এখন গাড়ি দুটো পৃথিবীর মাটি ছেড়ে প্রায় হাজার ফিট উপরে উঠে গেছে। পুলিশ ভ্যানের আরোহীগণের প্রত্যেকের মুখমণ্ডল লালে লাল হয়ে উঠেছে। মাথার উপরে প্রখর সূর্যের তাপ অগ্নি বর্ষণ করছে। ঘেমে নেয়ে উঠেছে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। মিঃ আরিফ এবং মিঃ ইয়াসিনের মুখমণ্ডল রক্তাভ লাগছে। রাগে ক্ষোভে অধর দংশন করছেন মিঃ আরিফ।
সম্মুখ গাড়িখানা পর্বতের গায়ে একটা বাঁকে অদৃশ্য হলো। পিছনের গাড়িখানা দ্রুত এসে পড়লো বাকের মুখে।
মিঃ আরিফ বললেন–ড্রাইভার সম্মুখের গাড়িখানাকে কিছুতেই দৃষ্টির আড়াল হতে দেবেন না।
ড্রাইভার বললো–স্যার আমি প্রাণপণে চেষ্টা করছি, কিন্তু আশ্চর্য সম্মুখ গাড়িখানাকে কিছুতেই সীমার মধ্যে আনতে সক্ষম হচ্ছিনা।
মিঃ ইয়াসিন বললেন–গাড়িখানা যেভাবে ছুটছে যে কোন মুহূর্তে এক্সিডেন্ট হওয়া স্বাভাবিক।
মিঃ আরিফ বললেন–আমাদের গাড়িখানাও যে কোন সময় পর্বতের নিচে পড়ে চূর্ণ হয়ে যেতে পারে। ড্রাইভার সাবধানে গাড়ি চালাবে।
ড্রাইভার বললো–সে জন্য আমি এতক্ষণ———
কথা শেষ হয় না ড্রাইভারের সম্মুখের গাড়িখানা পর্বতের গায়ে আচম্কা ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে যায় একেবারে হাজার ফিট নিচে। গভীর একটা খাদের মধ্যে গাড়িখানা পড়ে গিয়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো।
মিঃ আরিফ আনন্দধ্বনি করে উঠলেন–দস্যু বনহুর আজ নিঃশেষ হয়ে গেলো।
মিঃ ইয়াসিনের মুখখানা কেমন যেন ভাব-গম্ভীর হয়ে উঠেছে, তিনি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন–শেষ পরিণতি এই ছিলো।
পুলিশ-ফোর্স যার যার উদ্যত রাইফেল নত করে নিয়েছে।
পুলিশ ভ্যানখানা এসে থামলো একেবারে সেই জায়গায় যেখানে পর্বতের গায়ে টক্কর খেয়ে দস্যু বনহুরের জীপখানা হাজার ফিট নিচে পাথরের খাদে পড়ে গুড়ো হয়ে গেছে।
মিঃ আরিফ গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন।
মিঃ ইয়াসিনও নামলেন।
অন্যান্য পুলিশ-ফোর্স পর্বতের গায়ে সরু পথটার উপরে নেমে দাঁড়িয়েছে। সবাই ঝুঁকে দেখছে নীচে গড়িয়ে পড়া গাড়িখানার নির্মম অবস্থা।
গভীর খাদের মধ্য হতে একটা ধূম্ররাশি কুণ্ডলি পাকিয়ে উপরের দিকে উঠে আসছিলো। সবাই বুঝতে পারলো গাড়ি খানাতে আগুন ধরে গেছে।
মিঃ আরিফ এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, বললেন বিশ্ব বিখ্যাত দস্যু বনহুর আজ চিরতরে নিঃশেষ হলো।
*
মনিরার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে স্বয়ং দস্যু বনহুর। চোখে-মুখে তার উজ্জল হাসির উচ্ছ্বাস, স্থির নয়নে তাকিয়ে আছে সে স্ত্রীর মুখের দিকে।
মনিরা স্বামীর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো, মুখোভাব ঠিক্ আনন্দ-দীপ্ত না হলেও মনের গহনে যে একটা অনাবিল শান্তির উৎস বয়ে চলেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। স্বামীকে নিবিড় করে পাওয়া যে তার চরম ভাগ্য।
বনহুরের হাতে একটি পত্রিকা।
চোখের সম্মুখে বনহুর মেলে ধরলো পত্রিকাখানা। তারপর পড়তে লাগলো–কান্দাই পর্বত হতে এক হাজার ফিট নিচে পড়ে গিয়ে দস্যু বনহুরের মর্মান্তিক মৃত্যু।……………..
