এক সঙ্গে অশ্ব চালনা করলো সকলে।
কান্দাই জঙ্গল প্রকম্পিত হয়ে উঠলো, অশ্ব-খুরের শব্দে দুলে উঠলো যেন সমস্ত বনভূমি।
বনহুর আর রহমান সর্বাগ্রে।
পিছনে অন্যান্য সকলে হুঙ্কার ছেড়ে অগ্রসর হলো।
ধীরে ধীরে মিশে এলো বনহুরের অশ্ব-পদ শব্দ।
*
নূরী নিজ কক্ষে প্রবেশ করে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলো। নিজের জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেললো নূরী খণ্ড খণ্ড করে। ঘরের জিনিসপত্র সব ছুঁড়ে ফেলে দিতে লাগলো। নূরীর আচরণে অবাক হয়ে গেলে আস্তানার অন্যান্য নারী-পুরুষ সবাই।
সারাট দিন নূরী মুখে কিছু দিলো না।
নাসরিন সব বুঝতে পারলো, তারই ভুলের জন্য নূরী এমন হয়েছে, অবিশ্বাস করেছে তার সর্দারকে।
নাসরিন এসে কিছু বলবে তাও সাহসী হলো না। কারণ নূরীকে নাসরিন অত্যন্ত ভয় করতে। যদিও নূরী আর নাসরিন উভয়ে সহচরী ছিলো তবু নূরীকে সমীহ করে চলতো সে।
*
কান্দাই অধিপতি দেবসিং শর্মার প্রাসাদ।
আজ দেবসিং-এর জন্ম উৎসব পালন হচ্ছে।
রাজপ্রাসাদের সম্মুখস্থ বাগানবাড়িতে উৎসব চলেছে।
আলোয় আলোকিত সমস্ত বাগানবাড়ি।
বাগানের মাঝখানে চলেছে নাচগান। একপাশে টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে। এখনও খাবার আসনে এসে কেউ বসেনি।
দেবসিং শর্মা মধ্যস্থ আসনে বসে আছেন।
তার চার পাশ ঘিরে বসেছেন মহারাজের পরিষদগণ।
সম্মুখে নত্তৰ্কী দল নাচ দেখাচ্ছে। একপাশে বাদ্যকরগণ নানারকম বাজনা পরিবেশন করে চলেছে। আনন্দ-মুখর হয়ে উঠেছে বাগানবাড়িখানা মাঝে মাঝে করতালি দিচ্ছিলেন দেবশর্মা।
খানাপিনার পর চলবে আরও নাচ-গান, তারপর নতুন নর্তকী নাচ পরিবেশন করবে।
একটি তরুণীকে পাকড়াও করে আনা হয়েছে কোন এক নাগরিকের বাড়ি থেকে। উৎসব শেষে মহারাজের আনন্দদান কারণেই এর্কে যোগাড় করেছে প্রধান সেনাপতি রাজেশ্বর রাম।
এই মুহূর্তে রাজেশ্বর রাম বসে আছে দেবসিং শর্মার পাশে–সে মাঝে মাঝে হর্ষধ্বনি করছে। মহারাজ দেবসিং শর্মাকে কিছু বলছিলো রাজশ্বের রাম।
এবার নাচ শেষ হলেই সবাই খাবার টেবিলে গিয়ে বসবে।
নানরকম সুস্বাদু খাদ্য দ্রব্যের সুগন্ধে বাগান-বাড়ির আকাশ-বাতাস ভরপুর হয়ে উঠেছে। নাচ-গান উপভোগ করার মাধ্যমেও সকলের রসনায় পানি এসে পড়ছিলো আর একটু পরই তারা তৃপ্তিসহকারে ভুরিভোজনে আত্মনিয়োগ করবে। আনন্দে ডগমগ সবাই।
ঠিক সেই মুহূর্তে দস্যু বনহুর দলবল নিয়ে আচমকা প্রবেশ করলো সেই স্থানে। প্রত্যেকের হাতেই উদ্যত রাইফেল, পিস্তল আর ছোরা।
জমকালো পোশাক পরা, মাথার পাগড়ি দিয়ে মুখের নীচের অংশ ঢাকা, এক একজন যেন এক একটি যমদূতের মত প্রত্যেকটা আনন্দমুখর ব্যাক্তির বুকের কাছে অস্ত্র বাগিয়ে ধরলো।
বনহুর নিজে ছোরাখানা চেপে ধরলো দেবসিং শর্মার বুকের কাছে, দাঁতে দাঁত পিষে বললোখবরদার নড়বে না।
সকলের চোখেই বিস্ময় ভয় আর উদ্বিগ্নতা।
প্রত্যেকেই নিজ নিজ আসনের পাশে উঠে দাঁড়িয়েছে। দু’চোখ কপালে তুলে তাকাচ্ছে ফ্যাল ফ্যাল করে।
মহারাজ দেবসিং শর্মা বনহুরের চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলে–দস্যু বনহুর তুমি?
