*
ফুলের ব্যবহারে মনিরা খুব খুশি। শুধু মনিরাই নয় চৌধুরী বাড়ির সবাই মুগ্ধ হয়ে গেছে। মরিয়ম বেগম, এমন কি বাড়ির চাকর-বাকর সবাই এই চঞ্চলা মেয়েটিকে ভালবেসে ফেললো। নূর প্রথম প্রথম ওকে এড়িয়ে চলতো। হঠাৎ ফুল যদি ওকে ধরে ফেলতো তখন কেঁদে কেটে আকুল হতো। কিছুতেই ফুলকে সে দেখতে পারতো না।
একদিন বাগানে খেলা করছিলো নূর, ফুল চট করে ধরে কোলে তুলে নেয়, আদর করে চুমু দেয় নূরের ছোট্ট গালে।
আচমকা ফুলের এ আচরণে নুর হকচকিয়ে যায়, চিৎকার করে কেঁদে উঠে আম্মি আম্মি—
মনিরা পুত্রের চিৎকার শুনে বেরিয়ে আসে–কি হলো, কি হলো নূর, নূর—
মাকে দেখতে পেয়ে ছুটে পালিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে নূর মায়ের কোলে।
মনিরা নূরকে বুকে তুলে নিয়ে বলে উঠে–কি হয়েছে বাপ? অদূরে ফুলের দিকে তাকায় মনিরা।
ফুল হেসে বলে– আপামনি আমি বাবুকে একটু কোলে করেছিলাম তাই–
হাসে মনিরা–দুষ্ট ছেলে ও একটু কোলে করেছে তাই অমন করে চিৎকার করতে হয় বুঝি?
নূর কোনো কথা বলে না, তাকায় ফুলের দিকে।
ফুল হাসে।
এমনি করে বেশ কয়েকটা দিন কেটে যায়, ফুলের সঙ্গে নূরের ভাব সম্পূর্ণ জমে না উঠলেও অনেকটা ঘনিষ্ঠ হয়ে এসেছে। ফুল যতদূর সম্ভব নূরকে নিজের কাছে পাওয়ার জন্য সদা ব্যাকুল।
আজকাল ফুলমিয়াও এ বাড়িরই একজন হয়ে গেছে। সব সময় সে সরকার সাহেবের সঙ্গে নানা কাজে ব্যস্ত থাকে। মরিয়ম বেগম অনেক সন্তুষ্ট ফুলমিয়ার উপর।
মনিরা কিন্তু স্বামীর জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটা দিন যেন তার কাছে এক একটা যুগ বলে মনে হচ্ছে। রোজই সে ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করে চলেছে, কিন্তু আজও তার সাক্ষাৎ নেই।
এ বাড়ির আর একজনও ঠিক মনিরার মতই বনহুরের জন্য উন্মুখ, সে হলো ফুল। সেদিনের পর থেকে রোজই সে রাতের অন্ধকারে মুক্ত জানালায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে নিশীথের অন্ধকারে কোন অশ্ব-পদশব্দের। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ধরে আসে, অবশ হয় সমস্ত দেহটা। চোখ দুটি বুজে আসে আপনা আপনি। ক্লান্ত দেহখানা নিয়ে এক সময় ঢলে পড়ে ফুল বিছানায়, একগুচ্ছ হাস্নাহেনার মত নেতিয়ে পড়ে সে।
চৌধুরী বাড়ির নিচের এক কামরায় থাকে ফুল। পাশের কামরায় থাকে অন্যান্য মহিলা ঝি এবং দাসীগণ। সমস্ত দিন পরিশ্রম করে রাতে নিজ কামরায় এসে বসতো। নির্জন কক্ষে বসে ভাবতো তার হুরের কথা।
নূরী যখন ভাবছে তার হুরকে নিয়ে, উপরের একটি কক্ষে তখন মনিরাও ভাবছে তার স্বামীর কথা। কতদিন চলে গেলো তবু আসছে না কেন সে। উভয়ের চিন্তার কারণ একই জন।
অন্যান্য দিনের মত আজও বনহুরের কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নূরী। হঠাৎ একটা চাপা কণ্ঠস্বর–নূরী–নূরী–
আচমকা ঘুম ভেঙে যায় নূরীর, স্পষ্ট শুনতে পায় তার প্রতীক্ষিত জনের কণ্ঠস্বর দড়বড় শয্যা ত্যাগ করে ছুটে যায় মুক্ত জানালার পাশে।
জানালা দিয়ে সন্তর্পণে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে বনহুর, ডাকে সে-নূরী!
