সর্বনাশ দস্যু বনহুর তবে মরে গেলো?
হাঁ গাড়ীখানার সঙ্গে পুরে ছাই হয়ে গেলো দস্যু বনহুর……….।
নূর হাত তালি দিয়ে আনন্দধ্বনি করে উঠলো–খুব হয়েছে, বেশ হয়েছে দস্যু বনহুর মরেছে………।
মনিরা নূরকে আনন্দিত হতে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো–প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিতে গেলো সে নূরের গালে।
বনহুর খপ করে ধরে ফেললো মনিরার হাতখানা। গম্ভীর কণ্ঠে বললো–মনিরা।
মনিরা তখন রাগে ফুলছে।
নূর হতভম্বের মত তাকিয়ে আছে পিতা এবং মাতার মুখের দিকে সে বুঝতে পারছে না হঠাৎ তার উপর আম্মি রেগে গেলো কেনো।
বনহুর নূরকে আদর করে বললোর যাও তত বাপ তোমার দাদীমা কি করছেন দেখবে যাও।
নূর মনটা ভার করে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে।
বনহুর এবার মনিরাকে লক্ষ্য করে বললো–মনিরা এ তোমার ভারী অন্যায়। নূরকে অমন করে মারলে কেন?
এক-শো বার মারবো। হাজার বার মারবো। তোমাকেও মারবো, আমার কাছে তোমাদের কারো রেহাই নেই……….।
বনহুর নিজের গালটা এগিয়ে দেয় মনিরার দিকে নাও নূরের বদলে আমাকে মারো।
মনিরা না হেসে পারলো না, তবু ছোট্ট একটা চড় বসিয়ে দিলো সে বনহুরের গালে।
বনহুর হেসে উঠলোমশা মারলে না আদর করলে? সন্তানের বেলায় প্রচণ্ড আঘাত আর স্বামীর বেলায় কোমল পরশ, চমৎকার।
যাও তোমার সঙ্গে কথা বলব না আর। চলে যাচ্ছিলো মনিরা।
বনহুর ওকে ধরে ফেললো খপ্ করে, টেনে নিলো নিবিড় করে। বাহু-বন্ধনে আবদ্ধ করে বললো–মনিরা কিছুদিনের জন্য নিশ্চিন্ত হলাম। যখন খুশী এসে তোমাকে দেখে যেতে পারবো। মার কদমবুসী করতে পারবো। নূরকে আদর করতে পারবো। পুলিশ দস্যু বনহুরের জন্য আর। কোন পাহারার ব্যবস্থা রাখবে না। কান্দাই-পর্বতের পাদমূলে দস্যু বনহুরের মৃত্যু ঘটেছে।
আবার ঐ সব অলক্ষণে কথা? যাও তুমি বড় ইয়ে। ছেড়ে দাও আমাকে।
উ হু তা হবে না। আজ ছাড়বো না তোমাকে।
ছিঃ লক্ষীটি ছেড়ে দাও, কেউ এসে পড়বে।
যদি না ছাড়ি।
লজ্জা নেই তোমার!
লজ্জা, কিসের লজ্জা? আমি তো কোন অন্যায় করছি না। তুমি তো আমারই….
ঠিক সেই মুহূর্তে সরকার সাহেবের কণ্ঠস্বর শোনা যায়–মনিরা মা, মনিরা মা……….।
বনহুর মনিরাকে বাহুমুক্ত করে দেয়।
হাসে মনিরা–এবার হলো তো?
ততক্ষণে সরকার সাহেব কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করেন। বনহুরকে লক্ষ্য করে বলে উঠলেন। তিনি–ছোট সাহেব পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ ইয়াসিন এসেছেন।
মনিরার দু’চোখে ভীতিভাব ফুটে উঠে।
বনহুর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে–কোথায় তিনি?
