হাঁ, অনেক খুঁজেও কাউকে পেলাম না। শুধু আপনার চাকর ছোকড়াটা……
মিঃ মুর্শেদের কথায় বললেন ভূপতিনাথ বাবু– চাকর ছোরাটা বোধ হয় বাজারে গেছে…..
হাত কচলে দরজায় এসে দাঁড়ায় চাকর ছোঁকড়া– হুজুর আমি এসে গেছি। চা আনব?
ভূপতিনাথ চোখে কম দেখেন কানেও কম শোনেন, তিনি বললেন– কে পরেশ এসেছিস্?
না, যাইনি এখনও বাজারে।
যাসনি?
্না হুজুর। চা আনবো?
হাঁ নিয়ে আয়।
চাকর পরেশ চলে গেলো।
মিঃ আরিফ, মিঃ ইয়াসিন, মিঃ মুর্শেদ আসন গ্রহণ করেছেন।
ভূপতিনাথও বসে পড়েছেন মাঝখানের আসনে, তার সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে চপসে গেছে। একেবারে। মিঃ ইয়াসিন উঠে গিয়ে ফ্যানের স্পীড় বাড়ীয়ে দিয়ে ফিরে এলেন।
একটু পরে চাকর চা নিয়ে ফিরে এলো। মাঝের টেবিলে চা সাজিয়ে রেখে বললো চাকর চা খেয়ে নিন স্যার।
ভূপতিনাথ চাকরের দিকে তাকালেন, চোখে তো তিনি ভাল দেখেন না, তবু ওকে লক্ষ্য করে বললেন–অতিথি এসেছেন, শুধু চা এনেছিস?
হাত কচলে বলে চাকর–হুজুর তাড়াহুড়ো করে…..
মিঃ আরিফ বললেন–ঠিক্ আছে, চা-তেই চলবে।
দস্যু বনহুর গ্রেপ্তারের আসা ত্যাগ করে আরিফ সাহেব এবং পুলিশ অফিসারদ্বয় চায়ের কাপ হাতে উঠিয়ে নিলেন।
চাকর তখনও পাশে দাঁড়িয়ে।
চোখে-মুখে কালির ছাপ, মাথায় গামছা জড়ানো। একটা ময়লা লুঙ্গী পরা। গায়ের গেঞ্জিটাও ময়লা তেলচিটে, এখানে সেখানে কালি মাখা।
মিঃ আরিফ, মিঃ ইয়াসিন মিঃ মুর্শেদ চায়ের কাপে চুমুক দিতেই এক সঙ্গে থু থু করে উঠলেন চা তো নয় যেন লবণের গরম সরবত।
ভূপতিনাথ বাবু নিজেও ফুঃ করে সম্মুখে ছুঁড়ে ফেললেন মুখের চাগুলো, ঢোক গিলে বললেন–শয়তান এ সব কি চা তৈরি করেছিসলবণ–মরিচের গুড়ো দিয়ে….
ঠিক সেই মুহূর্তে দু’জন পুলিশ একটা ছোঁকড়াকে পাকড়াও করে আনে। ছোঁড়ার হাতে বাজারের থলে। ছোঁকড়াটা হাউমাউ করে কাঁদছে।
ভূপতিনাথ এবং পুলিশ অফিসারগণ অবাক হয়ে তাকান পুলিশ এবং থলে হাতে ছোঁকড়াটার দিকে।
পুলিশ দু’জনার একজন বলে উঠলো–স্যার এই লোকটা বাসার ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলো। আমরা বাধা দিলে বলে আমি এই বাসার চাকর বাজারে গিয়েছিলাম বাজার করতে। স্যার আমরা ওকে পাকরাও করে এনেছি।
ভূপতিনাথ চোখের চশমটা ভালভাবে নাকের উপর তুলে দিয়ে তাকালো চাকরটার দিকে আরে পরেশ যে, চা তৈরি করে বাইরে গিয়েছিলি কখন?
পরেশ কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো–হুজুর আমি তো বাজারে গিয়েছিলাম, এই মাত্র ফিরছি। চা-তো তৈরি করিনি।
মিঃ আরিফ, মিঃ ইয়াসিন, মিঃ মুর্শেদ এঁরা তো একেবারে হাবা বনে গেছেন, একটু পূর্বে যে লোকটা তাদের সম্মুখে চা রেখে গেলো সে তো এ নয়।
বললেন মিঃ আরিফ-ভূপতিনাথ বাবু এটাই কি আপনার বাসার একমাত্র চাকর পরেশ?
