বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–ছেড়ে দাও ওকে! ও আমাদেরই একজন।
অনুচরটি মুক্ত করে দিলো কেশবকে।
কেশব এবার বুক ফুলিয়ে দাঁড়ালো, মনোভাব–দেখলে তো ধরে এনে কি ফল হলো।
বনহুর বললো–কেশব এখন যাও।
অনুচরটি বনহুরকে কুর্ণিশ জানিয়ে কেশবকে লক্ষ্য করে বললো-এসো।
কেশব একবার বনহুরের দিকে তাকিয়ে অনুচরটির সঙ্গে দরবারকক্ষ ত্যাগ করলো।
উঠে দাঁড়ালো বনহুর, তারপর অনুচরগণকে লক্ষ্য করে স্থির কণ্ঠে বললো–বহুদিন আমি আস্তানা ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলাম। আমার অনুপস্থিতিতেও তোমরা যে অতি সুন্দর, এবং সুষ্ঠুভাবে আস্তানার কাজ সমাধা করেছে এজন্য আমি অত্যন্ত আনন্দ বোধ করছি। রহমান এবং কায়েস, তোমরা আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করো।
রহমান আর কায়েস নত মস্তকে বনহুরকে অভিনন্দন জানালো।
দরবারকক্ষে যখন আনন্দস্রোত বয়ে চলেছে, সেই মুহূর্তে দরবার কক্ষের বাইরে শোনা গেলো দ্রুত অশ্ব-পদশব্দ। পরক্ষণেই দরবারকক্ষে প্রবেশ করলো বনহুরের বিশ্বস্ত অনুচর কাওসার। দরবারকক্ষে প্রবেশ করেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো সে দরবারকক্ষের মেঝেতে।
দরবারকক্ষের সবাই বিস্ময়ে চমকে উঠলো, সবাই দেখলো–কাওসারের পিঠে সূতীক্ষ্ণধার একখানা ছোরা গাঁথা আছে। অন্যান্য অনুচরের মধ্যে কেউ এগিয়ে আসবার পূর্বেই বনহুর নেমে এসে কাওসারের পিঠ থেকে ছোরাখানা তুলে নিলো।
রহমান এবং কায়েসও দ্রুত এসে হাঁটু গেড়ে বসলো কাওসারের পাশে। সকলের মুখেই আতঙ্ক আর উদ্বিগ্নতার ছাপ ফুটে উঠলো।
অন্যান্য অনুচরের মুখ ভয়ঙ্কর আর কঠিন হয়ে উঠেছে। সবাই যেন সাংঘাতিক কোনো এক অবস্থার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলো।
বনহুর ছোরাখানা কাওসারের পিঠে থেকে তুলে নিয়ে বললো কাওসার, কে তোমার এ অবস্থা করেছে?
কাওসার বহুদিন পর সর্দারকে দেখতে পেলো, মৃত্যু-যন্ত্রণা ভুলে গেলো সে, মুহূর্তের জন্য চোখ দুটো চক্ করে উঠলো, অতি কষ্টে বললো–সর্দার–
বলো কাওসার, তোমার এ অবস্থা কেন?
–সর্দার–মঙ্গল ডাকু–আমাকে ধরে–নিয়ে গিয়েছিলো ঝম–শ–হ-র– আমি– পালি–য়ে–আর বলতে পারলো না, কাওসারের মাথাটা কাৎ হয়ে গড়িয়ে পড়লো বনহুরের হাতের উপর।
বনহুর কাওসারের মাথাটা নামিয়ে রাখলো ভূতলে। চোখ দুটি তার জ্বলে উঠলো আগুনের গোলার মত। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললো–রহমান, কে এই মঙ্গলা ডাকু?
