উল্কাবেগে ছুটতে শুরু করলো তাজ। পশু হলেও তার মনোভাবে প্রকাশ পেলো অফুরন্ত আনন্দ–কতদিন পর আজ সে প্রভুকে নিজের পিঠে পেয়েছে।
তাজের পিছনেই ছুটছে দুলকী।
বন-জঙ্গল ভেদ করে বেগে চলেছে, ঝম অভিমুখে চলেছে বনহুর আর রহমান। উভয়ের শরীরেই জমকালো ড্রেস।
কান্দাই জঙ্গল ত্যাগ করে তীরবেগে অগ্রসর হচ্ছে। রাত এখন গভীর। নির্জন পথ ধরে ছুটে চলেছে, পথে কোনো জন-মানবের চিহ্ন নেই।
কান্দাই জঙ্গল অতিক্রম করে তারা বহুদূর এসে গেছে। সারথী, তারপর বাসুদেবপুর, তারপর . ঝম শহর। নির্জন প্রান্তর অতিক্রম করে তারা এগুচ্ছে। এখন ওরা সারথী জঙ্গলের পাশ কেটে চলছিলো।
হঠাৎ রহমান উচ্চকণ্ঠে বলে উঠে–সর্দার, ঐ দেখুন।
বনহুর তাজের গতি কমিয়ে দিলো।
রহমানও দুলকি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো স্থির হয়ে।
বনহুর আর রহমান সম্মুখে তাকিয়ে দেখলো, দূরে–বহু দূরে জঙ্গলের মধ্যে অনেকগুলো আলো দেখা যাচ্ছে। আলোগুলো যে জ্বলন্ত মশাল, স্পষ্ট বুঝতে পারলো তারা।
রহমান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে বললো–সর্দার, নিশ্চয়ই মঙ্গল ডাকুর দল, কোথাও হানা দিয়ে লুটতরাজ করে ফিরে যাচ্ছে।
হুঁ, সেরকমই হবে। রহমান, আমি এই মঙ্গল ডাকুকে অনুসরণ করবো।
সর্দার, ওদের দলে বহু লোক আছে।
রহমান, তাজ আর দুলকীর গতি লঘু করে নিয়ে সন্তর্পণে এগুতে হবে।
হা সর্দার।
এবার বনহুর আর রহমান অশ্ব ধীরভাবে চালনা করে মশালের আলো অভিমুখে চলতে লাগলো।
রহমান বললো–সর্দার, মঙ্গল ডাকু আজকাল প্রতি রাতেই এভাবে লুটতরাজ করে চলেছে।
তোমরা বাধা দিয়ে কৃতকার্য হওনি!
হা সর্দার, অত্যন্ত দুর্ধর্ষ এই ডাকু।
সেই কারণেই আজ আমারও আগমন! আর শোন রহমান মঙ্গল ডাকু আজ লুটতরাজে বের হয়নি, তারা জ্বলন্ত মশাল নিয়ে বন-জঙ্গলে কিছু অন্বেষণ করে ফিরছে।
সর্দার, এ অনুমান আপনার কি করে হলো?
দেখছো না মশালের আলোগুলো কেমন বিক্ষিপ্ত এবং ছড়ানো, মনে হচ্ছে মশালের আলোতে তারা কোনো বস্তুর সন্ধান করে ফিরছে।
ঠিক বলেছেন সর্দার।
মঙ্গল ডাকুও তার দলবল যে কাওসারকেই অনুসন্ধান করছে সে বিষয়ে কোন ভুল নেই। ঐ দেখো, এখন ওরা অনেক নিকটে এসে গেছে।
সর্দার, আমাদের অশ্ব নিয়ে এভাবে অগ্রসর হওয়া উচিত হবে না।
হাঁ, ঠিক বলেছো রহমান, ওরা যেভাবে সন্ধান চালিয়ে এগুচ্ছে তাতে আমরা অল্পক্ষণেই ওদের। নজরে পড়ে যাবো। এক কাজ করো, তাজ আর দুলকীকে নিয়ে ঐ যে উঁচু টিলাটা দেখা যাচ্ছে। ওখানে তুমি চলে যাও।
আর আপনি?
