রহমান তৎক্ষণাৎ বন থেকে কতকগুলো লতাপাতার দ্বারা মজবুত দড়ি তৈরি করে ফেললো, তাই দিয়ে বেঁধে ফেললো ডাকুটাকে।
লোকটা যে অত্যন্ত শক্তিশালী বলিষ্ঠ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যেমন ভয়ঙ্কর চেহারা তেমনি বিরাট দেহ। বনহুর নিজের অশ্বের পিছনে উঠিয়ে নিলো ওকে পিছমোড়া করে বেঁধে।
বনহুর ও রহমান মঙ্গল ডাকুর একজনকে বন্দী করে নিয়ে ফিরে এলো আস্তানায়।
আস্তানায় ফিরে আদেশ দিলো বনহুর–ওকে দরবারকক্ষে নিয়ে এসো।
বনহুর তার আসনে এসে বসলো।
কয়েকজন অনুচর সূতীক্ষ্ণধার বর্ষা আর রাইফেল নিয়ে দন্ডায়মান বনহুরের সম্মুখে। রহমান আর কায়েসও দাঁড়ালো বনহুরের আসনের পাশে।
হাত পা শৃঙ্খল অবস্থায় মঙ্গল ডাকুর অনুচরটিকে নিয়ে আসা হলো দরবারকক্ষে।
বনহুর গর্জন করে উঠলো–তোদের দলপতির নাম কি বল?
মঙ্গল ডাকু।
হা, জীবন নিয়ে যদি ফিরে যেতে চাস তবে আমার প্রশ্নের জবাব দে।
লোকটা হাঁপাচ্ছে। সে তাকালো বনহুরের দিকে।
বনহুর বললো–আমাদের দলের দু’জন লোককে তোদের দলপতি ধরে নিয়ে গিয়েছিলো– তারা এখন কোথায়?
বনহুরের কঠিন কণ্ঠস্বরে লোকটার বিরাট দেহটা যেন কেঁপে উঠলো, গোলাকার অগ্নি চক্ষু দুটো কেমন যেন অসহায় মনে হলো, বললো সে–আমাকে যদি প্রাণে না মারেন তবে আমি সত্যি কথা বলবো।
হাঁ, তাই বলো! মনে রেখো, এক বিন্দু যদি মিথ্যা হয় তাহলে তোমার জিহ্বা লৌহ-সড়াসী দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।
লোকটা ডাকু হলেও নিজের প্রাণের মায়ায় সে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েছে–কাঁপছে লোকটা।
বনহুর পুনরায় গর্জে উঠলো–বলো দস্যু বনহুরের অনুচর দুটিকে তোমরা কি করেছো?
বলছি বলছি আমি–একটু থেমে বললো লোকটা–হুঁজুর সত্যি কথা বললে আমাকে হত্যা করবে না তো?
না, তোমাকে মুক্তি দেবো।
হুজুর, আপনার অনুচর দু’জনকে আমরা হত্যা করেছি। কারণ তারা কিছুতেই আপনার নাম আর আস্তানার সন্ধান আমাদের বলেনি। একজনের চক্ষু দুটি উপড়ে ফেলা হয়েছিলো। কান কেটে দেওয়া হয়েছিলো। আমরা ভেবেছিলাম সঙ্গীর কঠিন মৃত্যু যন্ত্রণা দেখে ভয় পেয়ে সব বলবে কিন্তু তবু তারা নির্বাক ছিলো।
তারপর?
