মিঃ আরিফ গম্ভীর শান্ত কণ্ঠে বললেন–মহারাজ আপনার মুক্তির জন্য আশীর্বাদ পাবার যোগ্য হচ্ছে দস্যু বনহুর।
মহারাজ বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন–দস্যু বনহুর! সেতো মোদনের হত্যাকারী?
মিঃ ইয়াসিন বললো–মোদনের হত্যাকারীই শুধু নয় সে মোদনের শয়তানীর চরম শাস্তি দানকারী। কথাটা বলে তিনি মিঃ আরিফকে লক্ষ্য করে বললেন–স্যার, বিলম্ব করা চলবে না, মোদনমোহন বারখানা তল্লাসী করে আমরা শয়তানদের ঘাঁটি ধ্বংস করবো।
হাঁ, ঠিক বলেছেন মিঃ ইয়াছিন? এই সব শয়তানদের হাজতে পাঠিয়ে আমরা রওনা দেবো এদের ঘাঁটি অভিমুখে।
মিঃ আরিফ আর মিঃ ইয়াসিনের নির্দেশ মত মদনমোহন বার-এর কুচক্রি শয়তান–দলকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হলো।
মহারাজ দেবকী নারায়ণকে সসম্মানে পাঠানো হলো রাজ প্রাসাদে। এক লক্ষ টাকাও পাঠানো হলো তাঁর সঙ্গে।
মোদনের মৃতদেহটাও উঠিয়ে নেওয়া হলো পুলিশ ভ্যানে।
–
মোদন বার-এ পুলিশ ফোর্স সহ মিঃ আরিফ এবং মিঃ ইয়াসিন পৌঁছার পূর্বেই ভোলানাথ পৌঁছে গেলো।
ম্যানেজার নাথুরাম মহাতক শুয়ে নাক ডাকছিলো ভোলানাথ তার দেহে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেলো নাথুরামের, দড়-বড় উঠে বসে চোখ রগড়ে বললো–তুমি। ওস্তাদ কই? আর আর সব কোথায়? টাকা এক লাখ কোথায়…
পুলিশ কান্দাই পর্বত থেকে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে গেছে।
কোথায়? ঢোক গিলে বললো নাথুরাম।
ভোলানাথ বললো–পুলিশ অফিসে।
তুমি যাওনি?
আমার ভাগ্য মন্দ তাই বাদ পড়েছি।
তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না ভোলা?
পারবে একটু পরে। নাও ওঠো দেখি। ভোলানাথ রিভলভার উদ্যত করে ধরলো।
নাথুরামের চোখ দুটো ছানাবড়ার মত হলো, ভোলার হাতের উদ্যত রিভলভারের দিকে তাকিয়ে শুষ্ক কণ্ঠে বললো–আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছো ভোলা?
ঠাট্টা নয় আদর করছি। উঠো নাথুরাম, লক্ষী ছেলের মত উঠে পড়ো দেখি……….
নাথুরামের চোখে-মুখে এবার ভীতিভাব ফুটে উঠলো, ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো সে শয্যা : ত্যাগ করে। কম্পিত কণ্ঠে বললো–ভোলা তুমি…
হা দেখতেই পাচ্ছো আমি……….
কিন্তু…..
চলো কথা পরে হবে, বের করো চাবীর গোছা?
চাবী?
হা।
চাবীর গোছা কি করবে ভোলা?
