কিন্তু এখন ভাববার সময় নেই তাকে এই মুহূর্তে পুলিশ ফোর্স নিয়ে যেতে হচ্ছে সাইরোন রোডের ১১নং বাড়িতে। মিঃ ইয়াসিন তবু মন থেকে ভাবনা দূর করতে পারলেন না। দস্যু বনহুর একবার নয় কয়েকবার এসেছে তার সম্মুখে কিন্তু তার আসলরূপ এখনও দেখেন নি তিনি। একদিন গভীর রাতে প্রথম যে দিন দস্যু বনহুর তাঁর বিশ্রামকক্ষে আচমকা আর্বিভাব হয়েছিলো সেদিনও বনহুরের মুখমণ্ডলের নিচের সম্পূর্ণ অংশ ঢাকা ছিলো কালো আবরণে। দ্বিতীয়বার ও তার। মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত ছিলো পূর্বের মতই। মিঃ ইয়াসিনের সম্মুখে দস্যু বনহুর কয়েকবার আবির্ভূত হয়েছে বটে কিন্তু তার আসল রূপ কেমন জানে না তিনি আজও।
মিঃ ইয়াসিন বিলম্ব করার সুযোগ পেলেন না, তিনি পুলিশ ফোর্স নিয়ে তখনই মিঃ মুর্শেদের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী রওনা দিলেন।
ততক্ষণে মিঃ মুর্শেদও তার সহকারী মিঃ জামানসহ এসে পড়েছেন– যে বাড়ির গেটে কিছু পূর্বে দস্যু বনহুরকে নামিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
পুলিশ-ফোর্স পৌঁছে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িখানাকে ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিলেন মিঃ মুর্শেদ।
সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ-ফোর্স বাড়িখানাকে ঘেড়াও করে ফেললো মিঃ মুর্শেদ স্বয়ং পুলিশ সুপার মিঃ আরিফ, মিঃ ইয়াসিন গুলিভরা পিস্তল হাতে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলেন।
হল ঘরে প্রবেশ করতেই বাড়ির মালিক প্রৌঢ় ভূপতিনাথ হা হা করে উঠলেন– আপনারা কি চান? আপনারা কি চান? ভূপতিনাথের চোখে মুখে রাজ্যের ভীতি আর বিস্ময়। হঠাৎ পুলিশ অফিসারগণ পিস্তল হাতে তার বাড়িতে কেনো।
মিঃ মুর্শেদ সর্বাগ্রে, তিনি বললেন–খবরদার একচুল নড়বেন না।
মিঃ আরিফ তার বুকের কাছে পিস্তল বাড়িয়ে ধরে বললেন– জানেন কেন এসেছি, তবু কেনো নেকামি করছেন? বলুন দস্যু বনহুর কোথায়?
দস্যু বনহুর! ভূপতিনাথ যেন ভূত দেখার মতই চমকে উঠলেন। আবার বললেন ভূপতিনাথ দস্যু বনহুর– কোথায় দস্যু বনহুর?
বললেন মুর্শেদ আহম্মদ আপনার বাড়ির মধ্যে সে আছে।
অবাক কণ্ঠে বললেন ভূপতিনাথ– আমার বাড়ির মধ্যে সে আছে বলেননি! দস্যু বনহুর আমার বাড়ীতে…..
