লীলাবাঈও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো–হুজুর আমি কোন অপরাধ করিনি। আমাকে বাঁধবেন না হুজুর। আপনারা আমাদের মা বাপ…..
যমুনারাণী আঁচলে চোখ মুছে বললো–আমাদের কোন দোষ নেই সাহেব। আমরা এখানে মাহিনা পেতাম কাজ করতাম, সাহেব ছেড়ে দেন সাহেব। এই নাক কান মলছি আর এসব কুকাজ করবো না।
মিঃ আরিফ বললেন–এতোদিন কতগুলো মানুষের মাথা খেয়েছো হিসাব রেখেছো?
ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে লাগলো নর্তকী তিনজন।
মিঃ ইয়াসিন বললেন–তোমাদের বিচার হবে তারপর ছাড়া পাবে বুঝলে?
পুলিশ বাহিনী মোদন বার-এর ম্যানেজার এবং অন্যান্য শয়তানদের বেঁধে গাড়ি বোঝাই করে ফিরে এলো পুলিশ অফিসে।
*
বনহুর গভীরভাবে চিন্তা করে চলেছে, তার আঙ্গুলের ফাঁকে ধুমায়িত সিগারেট। বালিশে ঠেশ। দিয়ে বসেছিলো বনহুর। ভাবছে বোমসিং মৃত্যুকালে কিছু বলতে চেয়েছিলো যা সে বলার সুযোগ পেলো না। তবে কয়েকটা শব্দ বোমসিং উচ্চারণ করেছিলো, অনিন্দন। অ–নি—-ন—এটা কোন লোকের নাম না দেশের নাম? কিসের নাম এই অক্ষরগুলো।
বনহুর রহমানকে ডেকে পাঠালেন।
অল্পক্ষণের মধ্যেই রহমান এসে হাজির হলো বনহুরের কক্ষে। কুর্নিশ জানিয়ে বললো– সর্দার, আমাকে ডেকেছেন?
হাঁ, বসো।
রহমান পাশের একটা আসনে বসে পড়লো।
বনহুর বললো–রহমান, অনিন্দন বলে কোন দেশ, নদী যা পর্বত আছে কোথাও? বা কোন ব্যক্তির নাম? বোমসিং মৃত্যুকালে অনিন্দন শব্দটা উচ্চারণ করেছিলো। জানি না সে ঐ নামে কি বলতে চেয়েছিলো।
রহমান আপন মনেই অক্ষর কয়টি উচ্চারণ করলো–স–নি——-তারপর গভীরভাবে চিন্তা করলো সে কিছুক্ষণ তারপর হঠাৎ বলে উঠলো রহমান-কান্দাই-এর অদূরে একটা দেশ আছে অনিন্দপুর, সর্দার সেই অনিন্দপুরের রাজার নাম হলো অনিন্দন। তবে বোমসিং মৃত্যুকালে কোন অনিন্দন শব্দ উচ্চারণ করে গেছে সেটা সঠিক বলা কঠিন।
বনহুর সোজা হয়ে বসে উহ্লুকণ্ঠে বললো–অনিন্দপুরের রাজার নাম অনিন্দন?
হাঁ সর্দার আমি সেই রকম শুনেছিলাম।
আমার মনে হয় বোমসিং এই রাজা সম্বন্ধে আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলো। থাক বোমসিং আর জীবিত হবে না কাজেই তার কথার কিছুই আর শোনা যাবে না। রহমান?
বলুন সর্দার?
অনিন্দপুরে যেতে চাই এবং অনিন্দপুরের রাজার সঙ্গে আমি আলাপ করতে চাই।
কিন্তু সর্দার কান্দাই ছেড়ে এখন যাওয়া সম্ভব হয় কি করে?
কেন?
কান্দাই রহস্য এখনও সম্পূর্ণ উঘাটন হয়নি সর্দার। শয়তান মোদনের দল বন্দী হয়েছে, মোদন মরেছে, মেদনমোহন বার-এ মালিক বোমসিং খতম হয়েছে কিন্তু এখনও কান্দাই এর অধিপতি দেবসিং শর্মা গোপনে তার কু-কর্ম ঠিক পূর্বের মতই চালিয়ে চলেছে।
দেবসিং শর্মা!