সব পরে বুঝবে। বৈর করো বলছি।
নাথুরাম চাবীর গোছা বের করে।
ভোলানাথ বলে–চলো আমার সঙ্গে।
নাথুরাম যন্ত্রচালিতের মত এগুতে থাকে। বন্দীদের কক্ষের সম্মুখে এসে দাঁড়ায় ভোলা বলে–চাবী দিয়ে তালা খুলে ফেলো নাথুরাম।
নাথুরাম বিলম্ব করছিলো ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠে ভোলা-মরতে না চাও শীঘ্র তালা খোল।
অগত্য তালা খুলে দিলো নাথুরাম।
ভোলানাথ বললো–ভিতরে চলো, নিজের হাতে বন্দীদের মুক্তি করে দাও।
বন্দীদের মুক্তি—
হাঁ, খোল ওদের শিকলের তালা।
ভোলার হাতের উদ্যত রিভলভারের দিকে ভীত নজরে তাকিয়ে নাথুরাম বন্দীদের হাত-পা থেকে লৌহ-শিকলের তালা খুলে দিলো এক এক করে।
বন্দী অসহায় জীর্ণ-শীর্ণ লোকগুলো মুক্তি পেয়ে যেন নব জীবন লাভ করলো। সবাই হাত এবং পায়ের ক্ষতগুলিতে হাত বুলিয়ে নীরবে মুক্তির আনন্দ উপভোগ করতে লাগলো।
ভোলা এবার নাথুরাকে বললো—-তোমাদের বার-এর যত পাহারাদার আছে এবং অন্যান্য যারা আছে এখানে তাদের উপস্থিত করো। নইলে এক্ষুণি তোমাকে যমালয়ে পাঠাবো।
নাথুরাম একটা মেশিনে চাপ দিতেই সাইরেনের মত কোকোঁ —-আওয়াজ হতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে যেখানে যে যেমন অবস্থায় ছিলো সবাই এসে হাজির হলো।
ভোলানাথ দরজা বন্ধ করে রিভলভার উদ্যত করে ধরলো, বললো–খবরদার কেউ একচুল নড়বে না।
ভোলার হাতে উদ্যত রিভলভার দেখে বার-গৃহের কর্মচারী এবং অন্যান্য সবাই হতভম্ব হয়ে গেলো। সবাই বিবর্ণ মুখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে লাগলো একবার ভোলানাথ আর ম্যানেজারের মুখে।
ম্যানেজার নাথুরামও করুণ অসহায় চোখে তাকাচ্ছে তার সঙ্গী-সাথীদের দিকে, কিন্তু কিছু। বলতে সাহসী হচ্ছে না কারণ ভোলার হাতে মরণাস্ত্র রয়েছে।
ভোলা কঠিন কণ্ঠে বললো–যাও, সবাই নিজ নিজ হাতে এবং পায়ে শিকল পরে নাও! বিলম্ব করলে মরবে আর যদি ঠিক মত ঐ শিকলগুলো হাতে পায়ে পরে নিজেদের হেফাযতে রাখো তাহলে–ওস্তাদ এসে তোমাদের মুক্ত করে দেবে।
বাধ্য হলো সবাই বন্দীদের পরিত্যক্ত লৌহ-শিকল নিজ নিজ হাত-পা আবদ্ধ করতে।
ভোলা বললো-”নাথুরাম তোমার হাতে চাবী আছে। তুমি ওদের শিকলগুগো তালা। আটকিয়ে দাও।
নাথুরাম মনে মনে ফুলছিলো, দাঁতে দাঁত পিষে বললো– ভোলা এসব কি করছো তুমি?
গম্ভীর কণ্ঠে বললো ভোলানাথ–এখনও বুঝতে পারোনি নাথুরাম? যাও আদেশ পালন করো।
নাথুরাম এবার সুর নরম করে বললো ভোলা তোমার এই কি ন্যায় নীতি? এই কি তোমার কাজ?
হাঃ হাঃ হাঃ…..অট্টহাসিতে ভেঙে পড়লো ভোলানাথ। তারপর হাসি থামিয়ে বললো– নিকৃষ্ট বার-এ কর্মচারী আমি আমার আবার ন্যায় নীতি….হাঃ হাঃ হাঃ….হাঃ হাঃ হাঃ…নাথুরাম যদি মঙ্গল চাও এক মুহূর্ত বিলম্ব করো না, যা বললাম, শোন।
এবার নাথুরাম তার দলবলের হাতে পায়ে শিকলে তালা বন্ধ করে সরে দাঁড়ালো, ভোলার আদেশ অমান্য করার সাহস হলো না তার।
ভোলা এবার নাথুরামের হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে দিলো।
তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুক্ত বন্দীদিগকে লক্ষ্য করে বললো –তোমরা সচ্ছন্দে বিদায় গ্রহণ করতে পারো। তোমাদের সম্মুখে মুক্ত দরজা রয়েছে যাও তোমরা।