পুলিশ সুপার কয়েকজন পুলিশকে বাড়ির ভিতরে অনুসন্ধান করে দেখার জন্য নির্দেশ দিলেন।
মিঃ মুর্শেদ এবং মিঃ ইয়াসিন ভূপতিনাথকে কড়া পাহারায় রেখে মিঃ আরিফ নিজে পুলিশসহ বাড়ীখানাকে তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করলেন। কিন্তু কোথাও দস্যু বনহুরকে খুঁজে পাওয়া গেলো না।
মিঃ আরিফ অন্যান্য পুলিশ সহ ফিরে এলেন হল ঘরে, রাগে ক্ষোভে গস গস করছেন তিনি। হল ঘরে প্রবেশ করেই ভূপতিনাথকে লক্ষ্য করে বললেন– এই বুড়োই স্বয়ং দস্যু বনহুর। মিঃ মুর্শেদ ওর মুখের দাড়ি-গো খুলে নিন।
অবাক হয়ে তাকালেন মিঃ মুর্শেদ মিঃ আরিফের মুখের দিকে। এ সব নকল। খুলে নিন মিঃ মুর্শেদ……
পুলিশ সুপারের আদেশে মিঃ মুর্শেদ ভুপতিনাথের দাড়ি ধরে হেঁটকে টান দিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে আর্ত-চিৎকার করে উঠলেন বৃদ্ধ ভূপতিনাথ। উঃ মাগো, মেরে ফেলেছে…..মেরে ফেলেছে……।
মিঃ আরিফ বললেন– সব নেকামি খুব জোড়ে টেনে দেখুন……
মিঃ মুর্শেদ আবার জোরে টান দিতেই পুনরায় হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলেন– তোমরা আমার দাড়ি টানছো কোনো? আমি কি অপরাধ করছি তোমাদের কাছে?
ধমক দিলেন মিঃ আরিফ– তুমিই দস্যু বনহুর।
এ আপনারা কি বলছেন? আমি আমি দস্যু বনহুর?
হাঁ, তোমার ছদ্মবেশ আমার কাছে আর চলবে না। একটু পূর্বে আমারই বাল্য বন্ধু সেজে আমার অফিসে আমার পাশের আসনে বসে আমাকে খুব ধোকা দিয়েছিলে। এবার আমি তোমার দাড়ি খুলে নেব। কথা শেষ করে মিঃ আরিফ ভুপতি-নাথের দাড়ি আর গো ধরে খুব জোরে টান মারলেন।
এবার ভূপতিনাথ খামচে ধরলেন মিঃ আরিফের আস্তিন আমাকে তোমরা নেকা পেয়েছো……দাঁড়াও……বাবা মেরে ফেলেছে বাবাগো……
সঙ্গে সঙ্গে মিঃ ইয়াসিন এবং মিঃ মুর্শেদ ও পুলিশগণ ভূপতিনাথের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলেন মিঃ আরিফকে।
মিঃ মুর্শেদ বললেন– স্যার, এর দাড়ি-গোঁফ নকল নয়–সম্পূর্ণ আসল।
মিঃ আরিফ নিজে পরীক্ষা করেছেন কাজেই তিনিও বুঝতে পারলেন এর দাড়ি-গোঁফ নকল নয় আসল। এবার তিনি গলার স্বর নরম করে নিয়ে বললেন- আপনার নাম কি?
থর থর করে কাঁপছিলো ভূপতিনাথ, বললো সে আমার নাম ভূপতিনাথ বাবু।
বললেন মিঃ ইয়াসিন– একটু পূর্বে আপনার বাসায় কেউ কি তবে এসেছিলো?
না, আপনারা ছাড়া আজ আমার বাসায় এ পর্যন্ত কেউ আসেনি, আমি একাই হল ঘরে বসে হিসাব-নিকাশ করছিলাম।
মিঃ মুর্শেদ বললেন– এতোবড় বাড়ি নিয়ে থাকেন অথচ বাড়ির মধ্যে কোন জন-প্রাণী নেই কেনো? আপনার পরিবার-পরিজন তারা কোথায় থাকেন?
মিঃ আরিফ বললেন- হাঁ, বলুন দেখি আপনার বাসার লোকজন সব কোথায়?
ভূপতিনাথ বললেন আমার বাসায় আমি একাই থাকি। এবং আমার এক ভৃত্য থাকে। স্ত্রী বিয়োগের পর আমি কোন দ্বার পরিগ্রহণ করি নাই। সংসারের প্রতি আমার কোন মোহ নেই। বুঝলেন? যা এবার বসুন আপনারা।
মিঃ আরিফ বললেন দেখুন আমরা পুলিশ অফিসার। আমরা এখানে বসতে আসিনি। একটু পূর্বে আপনার বাড়ির গেটে দস্যু বনহুর প্রবেশ করেছে জানতে পেরে আমরা এসেছি তাকে গ্রেপ্তার করতে।
কিন্তু দ– দস্যু-বন– হুর গেলো কোথায়? আমার বাড়ির মধ্যে আপনারা তো তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলেন।