তারপর একজন মারা পড়লো, দ্বিতীয় জন তবু এতোটুকু বিচলিত হলো না। তাকেও আমরা মৃত্যুদন্ড দেবো স্থির হলো। ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে তাকে। সমস্ত দেহে আগুন ধরিয়ে জীবন্ত পুড়ে মারা হবে। সব প্রস্তুত অশ্বপিঠে তাকে আমারা গহন জঙ্গল মধ্যে নিয়ে চললাম কারণ গভীর রাতে গহন জঙ্গলে তাকে পুড়ে মারা হবে। আমরা বেশ কয়েকজন মিলে চললাম, আমাদের সর্দারও ছিলো। হুজুর, একটি মিথ্যাও বলবো না সব বলবো।
বল্ সব খুলে বল্? বললো বনহুর, তার চোখ দুটি দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে।
লোকটা জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত আগ্রহশীল, সে বলে চললো সব কথা তবুও যদি জীবনটা ফিরে পায়–হঠাৎ সে আমাদের চোখে ধূলো দিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে ছুটে পালাতে গেলো, ঐমুহূর্তে সর্দার মঙ্গল ডাকু তার সূতীক্ষ্ণধার ছোরাখানা দ্রুত-হস্তে নিক্ষেপ করলো তাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু তাকে আমরা রুখতে পারলাম না,ছোরাবিদ্ধ অবস্থায় অশ্বপৃষ্ঠে গহন জঙ্গলে কোথায় যে চলে গেলো আর তাকে খুঁজে পেলাম না।
হু সে ফিরে এসেছিলো আমার আস্তানায় এবং তার মৃত্যু হয়েছে। এবার বল তোমাদের সর্দারের আস্তানার পথের সন্ধান।
আমাকে মুক্তি দেবেন তো?
দেবো তার সঙ্গে পুরস্কারও পাবি।
সত্যি?
হাঁ, জীবনে আর তোকে কোনো চিন্তা করতে হবে না।
লোকটার চোখমুখ খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠলো সে বলতে শুরু করলো সারথী বনের দক্ষিণে ঝাঁম জঙ্গল। এই জঙ্গলে একটা শিব মন্দির আছে, ঐ মন্দিরের মধ্যে আছে একটি সুড়ঙ্গপথ। সেই সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করলে আমাদের মঙ্গল ডাকুর আড়া। জঙ্গলেই পাবেন–
থাক, আর বলতে হবে না। বনহুর এবার এমনভাবে কথাটা উচ্চারণ করলো চমকে উঠলো লোকটা ভীত নজরে তাকালো সে বনহুরের জমকালো পোশাক পরা দেহটার দিকে। একি বনহুরের হস্তে ছোরা কেন শিউরে উঠলো লোকটা।
রহমান, কায়েস এরা জানে, তাদের সর্দার কোনোদিন বিশ্বাসঘাতককে প্রশ্রয় দেয় না। লোকটার পরিণতি সম্বন্ধে পূর্বেই তারা বুঝতে পেরেছিলো, স্তব্ধ নিশ্বাসে দরবারকক্ষস্থ বনহুরের অনুচরগণ কোনো একটা ভয়ঙ্কর কিছুর জন্য প্রতীক্ষা করছিলো।
যদিও লোকটা তার দলের কেউ নয় বা তার এতে কিছু যায় আসে না তবু সে বিশ্বাসঘাতক বনহুর বিশ্বাসঘাতককে ক্ষমা করে না। সে নিজের দলেরই হোক কিংবা অপর কোনো দলের লোক হোক। মৃত্যুভয়ে লোকটা ভীত না হয়ে মৃত্যুকে যদি বরণ করে নিতো তবুও যদি সে নিজ সর্দার বা তাদের আস্তানার সন্ধান না জানাতো তাতে হয়তো লোকটাকে বন্দী করে রাখতে বনহুর কিন্তু নির্মমভাবে হত্যা করতো না বরং মনে মনে সে তার বিশ্বাসের তারিফ করতো।
বনহুর সূতীক্ষ্ণধার ছোরা হস্তে মঙ্গল ডাকুর অনুচরটির দিকে এগিয়ে আসে, তারপর বিনাদ্বিধায়। ছোরাখানা সমূলে প্রবেশ করিয়ে দেয় লোকটার তলপেটে।
মুহূর্ত মধ্যে একটা করুণ আর্তচিৎকার ভেসে উঠে দরবার কক্ষে, পরক্ষণেই লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ে যায় ভূতলে, রক্তে রাঙা হয়ে উঠে দরবারকক্ষের মেঝে।
বনহুর দাতে দাঁত পিষে বলে–বিশ্বাসঘাতক, মৃত্যু ভয়ে নিজের সর্দারকে যমের কবলে তুলে দিতে কসুর করলো না। তারপর হেসে উঠলো অদ্ভুতভাবে–হাঃহাঃ হাঃ মঙ্গল ডাকু। মঙ্গল ডাকুকে আমি দেখে নেবো এবার।
