কি নিষ্ঠুর পিতা তুমি! নিজ সন্তানের কাছে আত্মগোপন করে থাকতে চাও।
মনিরা লক্ষীটি জানোনা কেন আমি আত্মগোপন করে নিজ সন্তানের কাছে লুকিয়ে থাকতে চাই? কেন আমি নূরের কাছে পরিচয় দিতে চাই না?
জানি, তাই বলে তুমি–
আমি দস্যু, আমি ডাকু নরহন্তাকারী–আমার সন্তান যেন এ কথা কোনোদিন জানতে না। পারে। মনিরার হাত মুঠায় চেপে ধরে বনহুর–বলো মনিরা নূরের কাছে কোনোদিন তুমি আমার পরিচয় দেবে না, বলো? বলো মনিরা? যেদিন জানবো নূর জানতে পেরেছে তার পিতা দস্যু নর হন্তাকারী সেইদিন চিরকালের জন্য তুমিও আমাকে হারাবে–
স্বামীর মুখে হাতচাপা দেয় মনিরা, ব্যাল কণ্ঠে বলে–না না, শপথ করে বলছি, কোনোদিন আমি তোমার পরিচয় তাকে জানাবো না। তবু আমি হারাতে পারবো না তোমাকে।
মনিরা! বনহুর আবেগ-ভরা চাপা কণ্ঠে ডাকে, তারপর ঘনিষ্ঠভাবে টেনে নেয় বলিষ্ঠ বাহু। দুটির মধ্যে।
মনিরা বলেছিঃ নূর হঠাৎ যদি জেগে উঠে?
বনহুর সুইচটা টিপে ঘর অন্ধকার করে ফেলে, শোনা যায় তার চাপা শান্ত কণ্ঠস্বর–জেগে উঠার পূর্বেই আমি পালিয়ে যাব মনিরা!
মনিরার কণ্ঠস্বর–এখনও তুমি ঠিক আগের মতই দুষ্ট রয়েছে।
.
ঘুমন্ত নূরের শিয়রে এসে দাঁড়ায় বনহুর, অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ সে সন্তানের মুখের দিকে, তারপর ছোট্ট একটা চুম্বনরেখা এঁকে দেয় ওর লালটে।
মনিরার কক্ষ থেকে বনহুর যখন বেরিয়ে আসে তখন সমস্ত চৌধুরী বাড়ি সুপ্তির কোলে ঢলে। পড়েছে।
অল্পক্ষণ পর শোনা যায় অশ্বপদ শব্দ।
তাজের পদশব্দ বুঝতে পায় নূরী, মনিরাও বুঝতে পারে এ তার স্বামীর অশ্বের খুঁরের আওয়াজ। মনিরা পুত্রকে বুকে আঁকড়ে ধরে–বাপ নূর, আমার নূর–
হঠাৎ মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় নূরের, চোখ রগড়ে তাকায়।
মনিরার, গন্ড বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু! কতদিন পর পুত্রের পাশে। এসেছিলো পিতা, কিন্তু কি নির্মম অভিশাপ। চিরদিনের জন্য তার কণ্ঠ রোধ হয়ে গেছে, আর কোনোদিন সে তাকে বলতে পারবে না তার পিতা কে। নূর আজ পিতার সন্তান হয়েও পিতাহারা।
মা, তুমি কাঁদছো? কচি হাত দু’খানা দিয়ে মায়ের মুখখানা উঁচু করে ধরে বলে নূর।
মনিরা সন্তানকে আরও নিবিড়ভাবে বুকে টেনে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে বলে–একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিলাম বাপ, তাই–
আম্মি–কি দুঃস্বপ্ন দেখেছিলে? বাপির তো কোনো অমঙ্গল হয়নি?
না বাবা, তোমার বাপি ভালই আছে।
কবে আসবে আমার বাপি বলো না আম্মি?
