কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠে বন্দীদের মন, ভোলানাথকে আরও অনেকদিন তারা দেখেছিলো তখন। ওকে অভিশম্পদই করেছে কারণ সেও ওদের দলেরই লোক। আজ সকলে প্রাণ ভরে ভোলানাথকে আশীর্বাদ করে, ভাবে কে এই মহান মহৎ ব্যক্তি? যে এতোদিনের অভিশাপ থেকে তাদের মুক্ত। করলো। সবাই প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে গেলো উন্মুক্ত দরজা দিয়ে।
নাথুরাম এবং মোদনমোহন বার-এর কর্মচারীগণ শৃখলাবদ্ধ অবস্থায় কটমট করে তাকাতে লাগলো। নাথুরামের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। কিন্তু কারো মুখ দিয়ে কিছুই বের হলো না। সবাই জানে ভোলানাথ কত বড় সাংঘাতিক আর ভয়ঙ্কর।
ততক্ষণে বার-গৃহের নৰ্তকীগণ এসে পড়ে সেই কক্ষে, ভোলার হতে উদ্যত রিভলভার এবং বার-গৃহের ম্যানেজার ও অন্যান্য সকলের অবস্থা দেখে সবই কুঁকড়ে যায়। ভয়ে আতঙ্কে পালাতে যায় তারা, ভোলা কঠিন কণ্ঠে বলে–পালাচ্ছো কোথায়? শোন।
সবাই কম্পিত পদক্ষেপে এগিয়ে আসে, জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ায়।
ভোলানাথ গম্ভীরকণ্ঠে বলে–এতোদিন খদ্দের সংগ্রহে নেচেচো, আজ জীবন রক্ষার্থে নাচ দেখাও। নাচো, নাচো তোমরা…
বিবর্ণ ফ্যাকাশে মুখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় পেয়ারী, লীলাবাঈ আর যমুনারাণী।
ভোলানাথ আবার ধমক দেয়–নাচো—
এবার নর্তকীদল ঘুম-জড়িত চোখে, এলোমেলো বসনে নাচতে শুরু করে।
ভোলানাথ বলে–এদের নাচ দেখাও, যতক্ষণ না তোমাদের ওস্তাদ ফিরে আসে–ভোলানাথ দ্রুত বেরিয়ে বাইর হতে দরজা বন্ধ করে দেয়।
এবার ভোলানাথ এসে দাঁড়ায় যে কক্ষে সাউন্ডবক্সের মাধ্যমে বার-গৃহের শয়তান-দল পাপকর্মের নির্দেশ দিতো। সাউন্ডবক্সের সম্মুখে এসে দাঁড়ায় ভোলানাথ, একটানে সাউন্ডবক্স সরিয়ে ফেলতেই দেখতে পায় পিছনে একটা ছোট্ট দরজা।
ভোলানাথ বিলম্ব না করে সেই ক্ষুদ্র দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। অতি সতর্কভাবে এগুতে লাগলো ভোলানাথ, হঠাৎ তার নজরে পড়লো কক্ষটার মাঝখানে বসে আছে একটা লোক, লোকটার চোখ দুটো যেন জ্বলছে। ভোলানাথের দিকে তাকিয়ে আছে কটমট করে।
ভোলানাথ রিভলভার উদ্যত করে ধরলোখবরদার নড়বে না গুলি ছুড়বো। রিভলভার ঠিক রেখে ভোলা লোকটির দিকে এগুতে লাগলো।
কিন্তু একি লোকটা স্থির বসেই আছে এক চুল নড়ছে না। ভোলানাথ অবাক হলো, আরও সরে এলো লোকটার পাশে। গায়ে হাত দিতেই বুঝতে পারলো ওটা কোন মানুষ নয় একটা পাথরে মূর্তি।
ভোলানাথ জোরে ধাক্কা দিলো, ভীষণ মজবুত আর শক্ত মূর্তিটা একটুও নড়লো না। ভোলানাথ মূর্তির পিছনে উঁকি দিতেই বিস্ময়ে হতবাক হলো, মূর্তির পিছনে সম্পূর্ণ ফাঁকা। একটা খোলস ছাড়া কিছু নয় সেটা। ভিতরে বসার একটা আসন রয়েছে।
