বনহুরের মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে উঠেছে। সে যেমন বসেছিলো তেমনি বসে রইলো।
নূরী বনহুরের পায়ের কাছে বসে দু’হাতে পা চেপে ধরলো–আমাকে তুমি মাফ করো হুর? আমি ভুল স্বীকার করছি…..
বনহুর উঠে দাঁড়ালো, গম্ভীর গলায় বললো–আমাকে বিরক্ত করো না নূরী! যাও এখান। থেকে।
না না আমি যাবো না। আমাকে তুমি তাড়িয়ে দিও না হুর। আমি ভুল বুঝে তোমাকে…..
তোমার কোন কথাই আমি শুনতে চাই না। তুমি যাও নূরী। বনহুর ক্রুদ্ধভাবে সেখান থেকে চলে গেলো।
নূরী থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো, তার মুখে ফুটে উঠলো একটা হাসির রেখা।
*
বনহুর একটা দোকানের সম্মুখে গাড়ি রেখে নামতেই কে যেন পিছন থেকে ডাকলো– ভোলানাথ।
বনহুর ফিরে তাকাতেই দেখলো একটা বৃদ্ধের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে কস্তুরীবাঈ। আজ কতদিন হলো বনহুর ওকে অন্বেষণ করে ফিরেছিলো, খুশিতে উজ্জ্বল হলো বনহুরের চোখ দুটো।
বনহুর তার আংগুলের ফাঁক থেকে অদ্ধদগ্ধ সিগারেটখানা নিক্ষেপ করে এগিয়ে আসে কস্তুরীবাঈ-এর পাশে–কস্তুরী তুমি!
হাঁ, তুমি কোথায় যাবে ভোলানাথ?
সামনের দোকানে।
এটাতো স্বর্ণকারের দোকান।
হঁ এসো আমার সঙ্গে।
কস্তুরীবাঈ বললো–এসো ভোলা আমার বাপুর সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেই।
বনহুর থমকে দাঁড়ালো, ফিরে তাকালো বৃদ্ধের দিকে।
কস্তুরীবাঈ বললো–এ আমার বাপুজী বুঝলে?
বনহুর তীক্ষ্ণ নজরে দেখে নিলো একবার বৃদ্ধের পা থেকে মাথা অবধি।
বৃদ্ধ কিন্তু মুখখানা ফিরিয়ে রেখেছিলো অন্যদিকে। সে চোখ তুলে তাকালো না ভোলানাথের মুখে।
বনহুর কস্তুরীকে লক্ষ্য করে বললো–এসো কস্তুরী।
কস্তুরীবাই বনহুরের সঙ্গে অগ্রসর হলো।
বৃদ্ধ কস্তুরীবাঈ-এর সঙ্গে অগ্রসর না হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো।
বনহুর আড়চোখে কস্তুরীবাঈ–এর কালো আবরণে ঢাকা মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ নিচু করে একটু হাসলো।
উভয়ে প্রবেশ করলো স্বর্ণকারের দোকান মধ্যে।
স্বর্ণকার সসম্মানে বনহুরকে অভিবাদন করে জিজ্ঞাসা করলো।
–কি চাই স্যার?
বনহুর বললো–একটি মূল্যবান অংগুরী দিন।
স্বর্ণকার খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে যে অংগুরী বেশি মূল্যবান সেটা বের করে বনহুরের সম্মুখে রাখলো –নিন এটা বহু মূল্য পাথরে তৈরি অংগুরী।
কস্তুরীবাঈ অবাক হয়ে দেখলো, দু’চোখে তার রাজ্যের বিস্ময়।
বনহুর অংগুরীটা পরীক্ষা করে বললো—-কত দিতে হবে?
স্বর্ণকার অংগুরীর মূল্য বললো।
বনহুর অংগুরীর মূল্য মিটিয়ে দিয়ে, অংগুরীটা হাতে তুলে নিলো।
কস্তুরীবাঈ বললো-ভোলা এ অংগুরী তুমি কাকে দেবে?
আমার প্রেয়সীকে।
প্রেয়সী! কে সে ভাগ্যবতী নারী ভোলানাথ বলবে আমাকে?
যদি বলি তুমি?
