তামাসা করলে তাই না?
কতকটা তাই। পুলিশের ভ্যানের পাশেই ছিলো পুলিশ সুপারের জীপখানা। চাকরের ড্রেসে অতি সচ্ছন্দে বেরিয়ে এলাম বাড়িটার বাইরে তারপর চেপে বসলাম গাড়িতে। পুলিশ সুপারকে অবগতির জন্য হর্ন দিলাম।
আশ্চর্য মানুষ তুমি?
আশ্চর্য নয় মনিরা অদ্ভুত বল।
হাঁ তাই। বলো তারপর কি করলে?
এমন সময় নূর এসে পড়ে সেখানে–আব্বু তুমি আম্মিকে গল্প শোনাচ্ছো?
মনিরা বললো–তুমি যাওতো বাবা, বাইরে খেলোগে।
না আমিও গল্প শুনবো।
বনহুর পুত্রকে টেনে নিলো কোলের মধ্যে–আচ্ছা বলছি শোন।
মনিরা অবাক হয়ে তাকালো স্বামীর মুখের দিকে। নূরের কাছে সে কি সব কথা বলে ফেলবে তাহলে।
বনহুর তখন বলতে শুরু করে দিয়েছে–দস্যুটা গাড়িতে স্টার্ট দিতেই ছুটে বেরিয়ে এলো পুলিশ সুপার দলবল নিয়ে।
নূর বলে উঠলো–দস্যু, কোন দস্যু আব্বু?
বনহুর মাথা চুলকালো।
ততক্ষণে বলে উঠলো নূর-দস্যু বনহুর বুঝি?
মনিরা পুত্রের প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো।
বনহুর স্ত্রীর চোখে চোখ রেখে ইশারা করে তাকে চুপ থাকতে বললো।
নূর পুনরায় প্রশ্ন করলো-আব্বু বনহুরকে তুমি দেখেছো?
বনহুর মুখভাবে ভীতিময় চিহ্ন এঁকে বললো–ওরে বাবা দস্যু বনহুরকে দেখলে আমি মরেই যাবো ভয়ে। লোকের মুখে শুনেছি……….
দেখোনি তা হলে?
না আব্বু না আমি দস্যু বনহুরকে মোটেই দেখিনি। কথাটা বলে একবার মনিরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে বনহুর।
মনিরা ক্রুদ্ধ হবার ভান করে বলে মিথ্যা বলতে একটুও বাধে না তোমার?
নূরকে অন্যমনস্ক করার জন্য বলে বনহুর-নূর তুমি শোন, হাঁ কি বলছিলাম?
নূর বলে উঠে–দস্যুটা গাড়িতে বসে স্টার্ট দিলো অমনি বেরিয়ে এলো পুলিশ সুপার দলবল নিয়ে।
ওহ এবার মনে পড়েছে। দস্যুটা গাড়ী নিয়ে ছুটলো, পুলিশ সুপার পুলিশ-ফোর্স নিয়ে ছুটলো দস্যুর গাড়িখানার পিছনে। দস্যু বনহুর ইচ্ছা করলে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে শহরের জনমুখর রাজপথের অগণিত যানবাহনের মধ্যে অন্তর্ধান হতে পারতো। কিন্তু সে তা না করে পুলিশ-ফোর্স এবং অফিসারগণকে নাকানি-চুবানি খাওয়ানোর জন্য বড় সখ হলো তার।
মনিরা আর বনহুর আবার দৃষ্টি-বিনিময় হলো। মনিরার চোখে মুখে রাগ অভিমান ঝরে পড়ছে। পুত্রের সম্মুখে কিছু বলতেও পারছে না সে।
বনহুর নূরকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো আর কথাগুলো বলে যাচ্ছিলো, মাঝে মাঝে সিগারেট থেকে ধুম্ররাশি উদগীরণ করছিলো সে।
নূর পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে নিস্পলক নয়নে। কথাগুলো সে অবাক হয়ে শুনে যাচ্ছিলো। দস্যু বনহুরের কথা এটা কম ব্যাপার নয়। সাংঘাতিক সংবাদ যেন শুনছে নূর। বনহুর একটু থামতেই বলে উঠে নূর–বললো না আবু তারপর কি হলো?
