কায়েস একপাশে দাঁড়িয়েছিলো সর্দারের সম্মুখে এক পা সরে দাঁড়ালো–বলুন সর্দার?
এই সব মাল নিয়ে গিয়ে মাল-গুদামে রেখে দাও। আর এই মতিমালা যেটা সবচেয়ে বেশি মূল্যবান সেটা পুলিশ অফিসে পাঠিয়ে দাও আর লিখে দাও, যে দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে তাকে যেন এই মতিমালা বখশীশ দেওয়া হয়।
কায়েস বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো সর্দারের মুখে।
অন্যান্য অনুচর সবাই অবাক হলো সর্দারের কথা শুনে।
বনহুর নিজে একটা মালা তুলে নিলো হাতে–এই মালা ছড়া মহারাজের কণ্ঠে ছিলো। এটাই পাঠিয়ে দাও।
কায়েস মালা ছড়া হাতে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। চোখ দুটো তার ছলছল করে উঠলো, বললো–সর্দার এ মালা ছড়ার মূল্য অত্যাধিক….
সেই কারণেই এই মালা ছড়া আমি পাঠাচ্ছি কায়েস। দস্যু বনহুরকে যে পাকড়াও করবে তাকে যা তা বখশীস দিলে তো চলবে না। যাও।
কায়েস মালা ছড়া নিয়ে চলে গেলো।
রহমান তার অন্যান্য অনুচরদের বললো–তোমরা এ সব জিনিস নিয়ে যাও, গুদামে রেখে দাওগে।
অনুচরগণ স্থূপাকার মালপত্র নিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।
রহমান শুধু দাঁড়িয়ে রইলো।
বনহুর বললো–রহমান, এবার বোমসিং-এর সেই অনিন্দপুরের অনিন্দনকে দেখতে হবে। বোমসিং অনিন্দন সম্বন্ধে কি বলতে চেয়েছিলো এবার জানতে হবে।
রহমানের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা চললো এসব ব্যাপারে। তারপর উঠে পড়লো বনহুর।
বিশ্রাম কক্ষে প্রবেশ করে চারিদিকে তাকালো, নূরীকেই সন্ধান করছিলো বনহুর। কক্ষমধ্যে লক্ষ্য করে অবাক হলো সে, দেখলো কক্ষের জিনিস-পত্র বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো রয়েছে সমস্ত মেঝের মধ্যে। তার বিছানা, বালিশ সব এলোমেলো।
বনহুর নূরীর কক্ষে এসে দাঁড়ালো।
নূরী তখন ওদিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলো।
বনহুর নূরীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে ডাকলো–নূরী।
নূরী কোন জবাব দিলো না।
বনহুর নূরীর কাঁধে হাত রাখতেই নূরী রাগতকণ্ঠে বললো–এখানে এসেছো কি জন্য?
হেসে বললো বনহুর–তোমাকে খুঁজতে।
আমার সঙ্গে তোমার কোন প্রয়োজন নেই, যাও তুমি আমার কক্ষ থেকে।
নূরী বলো কেননা তুমি আমার উপর রাগ করছো?
তোমার উপর রাগ করার কোন অধিকার আমার নেই। তুমি আমার কেউ নও।
নূরী।
বনহুর এতোক্ষণ ধৈর্যসহকারে কথা বলছিলো এবার সে ধৈর্যচ্যুত হয়–নূরী কেননা তুমি আমার উপর মিথ্যা রাগ বা অভিমান করছো বলো?
মিথ্যা নয় সত্যি।
যা তুমি দেখেছো সম্পূর্ণ মিথ্যা।
নাসরিনকে তুমি ভালবাসো না বলতে চাও?
বাসী, কিন্তু তুমি যা ভাবছো তা নয়।
সব জানি বনহুর। এমনি আরও একবার তুমি ভুল বুঝাতে চেষ্টা করেছিলে? আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম নাসরিন তোমার…..