আমার জন্য ভেবো না রহমান, আমি কোনো গাছে আত্মগোপন করে দেখতে চাই–এই মঙ্গল ডাকু কে এবং কি করম। তুমি মোটেই বিলম্ব করো না যাও।
রহমান তাজ আর দুলকীকে নিয়ে চলে গেলো।
বনহুর পাশের একটা গাছের উপর মাঝডালে বসে রইলো, তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে দেখতে লাগলো–মশালগুলো দ্রুত এদিকেই এগিয়ে আসছে।
অল্পক্ষণেই বনহুরের নজরে পড়লো, কেমন যেন অদ্ভুত ড্রেস পরিহিত ভয়ঙ্কর চেহারার লোক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মশাল হস্তে বন-জঙ্গল অতিক্রম করে এগুচ্ছে।
মশালের আলোতে সব স্পষ্ট দেখতে পেলো বনহুর, দলের অগ্রভাগে দু’জন বলিষ্ঠকায় লোক, তাদের হস্তেও মশাল এবং বল্লম। লোকগুলো দেখতে ঠিক সাক্ষাৎ যমের মত ভয়ঙ্কর।
বনহুর বুঝতে পারলো, এরা কিছু অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে। মশাল উঁচু করে দেখছে এদিক সেদিক এবং নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করছে। বনহুরের কানে গেলো একটা কর্কশ কঠিন কণ্ঠস্বর–বেটা মরলে লাশটা তো পড়ে থাকবে?
হাঁ ঠিক বলেছো জয়সিং মরলে লাশটা পাওয়া যেতো।
ঘোড়াটাই বা গেলো কোথায়? লাশটা না হয় বাঘভলুক খেয়ে ফেলেছে।
তাইতো, ঘোড়াও যে দেখছিনা কোথাও! বললো জয়সিং।
বনহুর ভালভাবে কান পেতে শুনলো–বিপরীত জনের নাম রঘুনাথ। এ দু’জনার মধ্যেই। একজনকে বনহুর মঙ্গল ডাকু মনে করেছিলো কিন্তু এখন বুঝতে পারলো মঙ্গল ডাকু স্বয়ং এদের মধ্যে নেই। এরা সবাই মঙ্গল ডাকুর অনুচর। বনহুর তার বিশ্বস্ত অনুচর কাওসারের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠলো। দলকে কাবু করতে পারলেই দলপতিকে পাকড়াও সম্ভব হবে। মঙ্গল ডাকুর অনুচরগণ কাওসারের মৃতদেহ খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে চলেছে। বনহুরের পিস্তল গর্জে উঠলো, সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠলো সম্মুখে এগিয়ে চলা মশালধারীদের একজন, তৎক্ষণাৎ মুখ থুবড়ে লুটিয়ে পড়লো ভূতলে।
এক অদ্ভুত কান্ড ঘটলো মুহূর্তে। সমস্ত মশাল পট পট করে ঝোপ আর আগাছার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিলো, তারপর যে যেদিকে পারলো ছুটে পালাতে লাগলো।
বনহুর বুঝতে পারলো ওরা আচমকা গুলীর আওয়াজে অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেছে। বিশেষ করে গভীর রাতে গহন জঙ্গলে পিস্তলের শব্দ এলো কোথা হতে। পলাতক কাওসারের নিকটে তো কোনো পিস্তল বা রিভলভার ছিলো না।
বনহুর আরও দুজনকে ভূতলশায়ী করে ফেললো। তারপর দ্রুত বৃক্ষ থেকে নেমে এলো নিচে। একজন উঠিপড়ি করে পালাতে যাচ্ছিলো, বনহুর পিস্তল উদ্যত করে ধরলো–খবরদার পালাতে চেষ্টা করলেই মরবে।
বনহুরের কঠিন কণ্ঠস্বরে এবং তার জমকালো ড্রেস দেখে ভড়কে গিয়েছিলো ডাকুটা, হাত তুলে দাঁড়ালো।
বনহুর পকেট থেকে একটা বাঁশি বের করে ফুঁ দিলো সঙ্গে সঙ্গে রহমান তাজ এবং দুলকীকে নিয়ে হাজির হলো সেখানে।
বনহুর আদেশ দিলো–একে বেঁধে নিয়ে চলো রহমান।
