সর্বনাশ, তাহলে তোমার স্বামীকে আবার হারাতে হবে।
কি বলছো তুমি?
হাঁ, বোম্বে থেকে পালিয়ে এসেছি দিল্লী, আর ঐ খান বাহাদুর শামস ইরানীও অন্য কেহ নয়– আমি।
তুমি?
হাঁ।
তুমি আলেয়ার আলো ছবি—
এখন মনোযোগ সহকারে শোন পরে সব বলবো, বুঝলে? এখন চুপ করে শোন–বনহুর আর মনিরার কথাবার্তা অত্যন্ত নিম্নস্বরে হচ্ছিলো, কাজেই কক্ষমধ্যে কেউ শুনতে পায়নি।
কান পাতলো বনহুর, শোনা যাচ্ছে আলী সাহেব বলছেন–খান বাহাদুর শামস ইরানীকে দেখে আমি এতোটুকু অবিশ্বাস করতে পারিনি। অতি মহৎ ব্যক্তি বলেই মনে করেছিলাম, কারণ তার ব্যবহার অত্যন্ত প্রীতিজনক ছিলো। ছবি ব্যাপারে তার বিপুল আগ্রহ দেখে আমি অগ্রসর হই, তিনিও টাকা পয়সার ব্যাপারে কোনোরকম কার্পণ্য করেননি। এমনকি ছবি তৈরি করবার পূর্বেই তিনি আমাকে আমার পারিশ্রমিকের সম্পূর্ণ টাকা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আমি জানতাম না তার মনে এ রকম একটা উদ্দেশ্য ছিলো। এমন কি ফুলাগু হোটেলেও তাঁর সব জিনিসপত্র তেমনি সাজানো পড়ে আছে।
হাশেম চৌধুরীর গলা–এমনও তো হতে পারে, ধরুন খান বাহাদুর শামস ইরানী তার ছবির নায়িকা শশীকে নিয়ে বোম্বেরই কোনো হোটেলে গিয়ে ফুর্তি চালাচ্ছেন?
আমরাও প্রথমে ঐ রকম সন্দেহ করেছিলাম এবং বোম্বে পুলিশ অফিসে সেইভাবেই ডায়রী দিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ মহল বোম্বে শহর তচনচ্ করেও খান বাহাদুর শামস ইরানী বা শশীরাণীর কোনো হদিস পাননি। শেষে বোম্বে পুলিশ এরোড্রাম থেকে একখানা গাড়ি উদ্ধার করে এবং প্লেনের রিপোর্ট অনুযায়ী বোঝা যায়, সেই গাড়িখানাই ছিলো শামস ইরানীর।
পুলিশ আমাকে জানায়, শশীকে নিয়ে শামস ইরানী দিল্লীর পথে গা ভাসিয়েছে। যখন আমি এ সংবাদ পাই তখন দুটো দিন কেটে গেছে। যদিও প্রচুর বিলম্ব ঘটে গেছে,তবু আমি নিরাশ না হয়ে দিল্লী এসেছি। স্যার, কেসটা পুলিশে দেওয়ার পূর্বে আপনার সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাই।
হাঁ, ঠিক বলেছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, সেই খান বাহাদুর শামস ইরানী শশীকে নিয়ে এতোদিন নিশ্চিন্ত মনে দিল্লী বসে নাই। সে দিল্লী ত্যাগ করে ভেগেছে। তবু আমরা আপনার। কেসটা গ্রহণ করবো এবং খানা তল্লাসী চালাবো।
স্যার, আমি আপনাদের সাহায্য কামনা করি।
বনহুর এরপর আর দাঁড়ালো না, মনিরাসহ ওদিকের দরজা দিয়ে চলে গেলো ভিতরে।
মনিরাকে সব বললো বনহুর–ঐ আসলাম আলীই হলেন আমার ছবির পরিচালক আর খান বাহাদুর শামস ইরানী অন্য কেউ নয়, আমি এবং শশী হলো সাপুড়ে কন্যা ফুল।
*