হা সর্দার।
আমি তাকে একবার সাজা দিয়েছিলাম না?
হাঁ তাকে চরম সাজা দিয়েছিলেন সর্দার, কিন্তু লোকটা সুবিধার নয়।
কেন আবার যে–কিছু বলতে গিয়ে থামলো বনহুর।
আবার সে কান্দাই অধিবাসীদের অর্থলোভে বশিভূত করে তাদের সুন্দর স্ত্রী কন্যা হস্তগত করে তাদের জীবন বিনষ্ট করে চলেছে।
একথা এতদিন আমাকে জানাওনি কেন রহমান?
সর্দার আপনি তো কান্দাই ছিলেন না তাই জানেন না এবং আমরাও তাই জানাইনি। রহমান নত মস্তকে নম্রকণ্ঠে কথাটা বললো।
বনহুরের চোখেমুখে ফুটে উঠলো এক ভীষণ ক্রুদ্ধভাব। দাঁতে দাঁত পিষে বললো–সর্বপ্রথম আমি রাজা দেবসিং শর্মাকে উপযুক্ত শাস্তি দান করবো। তুমি সংবাদ সংগ্রহ করে আমাকে। জানাবে।
রহমান উঠে দাঁড়িয়ে নত মস্তকে কুর্নিশ জানিয়ে বেরিয়ে যায়।
নূরী এতক্ষণ আড়ালে থেকে শুনছিলো, রহমান চলে যেতেই নূরী প্রবেশ করে সেই কক্ষে।
বনহুর তখন শয্যা ত্যাগ করে পায়চারী করে চলেছে।
সব বনহুর সহ্য করতে পারে শুধু পারে না দুটো জিনিসকে সহ্য করতে একটি হলো অসহায় দুঃস্থ ব্যক্তির উপর নির্মম অত্যাচার আর নারী নির্যাতন।
সিংহের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছিলো বনহুর এমন সময় নূরী এসে দাঁড়ায় তার সম্মুখে। হেসে বলে নূরী–হঠাৎ এমন গম্ভীর হয়ে পড়লে কেন হুর?
বনহুর নূরীর কথায় কোন জবাব দেয় না।
নূরী বনহুরের পাশে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়, বলে সে আবার —র রোজ যেখানে যাও আজ সেখানে যাবে না?
চমকে ফিরে তাকায় বনহুর, বলে–কোথায় যাই আমি?
তুমি না বললেও আমি সব জানি। মোদনমোহন বার-এ।
নূরী!–কুঞ্চিত করে বলে বনহুরকে তোমাকে এ কথা বলেছে?
আমার কাছে গোপন করতে চাইলেই কি গোপন করা যায়। সত্যি করে বলতো তুমি রোজ মোদনমোহন বার-এ যাওনি? সেখান থেকে সরাব পান করে আসোনি? নৰ্তকী পিয়ারীর প্রেম বন্ধনে…..
নূরী এ সব কি বলছো?
সব জানি আমি। আরও জানি নর্তকী পিয়ারী, নর্তকী যুমনারাণী, নর্তকী লীলার প্রেম সম্ভাষণ তুমি উপেক্ষা করলেও কস্তুরীবাঈকে তুমি উপেক্ষা করতে পারোনি………..
নূরী তোমার দুঃসাহস কম নয় দেখছি। এ সব বলার সাহস তোমার হলো কেমন করে? সব বুঝি তোমাকে রহমান বলেছে।
খিল খিল করে হেসে উঠলো নূরী।
বিস্ময়ভরা নয়নে তাকিয়ে রইলো বনহুর।
নূরী হাসি বন্ধ করে বললো রহমান আমাকে কোন কথা বলেনি। ওকে অযথা সন্দেহ করো হুর। আমি জানি কস্তুরীবাঈ নামে এক নর্তকী তোমাকে ভালবাসে, শুধু ভালবাসে না গভীরভাবে ভালবাসে। আর তুমিও তাকে…..।
হঠাৎ বনহুর হেসে উঠে, হাসি থামিয়ে বলে–তুমি দেখছি সব খবরই রেখেছো? কস্তুরীবাঈকে আমি ভালবেসে ফেলেছি হঠাৎ, তাও তুমি জানো। কিন্তু কেনো আমি তাকে ভালবেসেছি তা বোধ হয় জানো না নূরী?
