কস্তুরীবাঈ হেসে উঠলো খিল খিল করে। তারপর বললো– ভোলানাথ আমাকে দেখতে চাও?
হ তোমার অপরূপ সৌন্দর্য আমি দেখতে চাই কস্তুরীবাঈ। আমাকে তুমি বিমুখ করো না।
আমাকে তুমি দেখতে চাও, কিন্তু জানো আমাকে দেখলে তুমি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে। আমাকে তুমি দেখতে চেওনা ভোলানাথ।
হাসে বনহুর, বেশ তুমি যাতে খুশি হও তাই চাই কস্তুরীবাঈ। বনহুর আসনে ঠেশ দিয়ে বসলো। একটু নিশ্চুপ থেকে বললো–একটা নাচ দেখাবে কস্তুরী?
দেখাবো।
নাচো তাহলে।
কস্তুরীবাঈ নাচতে শুরু করলো।
দু’চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো বনহুর ওর দিকে।
সত্যি অদ্ভুত নাচে এই মেয়েটি।
নাচ শেষ হয়, কস্তুরীবাঈ দাঁড়িয়ে পড়ে এক পাশে।
বনহুর আসন ত্যাগ করে এগিয়ে যায় কস্তুরীবাঈ-এর দিকে, খপ করে ধরে ফেলে ওর দক্ষিণ হাতখানা।
কস্তুরীবাঈ শিউরে উঠে ভীত দৃষ্টি নিয়ে তাকায় সে বনহুরের চোখ দুটির দিকে।
বনহুর কস্তুরীবাঈকে আলিঙ্গন করে, ওর ললাট স্পর্শ করে বনহুরের ওষ্ঠদ্বয়।
কস্তুরীবাঈ বলে–নানা আমাকে ছেড়ে দাও ভোলানাথ। আমাকে মুক্ত করে দাও..
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে আকর্ষণ করে।
কস্তুরীবাঈ অসহায়ের মত ছটফট করতে থাকে বনহুরের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে।
সেই মুহূর্তে প্রথমা যুবতী কোন কারণে সেই কক্ষে প্রবেশ করে।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর বাহুমুক্ত করে দেয় কস্তুরীবাঈকে।
কস্তুরীবাঈ তৎক্ষণাৎ ছুটে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে।
বনহুর তাকায় যুবতীটির দিকে।
যুবতী তখন ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখে। রাগে ফুলছে যেন সে। যুবতী বনহুরকে কিছু না বলে দ্রুত চলে গেলো সেই কক্ষ থেকে।
বনহুরের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো একটা হাসির রেখা। প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো।
মাত্র কয়েক মিনিট কেটেছে।
হঠাৎ আট দশজন জোয়ান বলিষ্ঠ লোক সেই কক্ষ মধ্যে প্রবেশ করে আচমকা আক্রমণ করলো বনহুরকে।
বনহুর হাতের সিগারেট দূরে নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দিয়ে চললো। বলিষ্ঠ জোয়ান লোকগুলোর নাকে মুখে চোখে তীব্র ঘুষি চালালো সে অবিরাম।
অল্পক্ষণেই আট দশজন লোক নাজেহাল হয়ে পড়লো বনহুরের কাছে। কে কোন পথে পালাবে খুঁড়ে নিলো। কিন্তু সেই দণ্ডে একজন পিস্তলধারী লোক এসে দাঁড়ালো বনহুরের সম্মুখে, পিস্তলখানা বনহুরের বুকে চেপে ধরে বললো–হাত উঠাও।
বনহুরের মুখোভাবে কোন পরিবর্তন আসেনি। এতোক্ষণ লড়াই করে এতোটুকু বিচলিত হয়নি সে। বনহুর যেন এমনি একটা অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিলো ধীরে ধীরে হাত তুলে দাঁড়ালো বনহুর।
লোকটা পিস্তল ঠিক রেখে অনুচরদের আদেশ করলো–একে বেঁধে ফেলো।