নূরী আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বনহুরের বুকে –হুর, তুমি এসেছো?
বনহুর গভীর আবেগে নূরীকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বলে–কেমন আছো নূরী?
ভাল আছি কিন্তু তোমাকে না পেয়ে আমি জীবন্ত হয়ে আছি হুর। কেন তুমি এতোদিন এলে না?
অনেক কাজ ছিলো নূরী।
নূরী বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে বলে–হুর!
বনহুর নূরীর চিবুকটা তুলে ধরে মুখের কাছে, তারপর আরও ঝুঁকে পড়ে বনহুরের মুখখানা নূরীর ওষ্ঠদ্বয়ের উপরে।
চোখ দুটো মুদে আসে নূরীর গভীর আবেশে।
বনহুর নূরীর ললাট থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ডাকে–নূরী!
বলো?
কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো তোমার এখানে?
না, বেশ আছি। মনিরা আপা, আম্মা আর নূরকে নিয়ে বেশ আছি। যাও হুর, মনিরা আপা তোমার জন্য ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করছে। যাও, যাও তুমি–
যাবো, কিন্তু–
না না, কোনো কিন্তু নয়, তুমি যাও। আমার চেয়ে সে তোমার জন্য বেশি উদগ্রীব রয়েছে।
নূরী!
হাঁ, যাও হুর।
নূরী অদ্ভুত মেয়ে তুমি।
নিজকে বনহুরের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে নেয় নূরী। বনহুরের জামার বোতামগুলো ঠিকভাবে লাগিয়ে দিয়ে আঙ্গুল দিয়ে চুলগুলো গুছিয়ে দেয়–যাও এবার।
বনহুর যে পথে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করেছিলো ঐ পথে বেরিয়ে যায়। সমস্ত চৌধুরী বাড়িটা যেন নিঝুম পুরীর মত ঝিমিয়ে পড়েছে। মনিরার কক্ষের পিছনে এসে দাঁড়ায় বনহুর, তারপর পাইপ বেয়ে উঠে যায় উপরে।
মনিরা এখনও ঘুমাতে পারেনি–সে ভাবছিলো কত কথা। জীবনের কত স্মৃতি ভেসে উঠছিলো তার মনে। পাশেই ঘুমিয়ে রয়েছে নূর।
বনহুর দরজায় মৃদু টোকা দেয় পর পর তিনবার।
মনিরা জানে এ সংকেত তার স্বামীর। মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠে তার চোখ দুটো।
দরজা খুলে দিয়েই অস্কুটধ্বনি করে উঠে মনিরা–উঃ কি মানুষ তুমি।
কেন? ভিতরে প্রবেশ করে বলে বনহুর।
সেই যে চলে গেলে তারপর আর সাক্ষাৎ নেই। নূর তোমার জন্য পাগল।
আর তুমি? বনহুর মনিরাকে টেনে নেয় কাছে।
স্বামীর বুকে মাথা রেখে বলে–না কেঁদে তোমাকে কোনো দিন পেয়েছি বলো? চোখের পানিতেই যে তুমি খুশি।
মনিরা!
জানো নূর সব সময় তোমার কথা বলে।
মাফ করো মনিরা, আমি নূরের কাছ থেকে সরে থাকতে চাই। আর সেই কারণেই সেইদিন আমি আসতে চাইনি তোমার সঙ্গে।