মনিরা পুত্রের কথার কোনো জবাব দিতে পারে না। তার অশ্রু কিছুতেই বাধা মানছিলো না, বিন্দু বিন্দু গড়িয়ে পড়ছিলো নূরের চোখে মুখে।
নূর তার ছোট্ট হাত দুখানা দিয়ে মায়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো আবার–আম্মি, বাপির কথা বললেই তুমি কাদো! কেন কাঁদো আম্মি?
না না, কিছু না বাপ। তুমি ঘুমাও–মনিরা নূরকে শুইয়ে দিয়ে চুলে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
এখানে মনিরা যখন সন্তানকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত তখন বনহুরের অশ্ব ছুটে চলেছে কান্দাই জঙ্গলের দিকে। নিস্তব্ধ প্রান্তরে তাজের খুঁরের প্রতিধ্বনি এক অদ্ভুত শব্দের সৃষ্টি করে চলেছে।
প্রশস্ত পথ।
দুই ধারে সারিবদ্ধ পাইন আর শালগাছ। আর ছড়িয়ে আছে তামাক ও চা বাগান। কোনো জনমানবের সাড়াশব্দ নেই, কাকড় বিছানো পথে অশ্বের খুঁরের আঘাতে রক্তাভ ধূলি কণাগুলো যেন মেঘে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
ভোর হবার পূর্বেই বনহুর আস্তানায় পৌঁছে গেলো।
রহমান, কায়েস ও বনহুরের অন্যান্য অনুচরগণ চঞ্চলভাবে তখন অপেক্ষা করছিলো তাদের সর্দারের জন্য। সকলের চোখেমুখেই উদ্বিগ্নতার ছাপ ফুটে উঠেছে।
বনহুর অশ্ব থেকে অবতরণ করতেই দু’জন বলিষ্ঠ অনুচর অশ্ব বগলা চেপে ধরলো, তারপর নিয়ে গেলো অশ্বশালার দিকে।
বনহুর অনুচরগণের মুখোভাব লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো নিশ্চয়ই কোনো কিছু ঘটেছে। সকলের মুখেই কেমন যেন একটা উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বনহুর এগুতেই রহমান ব্যাগ্রভাবে সরে এলো–সর্দার একটা সংবাদ আছে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–বুঝতে পেরেছি। তোমরা দরবারকক্ষে যাও আমি এক্ষুণি প্রস্তুত হয়ে আসছি।
রহমান অনুচরগণকে নিয়ে চলে গেলো দরবারকক্ষের দিকে।
বনহুর চললো তার বিশ্রামকক্ষে।
কক্ষে প্রবেশ করে মাথার পাগড়িটা ছুঁড়ে দিলো শয্যার উপরে। রিভলভারসহ বেল্টটা খুলে। রাখলো টেবিলে। তারপর প্রবেশ করলো স্নানকক্ষে।
পূর্ব আকাশে তখন ভোরের সূর্য উঁকি ঝুঁকি মারছে। কান্দাই জঙ্গলের শাখায় শাখায় জেগে উঠেছে পাখির কলরব। মহুয়া ফুলের সুরভী নিয়ে মাতাল হাওয়া ছুটোছুটি করছে বনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।
বনহুরের স্নানাগার ছিলো অদ্ভুত ধরনের। চারিপাশে সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা প্রশস্ত জায়গায়। উপরে কোন ছাদ বা চালা ছিলো না। ভিতরটা ছিলো উঁচুনীচু ঠিক পাহাড়ের চূড়ার মত অসমতল, মাঝখানে বয়ে চলেছে ঝরণাধারা ঠিক পাহাড়িয়া ঝরণার মত। কাক চক্ষুর ন্যায় সচ্ছ জল, বনহুর এই ঝরণায় ইচ্ছামত স্নান করতো। পাথর কেটে এই ঝরণা ধারা সৃষ্টি করা হয়েছে।
বনহুর স্নানাগার থেকে যখন বেরিয়ে এলো তখন তাকে ধীর-স্থির বলেই মনে হচ্ছিলো। তারপর যখন দরবারকক্ষে এসে আসনে বসলো তখন তার মুখমন্ডল কঠিন, চোখ দুটো যেন অগ্নিশিখার মত জ্বলছে।
