহুর লৌহ-শিক হাত রেখে অনুভব করে নিলে। এই শিক বাঁকিয়ে বেরুতে তার কিছুমাত্র কষ্ট হবে না।
বন্দী কক্ষের মেঝে বসে ভাবতে লাগলো,এই নাইট ক্লাবের নাম সে শুনেছিলো, এখানে ভদ্রবেশী শয়তানদের হয় আনাগোনা কিন্তু সে জানতো না এর ভিতরে আছে একটা গভীর সহস্য।
রাত গম্ভীর হয়ে আসছে। বনহুর ভাবছে এবার তার কাজ শুরু করবে শিক বাঁকিয়ে বেরিয়ে সায়েস্তা করবে সে নাইট-ক্লাবের মালিক সেই জীবন্ত শয়তানটাকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বন্দী কক্ষের দরজার বাইরে পদ শব্দ হলো, বনহুর মিছামিছি নিদ্রার ভান করে বন্দী কক্ষের মেঝেতে শুয়ে পড়লো। অল্পক্ষণেই বন্দী-কক্ষের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো কস্তুরীবাঈ।
বনহুরের শিয়রে এসে বসলো কস্তুরীবাঈ, অতি চাপা-কণ্ঠে ডাকলো–উঠে পড়ো ভোলানাথ, উঠে পড়ো…
বনহুর নিদ্রা ভাঙ্গার ভান করে উঠে বসে বিস্ময়ভরা কন্ঠে বললো–তুমি!
হাঁ চুপ–ঠোঁটের উপর আংগুল চাপা দেয় কস্তুরীবাঈ। তারপর মৃদু স্বরে বলে–ভোলানাথ এই সুযোগ, চলো তোমার পথ মুক্ত।
বনহুর হাসে–সুন্দরী, পথ মুক্ত হলেও আমি পালাবো না। আমি নিঃশেষ করবো এই শয়তানপুরি।
কিন্তু শুধু এই শয়তানপুরি নিঃশেষ বা ধ্বংস করে কোন ফল হবে না ভোলানাথ, উপড়ে ফেলতে হবে এই শয়তান দলের মূল শিকড়।
কস্তুরীবাঈ তুমি যদি পাশে থাকো তাহলে আমার কোন অসুবিধা হবে না। তুমি পারবে আমাকে সহায়তা করতে।
কস্তুরীবাই বললো–পারবো।
বনহুর আর কস্তুরীবাঈ বেরিয়ে এলো বন্দীশালা থেকে।
এগুতে লাগলো ওরা দু’জন অন্ধকার পথ ধরে সম্মুখ দিকে। একটা সিঁড়ির মুখে এসে থামলো বনহুর আর কস্তুরী।
ঠিক সেই মুহূর্তে পিছনে কারো চাপা কণ্ঠস্বর শোনা গেলো। বনহুর কস্তুরীবাঈকে টেনে নিয়ে সিঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়লো।
চাপ-স্বরে দু’জন লোকে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে এদিকেই। বনহুর আর কস্তুরীবাঈ রুদ্ধ নিশ্বাসে কান পেতে শুনতে লাগলো।
লোক দু’জন নিকটবর্তী হতেই বনহুর এবং কস্তুরীবাঈ স্বল্প আলোতেও তাদের চিনতে পারলো। একজন নাইট-ক্লাবের মালিক, অপর জন সম্পূর্ণ অপরিচিত। দু’জন কোন ব্যাপারে আলাপ করতে করতে এগিয়ে আসছিলো। অপরিচিত লোকটির হাতে একখানা ছোরা অন্ধকারেও চক চক করে উঠলো।
শিউরে উঠলো কস্তুরীবাঈ।
বনহুর বললো–শয়তানটা ভোলানাথকে হত্যা করতে যাচ্ছে। এক্ষুণি সর্বনাশ হবে।
কস্তুরীবাঈ চাপা কণ্ঠে বললো–ভয় নেই ভোলানাথ আমি তোমাকে এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখবো যেখানে কেউ তোমার সন্ধান পাবে না। শীঘ্র এসো আমার সঙ্গে।
কস্তুরীবাঈ ভোলানাথের হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো। একটা অন্ধকার পথ ধরে কিছুক্ষণ চলার পর একটি সুরঙ্গ মুখ দেখা গেলো। কস্তুরীবাঈ বললো–ভোলানাথ তুমি এই সুড়ঙ্গ মধ্যে প্রবেশ করো।
আর তুমি?
