অন্যান্য অনুচরগণ মহারাজের পরিষদগণের দেহের মূল্যবান পরিচ্ছদ এবং অলঙ্কার খুলে। নিয়ে সবাই আনন্দধ্বনি করে উঠলো।
বনহুরের দলবল মহারাজের বাগান-বাড়ীর চারপাশ এমনভাবে ঘিরে ফেলেছিলো যার জন্য একটি প্রাণীও বাগান-বাড়ির বাইরে যেতে পারেনি বা কেউ বাগানবাড়িতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি।
বনহুর এবার দেবসিং শর্মার বুকে সূতীক্ষ ধার ছোরাখানা চেপে ধরে কঠিন কণ্ঠে বললো– আজও তোমাকে ক্ষমা করলাম রাজা। কারণ তুমি কান্দাই অধিপতি, তোমাকে হত্যা করলে কন্দাইবাসীর চোখে অশ্রুর নদী না বইলেও তাদের মনে ব্যথা লাগবে। আমি চাই না কারো মনে ব্যথা লাগে। কিন্তু মনে রেখো রাজা এর পর যদি কোন দিন কোন নারীর প্রতি তুমি হস্তক্ষেপ করো কিংবা অহেতুক এই রকম খাদ্য সম্ভারের আয়োজন করো তাহলে তোমাকে শুধু হত্যাই করবো না, তোমার মৃতদেহ ঝুলিয়ে দেবো তোমার রাজপ্রাসাদের সিংহদ্বারে বুঝলে? এবার বলো কোথায় সে অবলা রমণী যাকে আজ রাতের জন্য তুমি অঙ্গশায়িনী করতে চেয়েছিলে?
দেবসিং-এর মুখ কালো হয়ে উঠেছে, বললেন তিনি–দস্যু বনহুর তোমার আদেশ আমি মাথা পেতে গ্রহণ করলাম। তুমি আমাকে হত্যা করো না আর যে রমণীর কথা বলছো তাকে। বাগান-বাড়ির আমার বিশ্রাম কক্ষে আটক করে রাখা হয়েছে।
বনহুর রহমানকে ইংগিৎ করলো তাকে নিয়ে আসার জন্য।
রহমান চলে গেলো।
অল্পক্ষণ পর ফিরে এলো এক আলুথালু বেশ তরুণীকে নিয়ে।
বনহুর তরুণীর আপাদমস্তক লক্ষ্য করে বললো–রহমান একে নিয়ে যাও, পৌঁছে দিয়ে এসো এর অভিভাবকের কাছে। অন্যান্য অনুচরদের লক্ষ্য করে বললো–তোমরা যাও।
সর্দারের আদেশ পেয়ে সবাই জিনিস-পত্র নিয়ে উধাও হলো।
রহমান তরুণীসহ বেরিয়ে গেলো বাগান-বাড়ি থেকে।
বনহুর তখনও দেবসিং শর্মার বুকের কাছে চেপে ধরে আছে তার সুতীক্ষ্ণ ধার ছোরাখানা। সবাই যখন বেরিয়ে গেলো তখন বনহুর দেবসিং-এর বুকের কাছ থেকে ছোরা সরিয়ে নিয়ে। নিমিশে প্রাচীর টপকে তাজের পিঠে লাফিয়ে পড়লো।
মহারাজ দেবসিং শর্মা এবং তার পারিষদগণ শুধু নিচের পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছুটোছুটি করে চিৎকার শুরু করলেন–পাহারাদার…..পাহারাদার ………পুলিশ…….পুলিশ…..