হাশেম চৌধুরী আসলাম আলীর কেসটা গ্রহণ করলেন এবং হুশিয়ারীর সঙ্গে দিল্লী শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুসন্ধান চালালেন। খান বাহাদুর শামস ইরানীর ফটো দিল্লীর সংবাদ পত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় বড় অক্ষরে ছাপা হলো। শহরময় ছড়িয়ে পড়লো সি, আই, ডি, পুলিশ।
সেদিন বনহুরের বিদায় অভিনন্দনের পালা।
পুলিশ সুপার হাশেম চৌধুরী পত্রিকাখানা হাতে বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
বনহুর, মনিরা, নূরী, কেশব আর ফুলমিয়া দিল্লী শহর ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিয়েছে, হাশেম চৌধুরী পত্রিকাখানা মেলে ধরলেন বনহুরের সামনে–এই ছবিটা দেখুন, হঠাৎ যদি আপনাদের দৃষ্টিপথে পড়ে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করে ফেলবেন। আসলাম আলী দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
বনহুর পত্রিকাখানা হাতে নিয়ে দেখলো, এটা খান বাহাদুর শামস ইরানী-বেশে তারই ফটো, মনে মনে হাসলো বনহুর, বললো–নিশ্চয়ই আপনার কথা স্মরণ থাকবে মিঃ হাশেম।
ওদিকে প্লেন ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে। যাত্রীগণ সবাই প্লেনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বনহুর মনিরা, নূরী আর কেশব, ফুলমিয়াকে নিয়ে প্লেনের দিকে এগুলো। বিদায়কালে মনিরা তো মাসুমার গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেললো।
নূরীর কিন্তু জড়োসড়ো সঙ্কোচিত ভাব, মনিরার আদেশের প্রতীক্ষায় সদা যেন তটস্থ রয়েছে। সে। কিসে মনিরা খুশি হবে, এই যেন তার মনের ইচ্ছা। অবশ্য বনহুর তাকে এইভাবে আত্মপরিচয় গোপন রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলো, কারণ মনিরা যেন জানতে না পারে তার সঙ্গে ওর কোনো সম্বন্ধ আছে। মানে বনহুর আর নূরী যেন সম্পূর্ণ আলাদা জন।
হাশেম চৌধুরী আর মাসুমার কাছে বিদায় নিয়ে কান্দাই এর পথে রওয়ানা দিলো বনহুর তার দুই সঙ্গিনী আর বন্ধুদ্বয় নিয়ে। বিদায়কালে মনিরা মাসুমার গলা জড়িয়ে ধরে অশ্রু বিসর্জন করলো।
সম্পূর্ণ দিনটা কাটলো তাদের প্লেনে, সন্ধ্যায় কান্দাই এরোড্রামে পৌঁছে গেলো তারা। মনিরার আনন্দ যেন ধরছে না, খুশিতে আপুত সে। কতদিন পর ফিরে এলো স্বদেশে। সবচেয়ে মনিরার বড় আনন্দ–স্বামীকে সে সঙ্গে পেয়েছে। এ যেন তার জীবনে এক পরম সৌভাগ্যের কথা।
হঠাৎ স্বামীকে সঙ্গে করে মামীমা আর নূরকে অবাক করে দেবে মনিরা। বহুদিন পর পুত্রকে পেয়ে মামীমার আনন্দ আর ধরবে না। নূরও খুশি হবে তার বাপকে পেয়ে।
কিন্তু সব আশা মনিরার বিফল হলো ট্যাক্সিতে মনিরা আর নূরীকে তুলে দিয়ে বললো বনহুর–তোমরা বাড়িতে যাও মনিরা।
অবাক কণ্ঠে বলে উঠে মনিরা–আর তুমি?
আমি আমার আস্তানায় যাবো।
তা হবে না, তোমাকে আমি ছেড়ে দেবো না। মনিরা স্বামীর টাইটা এটে ধরে ফেলে।