হল ঘরে বসেছেন।
চলুন আসছি। বনহুর সরকার সাহেবকে অনুসরণ করে।
মনিরা ভয়-বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে তাকায়, স্বামীর অমঙ্গল আশঙ্কায় দুলে উঠে তার মন। সেও পিছু পিছু অনুসরণ করলো বনহুর আর সরকার সাহেবকে।
দরজার আড়ালে এসে দাঁড়ালো।
বনহুর কক্ষে প্রবেশ করতেই মিঃ ইয়াসিন আসন ত্যাগ করে হ্যান্ডসেফ করলেন।
বনহুর এবং মিঃ ইয়াসিন এক সঙ্গে আসন গ্রহণ করলেন। সরকার সাহেব এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন তার মুখমণ্ডলে দুঃশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে। তিনি উৎকুণ্ঠিতভাবে প্রতিক্ষা করছেন না জানি কি বিভ্রাট ঘটবে এবার।
মিঃ ইয়াসিন বলে উঠলেন–একটা দুঃসংবাদ নিয়ে আমি এসেছি মিঃ চৌধুরী। দস্যু বনহুর কাল মৃত্যু বরণ করেছে।
এ সংবাদ আমরা পত্রিকার মাধ্যমে অবগত হয়েছি ইন্সপেক্টার। কথাগুলো বনহুর অত্যন্ত বেদনা-ভরা কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন।
মিঃ ইয়াসিনের মুখেও একটা ব্যথার ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। তিনি বললেন–পুলিশের লোক হলেও আমি দস্যু বনহুরকে সমীহ করতাম। সে ছিলো দেশের একজন হিতৈষী বন্ধু। মিঃ চৌধুরী আপনার আত্মীয় ছিলো দস্যু বনহুর, এটা শুধু আপনার গর্ব নয় আপনাদের বংশের গর্ব।
পুলিশ ইন্সপেক্টারের মুখে এ ধরনের কথা শুনে সরকার সাহেব খুশি হলেন, তিনি নাস্তার জন্য ভিতরে চলে গেলেন।
মিঃ ইয়াসিন বলে চলেছেন–আমি পারলাম না থাকতে, তাই সকলের অজ্ঞাতে এসেছি। আমি আপনাদের দুঃখে দুঃখ জানাতে।
বনহুর বললো– বনহুরের প্রতি আপনার এতো হৃদয়তা ছিলো জেনে সত্যি আমি আনন্দিত। পুলিশ অফিসার হয়েও আপনি তাকে চিনতে পেরেছিলেন। তার অন্তরের কথা আপনি অনুভব করেছিলেন আপনার অন্তর দিয়ে।
*
হাঁ মিঃ চৌধুরী আমি তার আসল রূপ দেখেছিলাম। যত বড় দস্যুই সে হোক তার অন্তরের কাছে আমরা পরাজিত হয়েছি। এই পৃথিবীতে কত লোক আছে, কিন্তু ক’জন কাঁদে পরের ব্যথায়? ক’জন পরের জন্য নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিতে পারে? দস্যু বনহুরকে আমি শ্রদ্ধা করি ……তার আত্মার শান্তি কামনা করি ….. কণ্ঠ ধরে আসে মিঃ ইয়াসিনের।
বনহুরের চোখ দুটোও অশ্রু ছল ছল হয়ে উঠলো। মিঃ ইয়াসিনের আবেগ-ভরা কথাগুলো তার মনকে বিচলিত করে তুললো।
সরকার সাহেব বয়ের হাতে নাস্তার প্লেট আর চা নিয়ে হাজির হলেন।
বনহুর নিজ হাতে পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ ইয়াসিনকে পরিবেশন করে খাওয়ালেন। তারপর, তাঁকে গাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলো এক সময় মনিরার পাশে।
মনিরাকে লক্ষ্য করে বললো বনহুর– মনিরা শুনলে তো সব?
হাঁ শুনেছি।
দস্যু বনহুরের মৃত্যুতে পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ ইয়াসিন দুঃখিত। আজ আমি আশ্বস্ত মনিরা, দস্যু বনহুরকেও মানুষ ভালবাসতে পেরেছে। সত্যি আজ আমার বড় আনন্দ হচ্ছে নিজের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে…….
মনিরা ক্রুব্ধ কণ্ঠে বললো তোমাকে আর বক্ বক্ করতে হবে না। চুপ করো, বলছি ……স্বামীর মুখে হাত চাপা দেয় মনিরা।