ভোলানাথের দৃষ্টি হঠাৎ পাথরের মূর্তিটার ভিতরে এক স্থানে সীমাবদ্ধ হলো, দেখলো একটা লাউডস্পীকার মেশিন ঝুলছে। একটা তার বেরিয়ে এসেছে ভিতর থেকে বাইরে। মূর্তিটার পায়ের কাছ দিয়ে তারটা চলে গেছে পাশের কক্ষে এবং যোগ হয়েছে সাউন্ডবক্সের সঙ্গে। ভোলানাথ বুঝতে পারলো কেউ এই খোলসের মধ্যে বসে লাউডস্পীকার কথা বলে থাকে কিন্তু কে সে।
ভোলানাথ মনোযোগ সহকারে পাথরের মূর্তিটা পরীক্ষা করে দেখছিলো, এমন সময় তার পিছনে তীব্র আর্তনাদ শুনতে পেয়ে চমকে ফিরে তাকায়।
পিছনে তাকিয়েই ভোলানাথ বিস্ময়ে আরষ্ট হয়ে যায়। সে দেখতে পায় মুখে মুখোস পরা একটা লোক সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা হাতে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে। ওদিকে দাঁড়িয়ে আছে কস্তুরীবাঈ।
ভোলার দৃষ্টি ভুলুণ্ঠিত লোকটার পিঠে পড়তেই চমকে উঠলো আবার ভোলা, একখানা ছোরা অমূলে বিদ্ধ হয়ে আছে লোকটার পিঠে। তাজা লাল রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে ওর পিঠখানা এবং মেঝের খানিকটা অংশ।
ভোলা কস্তুরীবাঈ-এর দিকে তাকালো বুঝতে পারলো লোকটা যেই হোক সে তাকে পিছন থেকে ছোরা বিদ্ধ করে হত্যা করতে যাচ্ছিলো। কস্তুরীবাঈ তাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে।
এবার ভোলানাথ ভুলুণ্ঠিত লোকটির মুখের মুখোশ একটানে খুলে ফেললো। তৃতীয় বারের মত চমকে উঠলো ভোলানাথ, এযে মোদন ওস্তাদের সহকারী বোমসিং। তখনও বোমসিংহের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়নি। সে কোঁকিয়ে কোকিয়ে বললো–ভোলানাথ তুমি এতো বড় বিশ্বাসঘাতক ………. যা মরে যাচ্ছি তোমাকে অভিসম্পাত করবো না………. জেনে নাও আমিই মোদন বারের আসল মালিক—
ভোলানাথ বলে উঠলো তুমি মালিক……..
হাঁ আজ পর্যন্ত কেউ জানে না মোদন বারের আসল মালিক কে………. আমি মোদনের সহকারীরূপে কাজ করতাম………. কিন্তু আমার পরিচালনাতেই এই বার–গৃহের সব কাজ হতো……….কস্তুরীবাঈ আমাকে ছোরাবিদ্ধ না করলে……….এতক্ষণ তোমার লাশ ধুলোয় গড়াগড়ি যেতো……….।
ভোলানাথ তাকালো অদূরে দণ্ডায়মান কস্তুরীবাঈ-এর কালো আবরণে ঢাকা মুখমণ্ডলের দিকে। কস্তুরীবাঈ-এর চোখ দুটো তাকে অভিনন্দন জানালো। দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেলো কস্তুরীবাঈ।
ভোলানাথ অবাক তাকিয়ে রইলো, কে এই নর্তকী যে তাকে আজ মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে নিলো। আরও কতদিন তাকে রক্ষা করেছে চরম অবস্থা থেকে।
বোমসিং আর্তকণ্ঠে বললো……….ভোলানাথ……….কে……….তুমি?
ভোলানাথ বললো–শোন বোমসিং মরণ-মুহূর্তে শুনে যাও আমিই তোমাদের যমদূত দস্যু বনহুর।
বোমসিং-এর মৃত্যুমলিন মুখেও বিস্ময় ফুটে উঠলো, চোখ দুটো জ্বলে উঠলো দস্যু বনহুরকে সে আজ স্বচক্ষে দেখলো। এবার বোমসিং এর মুখটা বিকৃত হয়ে উঠলো মৃত্যু যন্ত্রণায়, অদ্ভুত একটা শব্দ বেরিয়ে এলো তার গলা থেকে–আঃ— আঃ—-আঃ—–আঃ——অ–কিছু যেন বলতে চেষ্টা করছে বোমসিং।