মনিরা স্বামীর মুখে হাত চাপা দেয়–চুপ করো, আর আমি শুনতে চাই না। চুপ করো—
বনহুর পত্রিকাখানা পাশে রেখে সোজা হয়ে উঠে বসলো, মনিরার চোখে চোখ রেখে বললো–মনিরা দস্যু বনহুর কাল কান্দাই পর্বতের গভীর খাদে পড়ে চিরদিনের জন্য নিঃশেষ হয়ে গেছে–
আবার তুমি ঐ কথা শুরু করলে?
শুনতে চাও না কি করে এই নির্মম মৃত্যু থেকে বেঁচে গেলাম? সে এক অদ্ভুত ব্যাপার।
তোমার সবই তো অদ্ভুত; কোনটা অদ্ভুত নয় বলো?
হাঁ, কি বলছিলাম?
বলছিলে, পুলিশ যখন ভূপতিনাথ বাবুর বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করলো তখন তুমি..
হাঁ এবার মনে পড়েছে তখন আমি রান্না ঘরে প্রবেশ করে চাকরের জামা-কাপড়গুলো পরে নিচ্ছিলাম, ভাগ্যিস তখন চাকরটা বাসায় ছিলো না। হল ঘর থেকে হুকুম এলো চা তৈরির, কি করবো চা তৈরি করে নিয়ে গেলাম হুজুরদের সামনে।
অবাক কণ্ঠে বললো মনিরা–চা তৈরি করতে পারলে তুমি?
কি যে বলো সামান্য কয়েক কাপ চা, তাই তৈরি করতে পারবো না? উনোনে আগুন ধরানোই ছিলো, দেখলাম ওপাশে একটা ডেকচি? চায়ের না তরকারীর?
তা কেমন করে বলবো। দেখলাম উনোনের ওপাশে একটা ডেকচি কাৎ হয়ে পড়ে আছে, বোধ হয় তরকারীর ডেকচিই হবে। আমি সেটাতে পানি বসিয়ে দিলাম…..
তারপর কি করলে শুনি?
পানি গরম হলে, পাশেই একটা কৌটা দেখলাম সেটা খুলে খানিকটা গুড়ো ঢেলে দিলাম ডেচিটার মধ্যে।
সেটা চায়ের গুড়ো ছিলো?
কি জানি কেমন করে বলবো, লালের মত দেখলাম গুড়োগুলো।
সর্বনাশ ঠিক্ মরিচের গুড়ো ছিলো ওটাতে।
তা হতে পারে। কাপগুলো ওপাশেই ছিলো কাপে সেই পানিগুলো ঢেলে পাশের বয়াম থেকে চিনি বের করে মিশিয়ে নিলাম……….
বয়াম! বয়ামে চিনি? ঠিক লবণ ছিলো বয়ামে।
হয়তো তাই হবে, দেখলাম দানাগুলো বেশ মোটা…..
ছিঃ ছিঃ ছিঃ শেষ পর্যন্ত চা তৈরি করতে গিয়ে ঝাল পানি তৈরি করেছিলে?
বুঝেছি সে জন্যই ধরা পড়ে গিয়েছিলে।
উঁহু মোটেই না। চা তৈরি ব্যাপারে কিছু ঘটেনি, যত সব বিভ্রাট ঘটেছে। বেটা চাকর ছোরাটা হঠাৎ বাজার থেকে ফিরে আসায়।
আর তুমি উধাও হলে?
ইচ্ছা করলে উধাও হতে পারতাম কিন্তু পুলিশকে একটু……..।
বুঝেছি নাজেহাল করাই ছিলো তোমার উদ্দেশ্য।
হাঁ মনিরা, কারণ অযথা পুলিশ আমাকে নিয়ে এমন মাথা ঘামায় কেন। যেদিকে তাদের খেয়াল রাখা দরকার সেদিকে খেয়াল না রেখে আলেয়ার পিছনে ছুটে মরে ওরা। তাই একটু