বনহুর সমস্ত ঘটনা বললো।
দু’চোখে বিস্ময় নিয়ে শুনছিলো নূর।
মনিরাও কম আশ্চর্য হয়নি, স্বামীর দুঃসাহসপূর্ণ কার্যকলাপ তাকে একেবারে বিস্ময়াহত করে তোলে।
বনহুর বলে চলেছে–পর্বতের গা বেয়ে যখন দস্যু বনহুরের গাড়িখানা এগুচ্ছিলো তখন মাত্র কয়েক গজ দূরে ছিলো পুলিশ ভ্যান। ভ্যানের উপরে গুলি ভরা রাইফেল উদ্যত করে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ-ফোর্স।
হঠাৎ বলে উঠলো নুর–আমি হলে এক গুলি মেরে দস্যু বনহুরকে খতম করে দিতাম।
পুত্রের কথায় হঠাৎ মনিরা রাগ চেপে রাখতে পারলো না। ঠাই করে একটা চড় বসিয়ে দিলো সে নূরের গালে।
বনহুর সঙ্গে সঙ্গে নূরকে টেনে নিলো বুকের মধ্যে, বললো–একি করলে মনিরা?
ঠিক করেছি–
নূর কাঁদতে গিয়ে পিতার বুকে মুখ গুঁজে নিজকে সংযত করে নিলো, সে ভেবে পাচ্ছে না হঠাৎ তার আম্মা তাকে এমন করে মারলো কেন। সেতো কোনো অপরাধ করেনি। দস্যু বনহুরকে গুলি করে খতম করে দিতো এইতো বলেছে মাত্র।
বনহুর বললো–নূর লক্ষী আব্বু আমার, তুমি কেঁদো না। দস্যু বনহুরকে খতম করবে না তো কি তাকে আদর করবে তুমি? ঠিক বলেছো নূর একেবারে খাঁটি কথা বলেছে। হাঁ তারপর কি বলছিলাম শোন?
নূর পিতার আদরভরা কণ্ঠে মায়ের চড়ের কথা ভুলে গেলো, তাকালো সে বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর স্নেহমাখা কন্ঠে বললো–বড় হও তারপর দস্যু বনহুরকে পাকরাও করো……….।
মনিরা স্বামীর মুখে হাত চাপা দিলো–থা আর বলতে হবে না।
বনহুর স্ত্রীর হাতখানা মুঠায় চেপে ধরলো–দস্যু বনহুরের প্রতি তোমার এতো দরদ কেন শুনি?
মনিরা বললো–যাও আর নেকামি করতে হবে না। বলল দস্যুটা কি করলো তারপর?
ও তাহলে শুনবে তুমি? আচ্ছা বলছি–সম্মুখে কয়েক গজ দূরে দস্যু বনহুরের জীপ আর পিছনে উদ্যত রাইফেল হস্তে পুলিশ-ফোর্স সহ পুলিশ ভ্যান। দু’খানা গাড়ি এমন জায়গায় এসে পড়েছে যেখানে প্রতি মুহূর্তে রয়েছে মৃত্যুর আশঙখা। এক পাশে সুউচ্চ পর্বতমালা অন্যপাশে বিরাট খাদ। একটু ভুল হলে হাজার ফিট নিচে পড়ে গাড়িখানা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। এই মৃত্যু ভয়াল পথ বেয়ে গাড়ি দু’খানা তীর বেগে ছুটে চলেছে পর্বতের গা বেয়ে উঁচু-নীচু পথ, পাথরে হোঁচট খেয়ে খেয়ে ছুটছিলো গাড়ি দুখানা। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য হঠাৎ একটা ধাক্কা খেয়ে সম্মুখের গাড়িখানা ছিটকে পড়ে গেলো একেবারে হাজার ফিট নিচে।
নূর চমকে উঠলো, দু’চোখে বিস্ময় নিয়ে বললো–দস্যু বনহুরের গাড়িখানা পড়ে গেলো আব্বু?
হাঁ দস্যু বনহুরের গাড়িখানা পড়ে গেলো নিচে। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িখানা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো, আগুন ধরে গেলো গাড়িখানাতে।
