মনিরা বলে উঠলো–ওকে কি করবে তুমি?
আমার নয়, তোমার অনেক কাজে আসবে–সঙ্গে নিয়ে চলো ওকে। তাছাড়া ও যাবেই বা কোথায়, ওর তো কেউ নেই আর।
বনহুরের কথায় মনিরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারলো না, তীক্ষ্ণ নজরে দেখতে লাগলো, মুখেচোখে ফুটে উঠেছে গাম্ভীর্যের ছাপ। কোনো কথা বললো না সে।
মাসুমা হেসে বললো–মনিরা, তোর ভালই হলো, একদিন না বলেছিলি মেয়েটিকে আমার খুব পছন্দ, ইচ্ছে হয় ধরে রাখি আর যখন খুশি নাচ দেখি। কেমন, এখন তোর ইচ্ছে পূর্ণ হলো তো? যখন খুশি নাচও দেখতে পাবি।
হাশেম সাহেব বললেন–মন্দ কি, এমন একটি মেয়ে সব সময় পাশে থাকলে অনেক কাজ হবে। যা দিন-সময় পড়েছে, কাজের লোক পাওয়াই মুস্কিল।
হাঁ, ঠিক বলেছো।! মনিরা, তোর বাচ্চা নাকি ভারি দুষ্ট! ওকে সামলাতে এমনি একটি মেয়ের দরকার। ভালই হলো, নিয়ে যা সঙ্গে করে, মেয়েটাকে দেখে বড় মায়া লাগছে কিন্তু।
বনহুর তখন সকলের অজ্ঞাতে একবার নূরীর মুখে তাকিয়ে দেখে নিলো। না, নূরীর মুখে কোনোরকম বিষণ্ণ ভাব ফুটে ওঠেনি। অবশ্য বনহুর পূর্বেই নূরীকে এমনি একটা অবস্থার জন্য প্রস্তুত করেই নিয়ে এসেছিলো। বলেছিলো বনহুর নূরী, মনিরা আজও তোমার আসল পরিচয়। জানে না। কাজেই তোমাকে অনেক ঝুঁকি সামলাতে হবে। যদি মনিকে চাও তবে মেনে নিতে হবে এই সমস্যাময় জীবন। পারবে তুমি নিজের আত্মপরিচয় গোপন করে থাকতে?
বলেছিলো নূরী–তোমার জন্য আমি সব পারবো। আর পারবো আমার মনির জন্য।
নূরীর মনে এখন মনি’র চিন্তা, কাজেই মনিরা ও অন্যান্য সকলের কথা কানে না নিয়ে এক কথায় রাজি হলো–সে সব কাজ করতে পারবে।
কান্দাই ফিরে যাওয়ার দিন ধার্য হয়ে গেল।
মনিরা এক সময় স্বামীকে নিভৃতে পেয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো–তুমি এতোবড় নির্মম প্রাণহীন। কি করে ভুলে ছিলে এতোদিন?
শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় বসেছিলো বনহুর, মনিরার হাতখানা তার হাতের মুঠায়, একটু হেসে বললো–এটাতো নতুন কিছু নয় মনিরা। তুমি জানো, আমি সাধারণ মানুষের নিয়মের বাইরে। কিন্তু এটুকু মনে রেখো, কোনো সময় ভুলিনি তোমায়।
আমি জানি, তুমি এ কথাই বলবে। সব সময় যদি আমার কথা তোমার স্মরণ হবে তাহলে এতোদিন কিছুতেই দূরে থাকতে পারতে না।
তুমি বুঝবে না মনিরা, আমাকে কিভাবে প্রতি মুহূর্ত সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। জীবন নিয়ে ফিরে এসেছি–এ আমার সৌভাগ্য। নাহলে আর কোনোদিন হয়তো তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটার সম্ভাবনা ছিলো না।
মনিরা স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে বলে– না না, ও সব কথা বলো না। আমার বুক কেঁপে উঠে। ওগো, তুমি যে আমার জীবনের একমাত্র সম্পদ।
মনিরা! অবেগভরা কণ্ঠস্বর বনহুরের।
মনিরা অশ্রু ছলছল আঁখি দুটি তুলে ধরে বনহুরের মুখে।
বনহুর ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে, মনিরাকে নিবিড়ভাবে বুকে টেনে নিয়ে অশ্রুসিক্ত গণ্ডে এঁকে দেয় চুম্বনরেখা। তার চোখেও পানি। মনিরার অশ্রুর সঙ্গে বনহুরের চোখের পানি এক হয়ে যায়। এতোদিন পর স্বামী-স্ত্রীর মধুর মিলন অপূর্ব এক মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি করে।
স্বামীর বুকে মাথা রেখে মনিরা শুনে যায় বনহুরের সব কথা। সেই অজানা জঙ্গলে জংলীরাণীর কথা, সেই রত্ন-গুহার কথা। তারপর জংলীরাণীর পুনঃ আক্রমণ। কিভাবে মৃত্যু ঘটেছিলো, কথাটা বলতে গলা ধরে আসে বনহুরের। তারপর কাঠের ভেলায় দিনের পর দিন রাতের পর রাত। কাটানো। পরে জাহাজ ‘পর্যটন’ তাদের কিভাবে উদ্ধার করলো। জাহাজ ‘পর্যটনে’ এসে নতুন জীবন লাভ করলো বনহুর আর তার সঙ্গী কেশব। নীহারের কথাও বলতে ভুললো না সে। মেয়েটি। সরল-সহজ উদারমনা, সে যে কখন তাকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছিলো বুঝতে না পারলেও অল্প দিন পরেই অনুমান করে নিয়েছিলো। ওকে খুশি করবার জন্য যতটুকু পারে ভালবাসা দিতেও সে কসুর করেনি–একথাও খোলাসা বললো বনহুর মনিরার কাছে।
মনিরার মুখ থমথমে হলো সে কথায়।
বনহুর মনিরার চিবুকে মৃদু চাপা দিয়ে বললো–সব তো উজাড় করে দেইনি! তোমার জন্য প্রচুর আছে।
এমনি নানা মান-অভিমানের মধ্যে দিয়ে কেটে গেলো কয়েকটি দিন।
আগামী কাল তাদের কান্দাই রওয়ানা দেবার তারিখ।
বনহুর সেদিন মনিরাসহ বাইরে থেকে ফিরছিলো, গাড়িখানা রেখে যেমন তারা হলঘরে প্রবেশ করতে যাবে, অমনি শুনতে পেলো বনহুর একটা পরিচিত গলার স্বর। থমকে দাঁড়িয়ে মনিরার হাতখানা মুঠায় চেপে ধরলো, ঠোঁটের উপর আংগুল চাপা দিয়ে তাকে চুপ থাকতে বললো।
হলঘরের মধ্য হতে শোনা গেলো পরিচালক আসলাম আলীর উৎকন্ঠা–ভরা গম্ভীর কণ্ঠস্বর হাঁ স্যার, তার নাম খান বাহাদুর শামস ইরানী।
ফটো আছে?
হাঁ আছে, মহরতের সময় উঠানো হয়েছিলো।
দেখি!
এই দেখুন স্যার।
কিছুক্ষণ কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না, মনে হলো কক্ষ মধ্যে ফটো দেখা নিয়ে ব্যস্ত আছেন হাশেম চৌধুরী। একটু পর পর শোনা গেলো হাশেম চৌধুরীর গলা–বয়স্ক লোক।
হাঁ স্যার, বয়স পঞ্চাশের উপর হবে।
ভদ্রলোকের ছবির নাম কি বললেন?
আলেয়ার আলো।
হাসির শব্দ হলো হাশেম সাহেবের কন্ঠে-আলেয়ার আলোই বটে।
মনিরা ফিস ফিস করে বললো–কোনো কেস ব্যাপারে লোক এসেছে, চলো আমরা ওদিকের পথ দিয়ে ভিতরে যাই।
তুমি যাও, কেসটা বড় রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে—
তা ভিতরে গিয়ে বসে বসেই শোন গে।
