হেসে বলে বনহুর–জানো না মনিরা, আমার যাওয়া এখন কিছুতেই সম্ভব নয়।
কেন? বললো মনিরা।
আজ নয় পরে বলবো! বললো বনহুর।
মনিরা আর নূরীর সঙ্গে ফুলমিয়াকেও দিয়ে দিলো, ড্রাইভারকে বলে দিলো চৌধুরী বাড়ির ঠিকানা।
মনিরা গম্ভীর হয়ে পড়লো, সে জানে স্বামীকে সে আজ কিছুতেই বাধ্যে আনতে সক্ষম হবে না, কাজেই বনহুরের টাই ছেড়ে দিয়ে বললো–ঠিক কবে আসবে বলো?
নূরীও প্রশ্ন-ভরা উন্মুখ হৃদয় নিয়েই তাকিয়েছিলো বনহুরের মুখের দিকে। বনহুর তাকালো নূরীর দিকে, দুজনার দৃষ্টি বিনিময় হলো, বললো বনহুর–যেদিন স্মরণ করবে সেদিনই হাজির হবো।
বনহুর গাড়ি ছাড়বার জন্য ড্রাইভারকে আদেশ দিলো।
গাড়িতে স্টার্ট দিলো ড্রাইভার।
মনিরার হাতের মুঠা থেকে খসে এলো বনহুরের হাতখানা। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে রইলো মনিরা।
তখন নূরীর চোখ দুটোও শুষ্ক ছিলো না, নিজকে সংযত করে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে বসে রইলো সে।
ড্রাইভারের পাশের আসনে বসেছিল ফুলমিয়া।
মনিরা রুমালে চোখ মুছলো। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললো মনিরা–ফুল, তোর কেউ নেই।
না আপামনি, আমার কেউ নেই।
চিরদিন থাকবি আমার কাছে?
যদি রাখেন থাকবো না কেন?
তোর ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই?
থাকলে আর আসি আপনাদের সঙ্গে! এখন আপনারাই আমার সব।
ফুল?
বলুন আপামনি?
না থাক, পরে বলবো।
বাসায় পৌঁছে মনিরা মামীমাকে সব খুলে বললো। ফুল আর ফুলমিয়ার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিলো মরিয়ম বেগমের। প্রথম নজরেই ফুলকে বড় ভাল লাগলো মরিয়ম বেগমের।
মরিয়ম বেগম নূরীর মাথায় হাত বুলায়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন–আহা বেচারী কি নাম মা তোমার?
নূরীর কাছেও বড় ভাল লাগলো মরিয়ম বেগমকে। ছোট বেলায় সে মাকে হারিয়েছে, মায়ের স্নেহ সে পায়নি কোনোদিন। নূরী মরিয়ম বেগমের মধ্যে তার বহুদিন পূর্বে হারানো মাকে যেন খুঁজে পেলো। হঠাৎ আপন মনেই কদমবুসি করলো নূরী তাঁর।
ফুলমিয়াও মরিয়ম বেগমকে কদমবুসি করলো।
মরিয়ম বেগম ফুলমিয়াকে বৃদ্ধা সরকার সাহেবের হাতে তুলে দিলেন, কারণ এমনি একটি লোকের তাদের প্রয়োজন ছিলো। সরকার সাহেবের দক্ষিণ হস্ত আকারে সর্বক্ষণের জন্য থাকবে সে তার পাশে।
ফুলমিয়াকে পেয়ে সরকার সাহেব খুশি হলেন।
চৌধুরী বাড়িতে আশ্রয় পেলো ফুলমিয়া। নতুন জায়গায় নতুন পরিবেশ হলেও ভালই লাগলো ওর চৌধুরী বাড়িটা। ফুলমিয়ার বড় আশাবাবুকে সে একদিন না একদিন পাবেই।
অনেকদিন পর নূর মাকে পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে।
মনিরা পুত্র নূরকে কোলে তুলে নিয়ে চুমোয় চুমোয় গণ্ড রাঙা করে দিলো।
মনিরা যখন নূরকে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা তখন নূরী অদূরে দাঁড়িয়ে পুলকিত নয়নে দেখছিলো, ইচ্ছে হচ্ছিলো ওর, ছুটে গিয়ে নূরকে বুকে চেপে ধরে কিন্তু পারছিলো না। নূরী অতি কষ্টে নিজকে সংযত রেখে তাকিয়ে ছিলো। বুকটা যেন হাহাকার করে উঠছিলো তার। সেদিনের মনি আজ বড় হয়েছে কি সুন্দর কথা বলতে শিখেছে? ঐ তো চিবুকের পাশে তিলটা যদিও একটু উপরে উঠে গেছে কিন্তু তেমনি আছে। নূরীর বুক ভরে উঠে যেন।
নূরী যদিও তার বাপিকে এখন প্রায় ভুলে এসেছে তবু মাঝে মাঝে দাদীমার কাছে শোনে তার বাপির কথা, তাই মাকে প্রশ্ন করে বসলো নূর”আম্মি, বাপি কোথায়? আমার বাপি এলো না?