নূরী এ সব কি যাতা বলছো? জানো সে আমার সহকারী রহমানের স্ত্রী
পর-স্ত্রী বলেই তো তার উপর তোমার এতো লোভ।
নূরী…..ছিঃ ছিঃ এতো নীচ তুমি হতে পারলে?
হাঁ আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না। তুমি যাও বনহুর। কারণ আমি নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে পারি না।
তুমি যা দেখেছে সম্পূর্ণ ভুল…..
আমি শুনতে চাই না তোমার কোন কথা! নূরী দ্রুত বেরিয়ে গেলো তার কক্ষ থেকে।
এতোক্ষণ আড়াল থেকে সব শুনছিলো নাসরিন। নূরী বেরিয়ে যেতেই নাসরিন তাকে অনুসরণ করলো, আজ সে নিশ্চুপ থাকতে পারলো না।
নূরী আস্তানার একটা নির্জন জায়গায় এসে বসে পড়লো ধপ করে। মুখমণ্ডল তার রাগে ক্ষোভে রাঙা হয়ে উঠেছে। চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত।
নাসরিন এসে বসলো তার পাশে, ডাকলোনূরী।
নূরী গম্ভীর মুখে বসে রইলো, কোন জবাব দিলো না সে।
নাসরিন নূরীর কাঁধে হাত রাখলো।
নূরী এক ঝটকায় নাসরিনের হাত সরিয়ে দিয়ে বললো–স্বামীর ভালবাসা উপেক্ষা করে আর একজনকে ভালবাসতে লজ্জা করে না তোর?
নূরী সব শোন তারপর বলল।
আমি কোন কথাই শুনতে চাই না। আমি জানতাম না তোদের মধ্যে এমন একটা গোপন প্রেম…..
চুপ করো নূরী আমি তোমাকে স্পর্শ করে বলছি মিথ্যা বলবো না। নূরী তুমি বিশ্বাস করো তোমার বনহুরের কোন দোষ নেই। দোষ যদি থাকে সে আমার। নূরী সেদিন সর্দার আর ও একই ড্রেস পরিধান করেছিলো। আমি ওকে দেখেছিলাম সেই ড্রেসে। ওকে খুঁজতে এসে দেখি সে উবু হয়ে কি যেন করছে। আমি জানতাম না ও নয়, আমি পিছন থেকে চুপি চুপি এসে ওর চোখ দুটো ধরে ফেলতেই সর্দার তোমাকে মনে করে আমাকে ধরে ফেলেছিলো ঠিক সেই মুহূর্তে তুমি এসে পড়েছিলে। বলল এতে কার দোষ? কে অপরাধী? বলো–বলো নূরী…..
নূরীর দু’চোখ সচ্ছ হয়ে আসে, মন থেকে দূর হয়ে যায় একটা সন্দেহের কালো মেঘ। নূরীর মনে ব্যথা জাগে বনহুরকে সে কত না কথা বলেছে এ ব্যাপার নিয়ে। বললো নূরী–নাসরিন এ কথা আগে বলিসনি কেন? সেদিন বললে…..
বলার সাহস পাইনি নূরী। তুমি যদি বিশ্বাস না করো তাই বলিনি। যাও, যাও নূরী সর্দারকে ব্যথা দিও না। যাও তুমিনাসরিন নিজের আঁচলে নূরীর চোখের পানি মুছে হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিলো।
নূরী আর থাকতে পারলো না, ছুটে চলে গেলো বনহুরের কক্ষে।
বনহুর তার বিশ্রাম কক্ষে নেই।
নূরী দরবার কক্ষে গেলো, দরবার কক্ষে শূন্য।
এবার নূরী ঝরনার পাশে এসে চারিদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলো। হঠাৎ নজরে পড়লো বনহুর একটা পাথরের উপরে বসে আছে ওদিকে মুখ করে।
নূরী এসে দাঁড়ালো তার পাশে। কোমল কণ্ঠে অপরাধীর মত জড়োসড়ো হয়ে বললো আমাকে মাফ করে দাও হুর!