আমাকে ফিরে যেতে হবে আমার কক্ষে।
বনহুর সুবোধ বালকের মত বলে উঠলো–আমিও তা’হলে যাবো তোমার সঙ্গে।
কোথায়?
তোমার কক্ষে।
সর্বনাশ হবে তাহলে।
সে দেখা যাবে, চলো।
কিন্তু তুমি জানো না ভোলানাথ এই শয়তান দল কত বড় সাংঘাতিক আর ভয়ঙ্কর।
জানি। আর জানি বলেই এসেছি এই নাইট-ক্লাবে।
তাহলে চলো আমার সঙ্গে। কস্তুরীবাঈ ভোলানাথ সহ তার শয়ন কক্ষে এসে হাজির হলো।
বনহুর বললো–কস্তুরীবাঈ তুমি শীঘ্র খাটে শয়ন করো আমি তোমার শয্যায় তলায় লুকিয়ে পড়বো।
বেশ তাই করো। কস্তুরীবাঈ কথাটা বলে নিজ শয্যায় শয়ন করে চাদর মুড়ি দিলো।’
অল্পক্ষণেই কস্তুরীবাঈ-এর দরজায় আঘাত পড়লো, সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে প্রবেশ করলো। নাইট-ক্লাবের মালিক এবং তার পিছনে উদ্যত ছোরা হস্তে দ্বিতীয় ব্যক্তি।
নাইট-ক্লাবের মালিক রুক্ষ কণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়লো-কস্তুরীবাঈ! কস্তুরীবাঈ।
সবে নিদ্রা ভাঙ্গার মত চমকে উঠে বসলো কস্তুরীবাঈ, মালিককে তার কক্ষে দেখে অবাক হবার ভান করে বলে মালিক আপনি!
ক্রুদ্ধ কণ্ঠে গর্জে উঠলো মালিক এ কক্ষে ভোলানাথ এসেছিলো কি?
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে উঠে কস্তুরীবাঈ–ভোলানাথ–সে তো বন্দীখানায় বন্দী আছে।
না সে পালিয়েছে।
মালিক ভোলা পালিয়েছে?
হাঁ। কিন্তু কে তার দরজা মুক্ত করে দিয়েছিলো?
আমি-আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, কি করে বলবো।
দ্বিতীয় ব্যক্তিটি বললো–মালিক এ বেচারী কি করে জানবে। ভোলানাথকে নিশ্চয়ই অন্য কেউ মুক্ত করে দিয়েছে।
মালিক কক্ষের চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নেয় তারপর হিংস্র জন্তুর মত গ গ করতে করতে সঙ্গী সহ বেরিয়ে যায়।
খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে আসে বনহুর।
সঙ্গে সঙ্গে কস্তুরীবাঈ তার মুখের আবরণ টেনে মুখের নিচের অংশ ঢেকে ফেলে।
বনহুর কস্তুরীবাঈ-এর সম্মুখে এসে দাঁড়ায়–এবার তাহলে চলে যাই?
কস্তুরীবাঈ বলে উঠলোনা না এখন কোথায় যাবে? তোমাকে ওরা হত্যা করে ফেলতে পারে ভোলানাথ।
তুমি তো জানো কস্তুরী ভোলানাথ মৃত্যু ভয়ে ভীত নয়। তবে এখন আত্মগোপন করেছিলাম তার কারণ আছে। আমি লুকিয়ে এই শয়তানের আসল ঘাটির সন্ধান আবিষ্কার করতে চাই।