চারিদিক থেকে ছুটে এলো পাহারাদারগণ, সবাই বন্দুক রাইফেল উদ্যত করে এসে দাঁড়ালো। মহারাজের এবং পারিষদগণের অবস্থা দেখে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো।
মহারাজ দেবসিং শর্মা চিৎকার করে বললেন–এতোক্ষণ কোথায় ছিলে তোমরা? দস্যু বনহুর আমার সর্বনাশ করে গেলো।
মহারাজের আদেশে তৎক্ষণাৎ পুলিশ অফিসে ফোন করা হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ সুপার এবং পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আরিফ এবং মিঃ ইয়াসিন এসে হাজির হলেন পুলিশ ফোর্স নিয়ে। তাঁরা রাজবাড়ীতে পৌঁছে বিস্মিত-হতবাক হলেন।
মহারাজ দেবসিং বললেন–দস্যু বনহুর আমার শুধু সর্বনাশ করে নাই আমাকে সর্বতঃভাবে অপমান লাঞ্ছিত করেছে। আমার আমন্ত্রিত অতিথিগণের মুখের আহার তার অনুচরদের দ্বারা ভক্ষণ করিয়েছে, তাদের দেহের পোশাক-পরিচ্ছদ খুলে নিয়ে তাদের চরমভাবে অপমান করেছে।
পুলিশ সুপার দেবসিং শর্মার কথা শুনে রাগে গ গ করে ফুলছিলেন।
ইন্সপেক্টার মিঃ ইয়াসিন মুখে রাগত-ভাব ফুটিয়ে রাখলেও মনে মনে তিনি হাসছিলেন। দস্য বনহুর তাকেও কম নাকনি চুবানি খাওয়ানি তবু তিনি এই দস্যুর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে পারেন না কোন সময়।
মহারাজের মুখে সব শুনে মিঃ আরিফ ক্ষেপে উঠলেন ভীষণভাবে, যদিও দস্যু বনহুরের সহায়তায় তারা কয়েকদিন পূর্বে কান্দাই রহস্য উঘাটনে সক্ষম হয়েছেন। বললেন মিঃ আরিফ দেবসিং শর্মা আমরা আপনার এই দুর্ঘটনার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত। দস্যু বনহুর আপনাকে অপমান করে কান্দাইবাসীকে অপমান করেছে। আপনাকে এবং আপনার পারিষদগণকেই শুধু সে অপমান করেনি আপনাদের মহা-মূল্যবান অলঙ্কার আর পোশাক পরিচ্ছদ হরণ করে নিয়ে গেছে। আইনের কাছে সে চরম অপরাধে অপরাধী, কাজেই আমরা দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারে অত্যন্ত চেষ্টা করবো।
সেদিনের মত পুলিশ-ফোর্স সহ পুলিশ অফিসারদ্বয় বিদায় গ্রহণ করলেন।
মিঃ আরিফ ঘোষণা করে দিলেন দস্যু বনহুর গ্রেপ্তার হলে কান্দাই রাজ্যে এক মহাউৎসবের আয়োজন করা হবে। যে দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে তাকে সরকার মোটা টাকা পুরস্কার দান করবেন এবং তাকে খেতাব দানে সম্মানিত করবেন।
*
রহমান পাগলিনী প্রায় সেই তরুণীকে তার ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলো আস্তানায়। ততক্ষণে বনহুর তার দলবল নিয়ে পৌঁছে গেছে।
বনহুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করলো রহমান, যুবতীটিকে তার আত্মীয়-স্বজনের কাছে পৌঁছে দিয়ে এসেছো?
হাঁ সর্দার।
অনুচরগণ রহমান আর বনহুরের সম্মুখে স্তূপাকার করে রাখলো যা তারা দেবশর্মার বাগান বাড়ি থেকে হরণ করে এনেছিলো।
বহু মূল্যবান কণ্ঠহার, শিরস্ত্রাণ, বলয় আর মুকুট।
বনহুর এক একটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখছিলো। আর ফল ভক্ষণ করছিলো।
বনহুরের সম্মুখ টেবিলে স্তূপাকার আংগুরের ঝোপা থরে থরে সাজানো।
এমন সময় বনহুরের শহুরে অনুচর হারেশ এসে কুর্নিশ করে জানালো সর্দার, পুলিশ বাহিনী। সমস্ত শহরময় আপনাকে খোঁজ করে চলেছে। পুলিশ সুপার মোটা বখশীশ ঘোষণা করেছেন…..
সব শুনেছি হারেশ! পুলিশ সুপারের মোটা বখশীশ পাবার লোভে আমি স্বয়ং হয়তো গিয়ে হাজির হবো। শোন কায়েস!