সর্দার এখনও আপনাকে একটা কথা বলা হয়নি। কিছুদিন হলো কান্দাই-এর বাইরে ঝাম। অঞ্চলে একজন ডাকুর আবির্ভাব ঘটেছে। অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সাংঘাতিক নরহন্তা এই ডাকু। শুধু ঝম শহরে বা ঐ অঞ্চলে নয়, কান্দাই-এর বুকেও অনেক কুৎসিত কাজ সে সম্পন্ন করে চলেছে। নরহত্যা তার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রহমান বলে চলেছে, স্তব্ধ নিশ্বাসে শুনছে বনহুর, দক্ষিণ হস্তখানা ধীরে ধীরে মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে আসছে তার।
সর্দার, শয়তান মঙ্গল ডাকুর কার্যকলাপে বাধা দেবার চেষ্টা করেছিলাম আমরা। এজন্য তার সঙ্গে আমাদের কয়েকবার লড়াই হয়েছে, কয়েকজন অনুচর জীবনও দিয়েছে। কিন্তু আমরা তাকে। আজও গ্রেপ্তার করতে পারিনি বা তার আড়র সন্ধান পাইনি। সর্দার, ঝাঁম শহর থেকে কান্দাই পুলিশ বাহিনী হন্তদন্ত হয়ে পড়েছে কিন্তু কিছুই করতে পারেনি কেউ–
কাওসারের ঘটনা কি তাই বলো রহমান? বললো বনহুর।
রহমান কাওসারের মৃতদেহটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মনের উচ্ছ্বসিত বেদনাকে চেপে নিয়ে বললো–কাওসারসহ আমরা কয়েকজন মিলে একদিন মঙ্গল ডাকুকে আক্রমণ করেছিলাম। ওদের দলের সঙ্গে আমাদের লড়াই হয়, এ লড়াই-এ উভয় পক্ষেরই লোকজন নিহত হয় আর আহত হয়। বন্দীও হয় আমাদের দু’জন–একজন কাওসার অন্যজন মাহবুব।
এ তুমি কি বলছো রহমান।
হাঁ সর্দার।
মঙ্গল ডাকুর হস্তে আমাদের লোক বন্দী হলো আর তোমরা নিশ্চিন্তে বসে আছে বা ছিলে?
সর্দার, নিশ্চিন্ত আমরা ছিলাম না, অহরহঃ আমাদের লোক এই মঙ্গল ডাকুকে সন্ধান করে ফিরছে।
এতেই তুমি নিশ্চিন্ত আছো রহমান?
না সর্দার, আমি নিজেও প্রতিদিন এই নরহত্যাকারী দস্যু এবং তার আড্ডার অনুসন্ধান করে ফিরছি।
আশ্চর্য! এমন একটা নিদারুণ সংবাদকে তোমরা গোপন রেখে আমাকে নিয়ে তোমরা আনন্দে মেতে উঠেছিলে?
সর্দার, আপনার আবির্ভাবে আমরা ভুলে গিয়েছিলাম সব কিছু। এমন কি আনন্দের আতিশয্যে ভুলে গিয়েছিলাম নিজেদের অস্তিত্ব।
রহমান, আর মুহূর্ত বিলম্ব করা উচিত নয়। কাওসারের মৃত্যুর প্রতিশোধ আমি তিল তিল করে নেবো। এক্ষুণি তাজকে প্রস্তুত করো এবং তুমিও আমার সঙ্গে চলো।
সর্দার।
হাঁ, এক্ষুণি আমি রওয়ানা দেবো।
কিন্তু মঙ্গল ডাকুকে এখন কোথায় পাবেন সর্দার? সে অত্যন্ত ধূর্ত আর শয়তান।
রহমান, আমার চেয়ে ধূর্ত আর শয়তান সে বেশি নয়। ঝম শহরে না গেলে তার সন্ধান পাওয়া যাবে না। যাও, তাজ এবং দুলকীকে প্রস্তুত করে নিয়ে এসো। আর কাওসারের মৃতদেহের সকাজের ব্যবস্থা করতে বলো।
বনহুর দরবারকক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে আসে।
বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করে পিস্তল এবং গুলীর ব্যাগটা তুলে নিলো হাতে। কোমরের বেল্টের সঙ্গে সেগুলোকে সংবদ্ধ করে বেরিয়ে এলো। রহমান, কায়েস এবং আরও কয়েকজন অনুচর আস্তানার বাইরে তাজ আর দুলকীকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলো।
বনহুর তাজের পিঠে চেপে বসতেই রহমান উঠে বসলো দুলকীর পিঠে।
