বনহুর আসন গ্রহণ করতেই রহমান বললো–সর্দার, একটা সংবাদ আছে।
জানি তোমরা কি বলতে চাও? মঙ্গল ডাকু তার অনুচরদের হত্যার খবর জানতে পেরেছে।
হা সর্দার—
এই সংবাদে সে ভীষণভাবে ক্ষেপে গেছে!
হা, আমাদের আস্তানার সন্ধানে তার সমস্ত অনুচরকে উত্তেজিত করে তুলেছে–
বনহুর অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ে যেন–হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ–সে হাসির শব্দে দরবারকক্ষ যেন থর থর করে কেঁপে উঠে। অনুচরগণের হৃৎপিন্ড যেন শিউরে উঠে অজ্ঞাত এক আশঙ্কায়।
বনহুর হাসি থামিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে–আমার আস্তানার সন্ধান লাভের পূর্বেই মঙ্গল ডাকুর আস্তানা আমি নিশ্চিহ্ন করে ফেলবো! রহমান, অনুচরগণকে অস্ত্রশস্ত্রে প্রস্তুত হয়ে নিতে আদেশ দাও। আজ রাতেই আমি ঝাঁম জঙ্গল আক্রমণ করবো।
কান্দাই পর্বতমালার দক্ষিণ পাদমূলে এসে দাঁড়ালো মোদন তার দলবল সহ। একটা পাল্কীর মধ্যে মহারাজ দেবকী নারায়ণকে রাখা হয়েছে। পাল্কীর বেয়ারাগণও মোদনের লোক।
রাত্রি গম্ভীর হয়ে এসেছে।
চারিদিকে একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে।
গাঢ় অন্ধকারে চারিদিকে, আচ্ছন্ন।
মহারাজ দেবকী নারায়ণ মোসনের ইংগিতে উচ্চকণ্ঠে ডাক দেয়–কে এসেছে আমাকে নিতে, সামনে এসো! আমি মহারাজ দেবকী নারায়ণ বলছি…..
মহারাজের কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধ রাত্রির জমাট অন্ধকার ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে কান্দাই পর্বতমালার পাদমূলে। কেঁপে কেঁপে ফিরে আসে প্রতিধ্বনি আবার মহারাজের কানে। মোদন আর ভোলানাথ মহারাজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মোদনের হাতে পিস্তল আর ভোলার হাতে ছোরা।
মোদনের অন্যান্য অনুচরগণ সহ মানসিং মহারাজের পাল্কীর অনতিদূরে আত্মগোপন করে আছে। মহারাজের লোক তাদের দেখতে না পায় সেইভাবে তারা লুকিয়ে আছে।
হঠাৎ অন্ধকারে এগিয়ে আসে মহারাজের লোক, একটা থলের মধ্যে আছে এক লাখ টাকা।
লোকটার অদূরে অন্ধকারে উদ্যত রাইফেল হাতে সারিবদ্ধভাবে পুলিশ ফোর্স অপেক্ষা করছে।
টাকার থলে হাতে মহারাজের লোক এগিয়ে এলো।
একজন উচ্চকণ্ঠে বললো–মহারাজ আপনি কোথায়? আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না আমি……….।
মোদন মহারাজের পিঠে আঘাত করে বললো–বলুন আমি এখানে!
