বনহুর মনিরাকে টেনে নেয় নিবিড়ভাবে।
*
মিঃ আরিফকে আজ অত্যন্ত প্রফুল্ল এবং হাস্যউজ্জ্বল লাগছে। তিনি সোফায় ঠেশ দিয়ে সিগারেট পান করেছেন।
তার পাশের সোফায় মিঃ মুর্শেদ, মিঃ হারুন, আরও কয়েকজন পুলিশ অফিসার বসে রয়েছেন। একটা সোফায় মিঃ ইয়াসিন রয়েছেন। তাকে খুব প্রফুল্ল বা আনন্দমুখর মনে হচ্ছে না। কেমন যেন একটা বেদনাভরা ভাব ফুটে উঠেছে তার চোখে মুখে।
মিঃ আরিফ সিগারেট থেকে এক মুখ ধোয়া সম্মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন- এতোদিনে কান্দাই অভিশাপ মুক্ত হলো………
মিঃ মুর্শেদ বললেন- হাঁ ঠিকই বলেছেন মিঃ আরিফ। দস্যু বনহুরের জন্য দেশবাসীর মনে শান্তি ছিলো না। সদা সর্বদা একটা উৎকণ্ঠা আর ভীতি নিয়ে কাটাতো সবাই।
মিঃ হারুন বললেন– শুধু কান্দাইবাসীগণই নয় পুলিশ মহল ও সদা উদ্বিগ্নতা নিয়ে থাকতো। কোন কাজে স্বস্তি বা শান্তি ছিলো না কারো।
অন্য একজন পুলিশ অফিসার বললেন– দস্যু বনহুর মরেছে দেশবাসী নিশ্চিন্ত হয়েছে ….
মিঃ ইয়াসিন এতোক্ষণ বসে চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলেন, এবার তিনি বলে উঠলেন– দস্যু বনহুরের মৃত্যুতে দেশের এক শ্রেণীর ও মানুষ নিশ্চিন্ত হয়েছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। যারা দেশের রক্ত শুষে খান তারাই আশ্বস্ত এবং নিশ্চিন্ত।
মিঃ ইয়াসিনের কথায় মিঃ আরিফ খুশি হতে পারলেন না, তিনি বললেন- আপনি কি বলতে চান দস্যু বনহুরের মৃত্যুতে সমস্ত কান্দাইবাসী খুশী নয়?
গম্ভীর কণ্ঠে বললেন মিঃ ইয়াসিন না! একটু থেমে পুনরায় বললেন– দস্যু বনহুরের মৃত্যুতে এক শ্রেণীর লোক অত্যন্ত খুশি হয়েছে–তেমনি ব্যথিত।
একটা ব্যঙ্গপূর্ণ হাসি হেসে বললেন মিঃ আরিফ –এটা আপনার ভুল ধারণা মিঃ ইয়াসিন, দস্যু বনহুরের মৃত্যুতে কেউ দুঃখ করতে পারে না। কারণ সে যত পরউপকারী হোক তবু সে দস্যু-শয়তান।
মিঃ ইয়াসিন বলে উঠলেন– স্যার, দস্যু সে হতে পারে কিন্তু শয়তান সে ছিলো না। কারণ অন্যায় সে করেনি কোনদিন।
আপনি এ সব কি বলেছেন মিঃ ইয়াসিন? অবাক কণ্ঠে বললেন মিঃ আরিফ।
মিঃ হারুন বললেন একজন দস্যুর প্রতি এতোখানি সহানুভূতিশীল হওয়া দোষণীয় স্যার।
আমার মন যা সায় দেয় আমি তাই বলি। পুলিশের চাকরি করি বলে আমি ন্যায় কথা বলবো না এ হতে পারে না। দস্যু বনহুরের মৃত্যুতে আমি মর্মাহত। গম্ভীর শান্ত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন মিঃ ইয়াসিন।
মিঃ ইয়াসিনের কথায় কক্ষ-মধ্যে সকলেই বেশ অবাক হয়ে পড়েছিলেন। একজন পুলিশ অফিসারের কণ্ঠে দস্যুর প্রতি এতো দরদ-ভরা কথা একেবারে অশোভনীয়।
মিঃ আরিফ মিঃ ইয়াসিনের প্রতি ভিতরে ভিতরে অসন্তুষ্ট হলেও মুখে কিছু বললেন না, কারণ মিঃ ইয়াসিন অত্যন্ত কাজের লোক। তিনি একজন দক্ষ পুলিশ ইন্সপেক্টার।