বনহুর সচ্ছ-গলায় জবাব দেয় হাঁ আমি!
বললেন দেবসিং শর্মা—-আবার কেননা এসেছো?
নিয়ন্ত্রণ না পেলেও তোমার জন্ম-উৎসবে যোগ দিতে এসেছি দেবসিং। বনহুর তার দলবল সবাইকে ইংগিৎ করলো ও পাশে খাবারের টেবিলে গিয়ে বসতে।
সর্দারের নির্দেশ পাওয়া মাত্র রহমান ছাড়া সবাই গিয়ে খাবার টেবিলের চারপাশ ঘিরে বসলো। নানারকম খাবারে টেবিল সজ্জিত ছিলো, গো গ্রাসে খেতে শুরু করলো সকলে।
বনহুর আর রহমান মহারাজ দেবসিং শর্মার দু’পাশে দু’জন আসন দখল করে নিয়ে বসলো।
অবশ্য মহারাজ দেবসিং শর্মার আসনে উপবেশন করছে দস্যু বনহুর স্বয়ং।
বনহুর এবং তার দলবলের আগমনে নাচনেওয়ালীরা নাচ বন্ধ করে এক পাশে দাঁড়িয়ে থর। থর করে কাঁপছিলো।
বনহুর তাদের লক্ষ্য করে বললো–নাচো।
দেবসিং শর্মাও বনহুরের সঙ্গে যোগ দিয়ে ফ্যাকাশে মুখে বললেন–নাচো তোমরা…..
নাচনেওয়ালীগণ পুনরায় নাচতে শুরু করলো।
বনহুরের সম্মুখস্থ টেবিলে একরাশ ফল-মূল রেখে গেলো একজন লোক। অবশ্য রহমানের নির্দেশেই সে ফল-মূল আসতে বাধ্য হয়েছে।
বনহুর নাচ দেখলো আর ছোরার আগা দিয়ে আংগুরের ঝোপাগুলো ফলের রেকাবি থেকে তুলে নিয়ে মুখে ফেলছিল। ঠেশ দিয়ে সচ্ছল আরামে বসে নাচ দেখছে বনহুর, যেন সে নিজ আস্তানায় বসে নাচ দেখছে।
দেবসিং শর্মা এবং তার পারিষদগণ সবাই যে যেমন বসেছিল তেমনি বসে আছে জড় পুতুলের মত। সকলের মুখেই ভীত ভাব কিন্তু কেউ আসন ত্যাগ করার সাহসী হচ্ছে না।
রহমান দেবশর্মার বামপাশের আসনে উপবেশন করেছিলো। সে রিভলভারখানাকে সতর্কভাবে ধরেছিলো দেবশর্মার পাঁজর লক্ষ্য করে। কেউ যেন এতোটুকু সুযোগ না পায় তাদের উপর হামলা চালাতে বা কোনরকম শয়তানী করতে।
মহারাজের জীবননাশ সম্ভাবনায় কেউ একচুল নড়ার সাহসী হলো না। সবাই আড় নয়নে। তাকাচ্ছে দস্যু বনহুরের কালো আবরণ ঢাকা মুখের দিকে।
এক সময় আহার শেষ করে বনহুরের অনুচর দল।
এবার বনহুর আদেশ দেয়–মহারাজ এবং তার অনুচরদের দেহ হতে মূল্যবান পোশাক এবং মতির মালাগুলো খুলে নাও।
রহমান নিজে দেবশর্মার কণ্ঠ থেকে মতিমালা এবং মূল্যবান হীরক হারগুলো খুলে নিলো। দেহের রাজকীয় পোশাক-পরিচ্ছদও খুলে নিলো সে নির্বিঘ্নে।