মনিরা বললো তোমার বাপি আসবে বাবা। তুমি কিছু ভেবো না আসবে।
কবে আসবে?
যেদিন তুমি ডাকবে।
আমি যখন ডাকবো তখনই আসবে বাপি?
হাঁ বাবা।
এক্ষুণি যদি ডাকি?
আজ নয়, পরে ডেকো।
এগিয়ে আসে নূরী–এসো, আমার কোলে এসো নূর।
মনিরা বলে–যাও, ওর কাছে যাও বাবা।
ও কে আম্মি? মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে নূর।
মনিরা হেসে বলে–ওর নাম ফুল।
ফুল?
হাঁ, আমার নাম ফুল! এসো–কথাটা বলে হাত পাতে নূরী।
মনিরা বলে–যাও বাবা, ওর কোলে যাও, অনেক ফুল ও তোমায় দেবে।
হাসে মনিরা, নূরও হাসে আর হাসে নূরী।
এমনি করে নূরীর সঙ্গে সম্বন্ধ গড়ে উঠে নূরের।
এদিকে যখন চৌধুরী বাড়িতে আনন্দস্রোত বয়ে চলেছে তখন কান্দাই জঙ্গলে দস্যু বনহুরের আস্তানায় সর্দার ফিরে আসায় মহা উৎসব শুরু হয়েছে।
রহমান আয়োজন করেছে এ উৎসবের।
বনহুরের দেহে এখন সম্পূর্ণ জমকালো ড্রেস। মাথায় পাগড়ি কোমরে বেল্টে গুলী-ভরা পিস্তল। সুউচ্চ আসনে বসেছে বনহুর, তার পাশেই দন্ডায়মান রহমান–তার দেহেও দস্যড্রেস। অন্যান্য অনুচর সবাই দন্ডায়মান চারপাশে। রাত এখন কম নয়। কেশব ঘুমিয়ে পড়েছিলো, হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় তার। কখন যে কেশব কক্ষ ত্যাগ করে দরবার কক্ষের অদূরে এসে দাঁড়িয়েছিলো অবাক হয়ে দেখছিলো সব।
একজন অনুচর কেশবকে দেখে ফেলে, তখনই ধরে আনে ওকে দরবারকক্ষের মধ্যে।
অনুচরটি কেশবকে দেখেনি বা চিনতো না, কেশবকে ধরে ভিতরে নিয়ে আসে–সর্দার, এই লোকটা দরবারকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিলো।
বনহুর তাকালো সম্মুখে, কেশবকে দেখে ব্যাপারটা উপলব্ধি করে নিলো, বুঝতে পারলো– কেশব তাদের কার্যকলাপে অবাক হয়েছে। যদিও নূরীর কাছে কেশব বনহুর সম্বন্ধে পূর্ব হতেই অবগত হয়েছিলো তবুও চাক্ষুস এসব দর্শনে আশ্চর্য না হয়ে সে পারে না।
বনহুরের দিকে তাকায় কেশব, দু’চোখে তার অসহায় দৃষ্টি। না জানি এই মুহূর্তে বাবু তার উপর কেমন ব্যবহার করবে কে জানে। এ ড্রেসে সে বাবুকে কোনোদিন দেখেনি। অদ্ভুত লাগছে। বাবুকে,তাই বিস্ময়-ভরা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে কেশব তার বাবুর দিকে।