কথা বলতে বলতে দোকানের বাইরে এসে দাঁড়ায়।
বৃদ্ধ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে গাড়িখানার দিকে মুখ করে।
বনহুর দাঁড়িয়ে পড়লো।
কস্তুরীবাঈও দাঁড়ালো তার পাশে, জমকালো আবরণে ঢাকা বোরখার ফাঁকে চোখ দুটো তুলে ধরলো বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর বললো–কস্তুরী তুমি আমাকে অনেকবার কুৎসিত কর্ম থেকে বিরত রেখেছো তাই আমি তোমাকে…..বনহুর কস্তুরীবাঈ–এর হাতখানা ধরে আংগুলে পরিয়ে দেয় বহু মূল্যবান অংগুরীখানা।
কস্তুরীবাঈ অস্ফুটকণ্ঠে বলে–ভোলানাথ!
হাঁ কস্তুরী আমি তোমাকে অত্যন্ত ভালবাসী। কিন্তু আমার আফসোস তুমি আজও আমার সম্মুখে তোমার চেহারা উন্মুক্ত করলে না।
দুঃখ করো না ভোলা, একদিন আমাকে তুমি দেখতে পাবে। আচ্ছা আজ তাহলে চলি?
কোথায় যাবে কস্তুরী বলল, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
অনেক দূরে যাবো তাছাড়া বাপু আছে আমার সঙ্গে।
বেশ যাও। কস্তুরী?
বলো?
আবার কবে দেখা হবে তোমার সঙ্গে।
সঠিক বলতে পারবো না। আজ চলি ভোলানাথ? কস্তুরীবাঈ বনহুরের কাছে বিদায় নিয়ে এগিয়ে যায় তার পিতার দিকে।
বনহুর প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে খুঁজে দেয় তারপর। অগ্নিসংযোগ করে গাড়িতে উঠে বসে।
*
পুলিশ সুপার মিঃ আরিফের অফিস রুমে টেবিলের চারপাশ ঘিরে বসে আছে কয়েকজন পুলিশ অফিসার। মিঃ আরিফ মিঃ ইয়াসিন, মিঃ হারুন এবং মিঃ সিদ্দিকী। সকলেরই চোখে-মুখে দারুণ উক্তৃষ্ঠার ছাপ।
মিঃ আরিফের হাতে একখানা মূল্যবান হার এবং একখানা চিঠি।
মিঃ আরিফ বললেন–দস্যু বনহুর পুলিশ মহলকে এই চিঠি আর হারছড়া পাঠিয়ে উপহাস করেছে। দেখছেন না চিঠিখানা। পরুন মিঃ ইয়াসিন?।
মিঃ ইয়াসিন মিঃ আরিফের হাত থেকে চিঠিখানা নিয়ে পড়লেন–
পুলিশ সুপার এই মূল্যবান হারছড়া পুরস্কার ঘোষণা করে জানিয়ে দিবেন। যে দস্যু বনহুরকে প্রেপ্তার করে আনতে সক্ষম হবে তাকে এই হারটি পুরস্কার দেওয়া হবে। মনে রাখবেন হারছড়া আত্মসাৎ করা চলবে না।
–দস্য বনহুর।
মিঃ ইয়াসিন চিঠিখানা একবার নয় বার দুই পড়লেন। তারপর টেবিলে ওয়েট চাপা দিয়ে রাখলেন।
ইলেকট্রিক আলোতে মিঃ আরিফের হাতে হারছড়া ঝম করছে। উল্টে পাল্টে দেখে বললেন মিঃ আরিফ-আপনাদের মতামত জানতে চাই?
এমন সময় একজন পাহারাদার এসে জানালোস্যার, একজন সাহেব দেখা করতে চান। এই যে কার্ড দিয়েছেন।
কাৰ্ডখানা হাতে নিলেন মিঃ আরিফ, কার্ডে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আনন্দ-ভরা কন্ঠে বললেন মিঃ ফরিদ সাহেব এসেছেন। আমার বাল্য বন্ধু? যাও ভিতরে নিয়ে এসো।
চোখে চশমা মুখে ফ্রেম কটা দাঁড়ি, হাতে ছড়ি কক্ষ মধ্যে প্রবেশ করেন এক অৰ্দ্ধ বয়স্ক ভদ্রলোক। চোখে-মুখে আভিজাত্যের ছাপ বিদ্যমান।