হাঁ এই আমার একমাত্র চাকর পরেশ, খুব ভাল বিশ্বাসী বলেই আমি……….
কিন্তু একটু পূর্বে যে লোকটাকে আপনি পরেশ বলে চা তৈরির আদেশ দিলেন সে কে?
আমিও তো তাই ভাবছি……….কে সে?
মিঃ আরিফ তখন লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, চিৎকার করে বললেন–আপনি আমাদের খোকা দিয়েছেন? এরেস্ট করো তোমরা ভূপতি বাবুকে। সব চালাকী এর। মিঃ ইয়াসিন আপনি দেখুন ঐ লোকটা কোথায় গেলো? নিশ্চয়ই সে দস্যু বনহুর…
ঠিক সেই সময় বাইরের গেটে মোটর স্টার্টের শব্দ শোনা যায়।
পুলিশ সুপার হুঙ্কার ছাড়েন–দেখো গাড়ি নিয়ে ঠিক পালালো বুঝি……….
দু’জন পুলিশ হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসে। ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠে একজন–স্যার চাকরটা গাড়ী নিয়ে পালিয়েছে।
এক সঙ্গে পুলিশ অফিসারয় ছুটলেন বাইরের গেটের দিকে।
মিঃ আরিফ চিৎকার করে বললেন মিঃ ইয়াসিন পুলিশ ফোর্স নিয়ে পিছা করুন। দস্যু বনহুর আমাদের জীপ্ নিয়ে ভেগেছে। পুলিশ ভ্যান নিয়ে পিছা করুন।
পুলিশ সুপার এবং মিঃ ইয়াসিন পুলিশ-ফোর্স সহ পুলিশ ভ্যানে চেপে বসলেন। গাড়ী সম্মুখের জীপটাকে লক্ষ্য করে উল্কা বেগে ছুটতে শুরু করলো।
মিঃ আরিফ হাতের পিস্তল সম্মুখে উদ্যত করে রাখলেন। তিনি ঠিক ড্রাইভারের পাশের আসনে বসেছেন।
পুলিশ-ফোর্স প্রত্যেকে সম্মুখস্থ জীপ লক্ষ্য করে রাইফেল উদ্যত করে ধরে আছে, নাগালের মধ্যে এলেই গুলি ছুড়বে তারা।
সম্মুখের গাড়িখানা তীর বেগে ছুটছে।
গাড়ীখানা যে দস্যু বনহুর স্বয়ং চালাচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। পুলিশ ভ্যানের দক্ষ পুলিশ ড্রাইভারও হার মেনে যাচ্ছে অগ্রগামী গাড়িখানার কাছে।
সম্মুখের জীপখানা অল্পক্ষণে বেরিয়ে এলো জনমুখর পথ ত্যাগ করে নির্জন পথে। এ পথ সে পথ করে গাড়ী দু’খানা তীরবেগে ছুটছে।
কান্দাই পর্বত অভিমুখে সম্মুখ গাড়িখানা অগ্রসর হচ্ছে।
পিছনে পুলিশ ভ্যান যমদূতের মত এগিয়ে চলেছে।
মাঝে মাঝে ভ্যান থেকে ফায়ার হচ্ছিলো আগের জীপখানা লক্ষ্য করে। কিন্তু নাগালের মধ্যে গাড়ীখানা না থাকায় রাইফেলের গুলি ব্যর্থ হচ্ছিলো।
ঘণ্টা কয়েক কেটে যায়।
দু’খানা গাড়ী যেন রকেটের মত পর পর ছুটে চলেছে।
কান্দাই পর্বতের পাদমূল ধরে অগ্রসর হচ্ছে সম্মুখ গাড়িটা। উঁচুনীচু মেঠো পথ, গাড়িটা যেন লাফিয়ে লাফিয়ে এগুচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সম্মুখ গাড়ীখানা কান্দাই পর্বতের গা বেয়ে সঙ্কীর্ণ পথ ধরে উপরে উঠতে লাগলো।
পিছনের গাড়িখানাও ফলো করলো সনুক গাড়ীখানাকে।
পর্বতের গা বেয়ে পথটা উঠে গেছে উপরের দিকে, কখনও বা পর্বতের গা বেয়ে নেমে এসেছে কিছুটা নিচের দিকে। আঁকাবাঁকা পাথুরে পথ, এক পাশে সুউচ্চ কান্দাই পর্বত আর এক পাশে গভীর খাদ। একটু যদি গাড়ি চালনায় ভুল হয় বা গাড়ির কোন মেসিন নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সর্বনাশ হবে। গাড়িখানা পর্বতের নিচে পড়ে গিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে।