মহারাজ বলে উঠলেন–এই যে আমি এখানে! কে এসেছো এগিয়ে এসো।
মোদন আর ভোলানাথ সরে দাঁড়ায়।
একটা লোক থলে হাতে পাল্কীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে ডাকলো –মহারাজ—-
এই যে আমি……….বললেন মহারাজ।
মোদন আর ভোলানাথ পাল্কীর আড়াল থেকে সরে এলো দ্রুতভাবে, লোকটার দু’পাশে দু’জন দাঁড়ালো। মোদন ইংগিৎ পূর্ণ শব্দ করলো, সঙ্গে সঙ্গে মোদনের দলের লোক অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে পাল্কীসহ মহারাজ এবং মহারাজের লোকটিকে ঘিরে ধরলো।
মোদন লোকটার হাত থেকে টাকার থলে একটানে কেড়ে নিয়ে তার তল পেটে পিস্তলটা চেপে ধরলো।
কিন্তু ভোলানাথের হাতের সূতীক্ষ্ণধার ছোরা ততক্ষণে বিদ্ধ হয়ে গেছে মোদনের পিঠে। মোদন পিস্তল থেকে গুলি ছোরার সুযোগ আর পেলো না, মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো ভূতলে। একটা তীব্র আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়লো কান্দাই পর্বতের কন্দরে কন্দরে।
ভোলানাথ হুইসেল ধ্বনি করলো।
বিদ্যুৎ গতিতে পুলিশ ফোর্স ঘিরে ফেললো জায়গাটা, সকলের হাতেই গুলিভরা রাইফেল।
সম্মুখে মিঃ আরিফ এবং মিঃ ইয়াসিন উভয়ের হাতে রিভলভার। বজ্র কঠিন কণ্ঠে বললেন মিঃ আরিফ–হ্যান্ডস– আপৃ–খবরদার একচুল কেউ নড়োনা গুলি করে হত্যা করবো।
পুলিশ ফোর্স এমনভাবে ঘিরে ধরেছিলো একটি প্রাণীও পালানোর সুযোগ পেলো না।
মিঃ ইয়াসিন আলো জ্বালার জন্য নির্দেশ দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা মশালে আগুন জ্বেলে দেওয়া হলো।
আলোকিত হয়ে উঠলো কান্দাই পর্বতের পাদমূল।
মিঃ আরিফ শয়তানের দলবলকে গ্রেপ্তার করার আদেশ দিলেন।
পুলিশ ফোর্স প্রত্যেকের হাতে হাত কড়া পরিয়ে মাজায় দড়ি বেঁধে ফেললো।
কিন্তু ভোলানাথ কোথায়। মানসিং তাকালো তার দল বলের দিকে, খুঁজতে লাগলো সে ভোলানাথকে।
মিঃ আরিফ মশালের আলোতে তাকালেন ভুলুণ্ঠিত মোদনের দিকে। পিঠে সূতীক্ষ্ণ ছোরাখানা বিদ্ধ হয়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। অবাক হয়ে গেলেন মিঃ আরিফ আর মিঃ ইয়াসিন ছোরায় গাঁথা একখানা ভাজ করা কাগজ।
মিঃ আরিফ নিজ হস্তে ছোরাখানা খুলে নিলেন, তারপর ভাঁজ করা কাগজখানা মেলে ধরলেন মশালের আলোর সামনে, পড়লেন তিনি
–চরম পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি নিজ হাতে সমাধা করলাম। অন্যান্যদের বিচার ভার রইলো পুলিশের উপরে।
–দস্যু বনহুর।
মিঃ আরিফ এবং মিঃ ইয়াসিন উভয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ী করে নিলেন।
মিঃ আরিফ একজন পুলিশকে ইংগিৎ করলো নিহত লোকটাকে চীৎ করে ফেলার জন্য।
পুলিশ মোদনকে চীৎ করতেই বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন মিঃ ইয়াসিন–এ যে মদনমোহন বার-এর মালিক। সঙ্গে সঙ্গে মানসিং-এর মুখে তাকালেন–মানসিং আপনারাই এই শয়তান দলের নেতা?
মানসিং লজ্জায় ভয়ে মরিয়া হয়ে মাথা নীচু করলো। কালো হয়ে উঠেছে তার মুখমণ্ডল। মোদনের রক্তাক্ত মৃত দেহের দিকে তাকিয়ে আছে সে বিবর্ণ ফ্যাকাশে মুখে, ভাবছে ভোলানাথই তবে দস্যু বনহুর। এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারলো দস্যু বনহুর তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করলো।
মহারাজ দেবকী নারায়ণ মুক্তির আনন্দে অধির হয়ে মিঃ আরিফকে জড়িয়ে ধরলেন আপনাদের জন্যই আজ আমি জীবন ফিরে পেলাম, আশীর্বাদ করি……….