সেদিনের মত আলোচনা শেষ হলো।
সমস্ত কান্দাই শহরব্যাপি দস্যু বনহুরের মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়লো। পত্রিকায় বের হলো দস্যু বনহুরের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে নানা রকম বিস্ময়কর সংবাদ।
নূরী কান্দাই আস্তানায় বসে এই সংবাদ পেলো। কেঁদে কেটে আকুল হলো নূরী। রহমানও চিন্তিত হলো, সে যতদূর সম্ভব নূরীকে সান্ত্বনা দিতে লাগলো।
নূরী কোন কথা শুনলো না সে নিজে রহমানসহ কান্দাই-পর্বত অভিমুখে রওনা দিলো।
সমস্ত দিন অশ্ব চালনা করে প্রায় সন্ধ্যায় কাছাকাছি পৌঁছে গেলো নূরী আর রহমান কান্দাই পর্বতের পাদমূলে। অনেক সন্ধান করে খুঁজে বের করলো তারা ধ্বংসস্তূপে পরিণত সেই পুলিশ, জীপখানা।
রহমান আর নূরী চূর্ণ-বিচূর্ণ গাড়িখানা নানাভাবে পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো।
একটা আশার আলো মেলে গেলো রহমান আর নূরীর মনে। রহমান বললো–নূরী আমার মন বলছে সর্দার বেঁচে আছে। নিশ্চয়ই সর্দার গাড়ীখানাতে ছিলো না।
নূরী আর রহমান ফিরে এলো আস্তানায়।
এক সময় কায়েস এসে নুরীর কানে কানে কোন গোপন কথা জানালো।
নূরীর মুখ হাস্যউজ্জ্বল হয়ে উঠলো, বললো সে সত্যি?
• হাঁ, সত্যি! বললো কায়েস।
কায়েস কি বললো নূরীর কানে কেউ জানলো না- কেউ বুঝলো না। নূরীই বা এতো খুশি হলো কেন তাও কেউ জানলো না।
নূরী বনহুরের বিশ্রাম কক্ষে প্রবেশ করে বনহুরের তৈলচিত্র খানার নিচে এসে দাঁড়ালো। দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো নূরীর চোখ দিয়ে।
বনহুর তখন চৌধুরী বাড়ির মনিরার কক্ষে।
মনিরার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে বনহুর।
মনিরা স্বামীর ললাট থেকে চুলগুলি সরিয়ে দিয়ে বললো– তুমি কি পারো না এমনি করে শান্ত থাকতে?
এই তো আছি।
তবু ভয় হয় কখন পালিয়ে যাবে।
গেলেও আবার ফিরে আসবো মনিরা।
তাহলে কি তুমি আবার চলে যাবে?
কি জানি কেন যেন আমার মন স্থির থাকতে চায় না মনিরা। পারি না শান্ত হয়ে থাকতে।
তুমি সব পারো। যে কোন অসাধ্য সাধন করতে পারো তুমি শুধু পারো না তুমি আমার কথা রাখতে।
সেজন্য আমার কি কম দুঃখ মনিরা।
কিন্তু আমি তোমাকে যেতে দেবো না। দুদিন পূর্বে তুমিই না বলেছো দস্যু বনহুর কান্দাই পর্বতে মৃত্যুবরণ করেছে? তাই সত্য দস্যু বনহুর মরেছে আমি ফিরে পেয়েছি আমার স্বামী মনির চৌধুরীকে।
মনিরা।
হাঁ তুমি আমার সেই মনির যাকে একদিন আমি ঝড়ের রাতে নৌকা ডুবিয়ে হারিয়েছিলাম। তোমাকে হারিয়ে সেদিন আমার কচি মনে কি যে ব্যথা লেগেছিলো আজও তা ভুলিনি। তোমাকে আমি আর দস্যুতা করতে দেবো না।
