বনহুর মনিরার কোল থেকে মাথা সরিয়ে নিয়ে উঠে বসে, নিস্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে আবার, দৃষ্টি মেলে। আজ আবার বনহুরের মনে সেইদিনের কথা স্মরণ হয়। সেই নৌকায় বসে দু’জনার ঝগড়া। নৌকা চলছে, ঝড় উঠে এক সময় তলিয়ে যায় নৌকাখানা। তারপর আর কিছু মনে থাকে না। জ্ঞান ফিরে দেখে সে বলিষ্ঠ চেহারা, ঝাকড়া চুল, কানে বালা এক জোয়ান। মানুষকে। স্মরণ হয় পূর্বকথা, কিন্তু কে জানে কোথায় তার বাবা মা আর মনিরা। প্রথম বড় খারাপ লাগতো, বাবা মা আর মনিরার জন্য সর্বদা মনটা ছটফট করতো। এক-এক সময় পালাতেই ইচ্ছে করতো তার কিন্তু কোথায় পালাবে চারিদিকে গহন জঙ্গল। নানারকম হিংস্র জন্তুর সমাগম, গা ছম ছম করতো ওর। কিন্তু যখন সেই জোয়ান লোকটা আসতো তার পাশে সব ভয় ভাবনা যেন মুছে যেতো মন থেকে। কেমন যেন গভীর একটা আকর্ষণে সে ঝাঁপিয়ে পড়তো ওর প্রশস্ত বুকে, ডাকতো বাপু বলে। তারপর সব সয়ে উঠলো, কালু খাঁ তাকে পুত্র-স্নেহে মানুষ করে তুললো, নানারকম অস্ত্র শিক্ষা দিল তাকে। মুষ্টিযুদ্ধ শেখালো, শিকার করা শেখালো তারপর। শিক্ষা পেলে দস্যুতা…………
মনিরা স্বামীকে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু ভাবতে দেখে বললো– কি ভাবছো অমন করে?
সম্বিৎ ফিরে পায় বনহুর, চমকে উঠলো সে– হ্যাঁ কি বললে?
ওমন গভীরভাবে কি চিন্তা করেছিলে?
মনিরা তোমার কথায় আমার মনে উদয় হয়েছিলো পূর্বকথা। পিছনে ফেলে আসা সেই দিনগুলো….
থাক্ এবার ঘুমাও দেখি। রাত অনেক হয়েছে।
বনহুর শয্যা গ্রহণ করলো।
মনিরাও শুয়ে পড়লো বনহুরের পাশে।
মনিরা এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।
দস্যু বনহুর কিন্তু ঘুমালো না, সে বার বার তাকাচ্ছে দেয়াল ঘড়িটার দিকে।
মনিরার হাতখানা বনহুরের বুকের উপর রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। বনহুর ধীরে ধীরে মনিরার হাতখানা সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায়। আলগোছে আলোটা নিভিয়ে বেরিয়ে যায় বনহুর ঘর থেকে।
হঠাৎ সিঁড়ির মুখে পথ আগলে দাঁড়ায় একটা ছায়া-মূর্তি।
বনহুর চমকে উঠে, চাপা স্বরে বলে– কে তুমি?
আমি ফুলমিয়া।
তুমি!
হাঁ।
এখানে কেন?
আপনি যেন না যান সে জন্য বিবি সাহেবা আমাকে সজাগ থাকতে বলেছেন।
তার মানে?
মানে আপনি পালান কিনা তাই।
ফুলমিয়া আমার বিশেষ দরকার আছে, একবার যেতেই হবে আমাকে।
কিন্তু বিবি সাহেবা…
তোমাকে কিছু বললে বলবে, আমি দেখিনি………..
না, সাহেব আমি মিছে কথা বলতে পারবো না।
তবে এক কাজ করি দাঁড়াও। আচ্ছা ফুলমিয়া?
বলুন সাহেব?
একগাছা দড়ি আনতে পারো?
দড়ি, হাঁ খুব পারি! কি করবেন সাহেব দড়ি দিয়ে?
তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে হবে না, তারই ব্যবস্থা করবো।
আচ্ছা সাহেব আসছি।
একটু পরে দড়ি নিয়ে ফিরে এলো ফুলমিয়া– নিন সাহেব। কিন্তু দড়ি দিয়ে কি হবে?
দাও!
বনহুর দড়িখানা হাতে নিয়ে বললো– এই খামটার পাশে সোজা হয়ে দাঁড়াও।
ফুলমিয়া বনহুরের আদেশ পালন করলো। থামের পাশে ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়ালো এসে সে।
বনহুর বললো- নড়বে না একটুও বুঝলে?
আমাকে বাঁধবেন?
না, তোমাকে মিথ্যা বলা থেকে রেহাই দেবো।
বনহুর ফুলমিয়াকে খুব করে বেঁধে ফেললো থামটার সঙ্গে। তারপর রুমাল বের করে মুখ বাঁধলো, এবার বললো বনহুর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাও।
গোঙ্গানীর মত শব্দ করে বললো ফুলমিয়া সাহেব আপনি চলে যাচ্ছেন?
হাঁ আবার আসবো।
বনহুর যখন ফুলমিয়াকে খুব করে বাঁধছিলো তখন ফুলমিয়া সম্পূর্ণ নীরব ছিলো। সে একটু টু-শব্দও করলো না। বা নড়লো না।
বনহুর সন্তর্পণে বেরিয়ে এলো চৌধুরী বাড়ি থেকে।
*
একটা নাইট-ক্লাবের সম্মুখে এসে গাড়ি থামলো, বনহুর নেমে গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো।
রাত্রি অনেক হয়েছে বটে তবু নাইট-ক্লাব গমগম করছে।
নানারকম আলোর ঝকমকানি চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। বনহুর নাইট-ক্লাবে প্রবেশ করতেই একটি যুবতী তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলো।
নাইট ক্লাবের অভ্যন্তরে তখন নাচ-গান চলেছে।
এক পাশে বাদ্যযন্ত্র হস্তে বাদকগণ বসে বাজনা পরিবেশন করে চলেছে।
বনহুরকে সঙ্গে নিয়ে যুবতী একটা কক্ষে প্রবেশ করলো।
জমকালো পোশাকে আচ্ছাদিত এক নারীমূতি আসনে উপবেশন করেছিলো, সে বনহুরকে দেখবামাত্র আসন ত্যাগ করে অভিনন্দন জানালো।
বনহুর বললো– কস্তুরীবাঈ তুমি এখানে?
হাঁ এখানে আমি থাকি।
এই নাইট ক্লাবে তুমি থাকো?
একজন বাঈজীর পক্ষে এটা আশ্চর্য কিছু নয়। আসন গ্রহণ করো। কস্তুরীবাঈ সন্মুখে আসন দেখিয়ে দিল আংগুল দিয়ে।
বনহুর আসন গ্রহণ করলো।
কস্তুরীবাঈ বললো–আমি জানতাম তুমি আসবে।
জানতে আমি এখানে আসবো?
কে তোমাকে বলেছিলো এ কথা?
আমার মন।
আশ্চর্য মেয়ে তুমি।
শুধু আশ্চর্য নই অদ্ভুত বটে। ভোলানাথ তোমার মত একজন পুরুষকে আমি বশিভূত করে নিয়েছি।
কস্তুরী তুমি……..
থাক এখন অন্য কথা নয়, কাজের কথা।
কাজের কথা?
হাঁ।
কস্তুরীবাঈ ইঙ্গিৎ করলো প্রথম যুবতীটিকে সেখান থেকে চলে যাবার জন্য।
যুবতী চলে গেলো।
কস্তুরীবাঈ বললো– ভোলানাথ তুমি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আত্মগোপন করলেও তোমার সন্ধানে একদল শত্রু অহরহ সন্ধান করে ফিরছে। এই নাইট-ক্লাব তোমার জন্য নিরাপদ নয়।
ভোলানাথ বেশী বনহুর বললো– তুমি আমাকে সাবধানবাণী শোনালে কস্তুরী সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি জানতে চাই তুমি কে? তোমার মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেলো।