এতোক্ষণে পরাজিত লোকগুলো আবার এসে ঘিরে ধরেছিলো, তারা মজবুত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেললো বনহুরকে।
বনহুর বাধা দিলো না, সে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো।
ওরা বনহুরকে বেঁধে নিয়ে চললো। বনহুরের পিছনে পিস্তল হাতে সেই লোকটা এগিয়ে আসছে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। আঁকা-বাঁকা বেশ কতকগুলো ধাপ অতিক্রম করে একটা কক্ষে প্রবেশ করলো তারা দস্যু বনহুর সহ।
বনহুর তাকালো কক্ষ মধ্যে, অবাক হলো সে। দেখলো মেঝের মাঝখানে একটা চেয়ারে উপবেশন করে আছে সট প্যান্ট টাই পরিহিত ভদ্রবেশী এক জীবন্ত শয়তান।
লোকটার পাশেই দণ্ডায়মান সেই যুবতী যে একটু পূর্বে বনহুরের নিকট হতে চলে এসেছিলো। যুবতীর চোখে মুখে ক্রুদ্ধ ভাব ফুটে উঠেছে।
পাশে কস্তুরীবাঈ, এখনও তার মুখে সেই কালো আবরণ ঢাকা।
বনহুরকে দেখবামাত্র লোকটা তার পা থেকে মাথা অবধি দেখে নিলো, তারপর রুক্ষ কণ্ঠে। গর্জে উঠলো–কে তুমি?
বনহুর স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিলো–আমি একজন মানুষ দেখতেই পাচ্ছো।
লোকটা বনহুরের কথায় ক্ষেপে গেলো ভীষণভাবে। রক্ত চক্ষু ঘুরিয়ে বললো–মানুষ তা তো দেখতেই পাচ্ছি! কিন্তু কি তোমার নাম?
একটু ভেবে বললো বনহুর–আমার নাম শ্যামনাথ।
সঙ্গে সঙ্গে যুবতী বলে উঠলো–মালিক ও মিথ্যা কথা বলছে। ওর নাম ভোলানাথ।
বনহুরের দৃষ্টি এসে পড়লো যুবতীর মুখে, বললো সেও তুমি দেখছি আমার আসল নামটা জেনে নিয়েছো?
যুবতী বললো–তোমার আসল জানা আছে।
এবার বললো শয়তান লোকটা–আমার সহোদর বোমসিং-এর সর্বনাশ করেছো। তোমার জন্যই আজ বোমসিং এই সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।
হঠাৎ বনহুর হেসে উঠলো অট্টহাসি তোমার ঐ কুৎসিৎ মুখে সুন্দর পৃথিবী শব্দটা মানায় না শেঠজী।
সঙ্গে সঙ্গে তীব্র বেগে আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ায়, সরে এসে প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দেয় লোকটা বনহুরের গালে।
বনহুরের হাত দু’খানা পিছমোড়া করে বাঁধা থাকায় সে নীরব রইলো কিন্তু দক্ষিণ হাতখানা মুষ্ঠিবদ্ধ হলো তার, চোখ দুটো জ্বলে উঠলো আগুনের গোলার মত দাঁতে দাঁত পিষলো শুধু সে।
লোকটা বললো আবার–এতোবড় স্পর্ধা বোমসিং-এর সর্বনাশ করে তুমি আবার আমার পিছু নিয়েছো? বোমসিং? বোমসিং আমার সহোদর তার মাইনে করা বাঈজী কস্তুরী এখন আমাদের। তুমি আবার তার পিছু নিয়েছো………
বনহুর নীরবে শুনতে লাগলো, কোন জবাব দিলো না।
লোকটা কর্কশ কন্ঠে বলে চললো–এতোবড় সাহস তোমার কস্তুরীবাঈ-এর দেহ তুমি স্পর্শ করেছো!
বনহুর বুঝতে পারলো প্রথমা যুবতী এসে তার মালিককে সব কথা বলে দিয়েছে। তাকালো বনহুর কস্তুরীর দীপ্ত সুন্দর নীল চোখ দুটোর দিকে। সে চোখ যেন এক রাশ সহানুভূতি ঝরে পড়েছে।
