উঁ হুঁ তা জানি না।
এতো খবর রেখেছো অথচ আসল খবর রাখোনি।
বনহুর তুমি তা হলে সত্য কস্তুরীবাঈকে—
হাঁ সত্যি!
হুর!
অবাক হবার কিছু নেই।
নূরীর মুখ গম্ভীর হয়ে পড়লো, অভিমান ভরাকণ্ঠে বললো– তোমার উপর যে বিশ্বাস ছিলো আমি তা হারিয়েছি।
সে জন্য আমি নাচার নূরী। কারণ, কস্তুরীবাঈকে আমার প্রয়োজন।
বনহুর তুমি, তুমি—এতো নিচে নেমে গেছো?
সে আমাকে শুধু ভালই বাসে না, আমাকে সে কুকর্ম থেকে বিরত রাখে তাকে আমি—
– ভালোবাসো এই তো?
হাঁ নূরী, তুমি তাকে ভালবাসা ও বলতে পারো, প্রেম বলতে পারো কিংবা কৃতজ্ঞতা ও বলতে পারো–
বনহুর বাঁকা চোখে নূরীর দিকে তাকিয়ে মৃদৃ হাসলো।
নূরীর মুখ গম্ভীর হয়ে পড়েছে।
বনহুর নূরীকে টেনে নিলো, চিবুক্টা তুলে ধরলো মুখের কাছে, চাপা স্বরে বললো–প্রিয়ে আমাকে তুমি অবিশ্বাস করো না। আমি তোমাকে…..
ঐ সময় বাইরে কারো পদ শব্দ শোনা যায়।
বনহুর নূরীকে বাহুমুক্ত করে দিয়ে বলে–নূরী যাও কায়েস এসেছে কথা আছে ওর সঙ্গে।
নূরী প্রস্থান করলো সেখান থেকে।
কায়েস প্রবেশ করে কুর্নিশ জানালো।
বনহুর বললো–তাজকে প্রস্তুত করো এবং তোমরা প্রস্তুত হয়ে নাও দেবসিং শর্মার প্রাসাদে হানা দেবো।
সর্দার কান্দাই অধিপতি দেবসিং শর্মা?
হাঁ কায়েস।
কায়েস বিলম্ব না করে বেরিয়ে যায়।
অল্পক্ষণের মধ্যে বনহুর এবং তার দলবল দস্যু ড্রেসে সজ্জিত হয়ে দরবার কক্ষে এসে দাঁড়ালো।
বনহুর এবং রহমান একই ড্রেসে সজ্জিত হয়েছে।
রহমান শুধু বনহুরের সহকারীই ছিলো না, সে বনহুরের দেহরক্ষী হিসাবেও নিজকে চালিয়ে নিতো। সর্দারের জীবন রক্ষার্থেই সে নিজকে ব্যবহার করতে সর্বক্ষণ। রহমান তার প্রাণের চেয়েও ভালবাসে সর্দারকে এটাই ছিলো তার জীবন্ত প্রমাণ।
শুধু রহমান সর্দারকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালবাসতো তা নয়। বনহুরের প্রত্যেকটা অনুচর তাদের প্রাণ অপেক্ষা সর্দারকে ভালবাসতো। সর্দারের জন্য তারা জীবন বিলিয়ে দিতে এতোটুকু দ্বিধা করতো না।
বনহুরের প্রত্যেকটা অনুচর যেমন নির্ভীক দুঃসাহসী তেমনি প্রভুভক্ত। আজ সবাই এসে দাঁড়িয়েছে সর্দারের আদেশ পাওয়া মাত্র তারা সেইমত কাজ করবে।
বনহুর বললো–আজ আমি ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করতে চলি নাই। আমি চলেছি একজন দেশ। শাসককে শায়েস্তা করতে। তোমরা সবাই জানো কান্দাই-এর শাসক না হলেও অধিপতি দেবসিং শর্মা। তার আদেশে কান্দাই অধিবাসী উঠা বসা করে থাকে।
হা সর্দার আমরা সবাই জানি একথা। বললো অনুচরদের মধ্য হতে একজন।
বনহুর বললো আবার দেশের অধিনায়ক হয়ে যদি সে দেশবাসীর সর্বনাশ করে তাহলে সে কত বড় পাপিষ্ঠ আর শয়তান হতে পারে তা তোমরা জানো। কাজেই আমি সেই পাপিষ্ঠ অধিনায়ককে ক্ষমা করতে পারি না। তোমরা সবাই এবার রওনা দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে নাও।
আমরা সবাই প্রস্তুত সর্দার।
বেশ তবে চলো।
বনহুর আর রহমান দরবার কক্ষ ত্যাগ করলো।
সমস্ত অনুচরগণ অনুসরণ করলো সর্দার আর রহমানকে।
হঠাৎ বনহুরের মনে পড়লো কোন একটা জিনিস সে ফেলে এসেছে আস্তানায় ভিতরে। মনে পড়তেই বনহুর নিজেই ফিরে এলো আস্তানায়! একটা লৌহ সিন্দুক খুলে তার প্রয়োজনীয় জিনিস নিচ্ছিলো সে।
বনহুর উবু হয়ে সিন্দুকে ঝুঁকে জিনিসটা তুলে নিচ্ছিলো পকেটে।
এমন সময় নাসরিন দূর থেকে বনহুরকে পিছন হতে দেখতে পায়। নাসরিন তার স্বামী মনে করে–কারণ আজ রহমানের দেহেও ছিলো বনহুরের মত একই জমকালো ড্রেস।
নাসরিন পা টিপে টিপে বনহুরের পিছনে এসে দাঁড়ায়। আলগোছে টিপে ধরে ওর চোখ দুটো।
বনহুর নূরী মনে করে ওর হাত দু’খানা মুঠায় চেপে ধরে টেনে নেয় কাছে।
নাসিরনের মুখে দৃষ্টি পড়তেই বনহুর বিস্মিত হয়।
অবাক হয়ে তাকায় বনহুর নাসরিনের মুখের দিকে।
নাসরিন লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো মুহূর্তে, তার চোখে মুখেও ফুটে উঠলো হতভম্ভ ভাব।
ঠিক্ সেই দণ্ডে নূরী এসে পড়ে সেখানে।
তখনও নাসরিন বনহুরের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ।
বনহুর নাসরিনকে তাড়াতাড়ি বাহুমুক্ত করে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
নূরীর চোখ দিয়ে তখন অগ্নি বর্ষণ হচ্ছে।
নাসরিন আর একটুও দেরী করে না সেখানে, ছুটে চলে যায়। এতো বড় ভুল সে জীবনে করে নাই, বুকের মধ্যে যেন তার আলোড়ন শুরু হয়েছে। নিজকে কোথায় গোপন করে রাখবে। ভেবে পায় না যেন সে।
নাসরিন চলে যেতেই বনহুর নূরীর মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
নূরী অধর দংশন করে বললো–বনহুর এত জঘন্য তুমি জানতাম না।
বনহুরের মুখোভাবে এতোটুকু পরিবর্তন আসেনি, একটু হেসে বললো সে–নূরী তুমি যা দেখলে সম্পূর্ণ এক্সিডেন্ট। নাসরিন ভুল করেছিল আমাকে, আমিও ভুল করেছিলাম তাকে…..শোন। নূরী! বনহুর নূরীর একখানা হাত ধরে।
নূরী ক্রদ্ধ কণ্ঠে বললো–তোমার নেকামিভরা কথাগুলো আমি বেশ বুঝতে পেরেছি! ছাড়ো আমার হাত….এক ঝটকায় বনহুরের হাতের মুঠা থেকে নূরী নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে পালিয়ে গেলো।
বনহুর নূরীর দিকে পা বাড়াতেই মাহবুব এসে ডাকলো সর্দার, সবাই প্রস্তুত আপনি চলুন।
থমকে দাঁড়ালো বনহুর, মনে পড়লো তার জন্য আস্তানার বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে। বনহুর তার প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে বললো–চলো।
সর্দার এসে তাজের পিঠে চেপে বসতেই অন্যান্য সবাই অশ্ব-পৃষ্ঠে চেপে বসলো।
