প্লেন এরোড্রামের প্লাটফরমে চক্রাকারে ঘুরপাক খেয়ে ধীরে ধীরে আকাশ-পথে উঠে পড়লো।
বোম্বে শহরের বুকে পড়ে রইলো খান বাহাদুর শামস ইরানীর মূল্যবান জিনিসপত্র আর নতুন চকচকে গাড়িখানা। নীরব প্রহরীর মতই এরোড্রামের অদূরে গাড়িখানা দাঁড়িয়ে রইলো যেন উদাস জননী-পুত্রকে বিদায় দিয়ে ভুলে গেছে ফিরে যাওয়ার কথা।
*
দিল্লী পৌঁছে বনহুর নূরী, কেশব ও ফুলমিয়াসহ একটি হোটেলে উঠে। বনহুর এখানে পৌঁছেই খান বাহাদুর শামস ইরানীর ড্রেস পরিত্যাগ করলো। যদিও বিশ্রামের অবসর তার ছিলো না তবু কতদিন পর নূরীকে সে নিবিড় করে পেয়েছে, একটি দিনের বিশ্রাম আসায় তার মন উন্মুখ হয়ে উঠলো।
হোটেলের জনহীন কামরায় নূরীকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেললো। ওর কোমল দেহটাকে বলিষ্ঠ বাহুতে নিষ্পেষিত করে ফেলতে চাইলো বনহুর।
নূরী নিজেকে মুক্ত করে নেবার বৃথা চেষ্টা করে বললো–হুঁর, ছেড়ে দাও কেউ এসে পড়বে।
বনহুর নূরীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে বললো-দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। কেউ আসতে পারবেনা!
বড় দুষ্ট তুমি!
তার চেয়েও বেশি।
না, তুমি আমায় ছেড়ে দাও হুর।
আমার হাত থেকে তুমি মুক্তি পাবে না আজ।
হুর, তুমি আমায় ক্ষমা করো। যা হবার হয়েছিলো, কিন্তু আর নয়। তোমার-আমার মধ্যে এখনও মস্তবড় প্রাচীর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হুর তোমার-আমার এখনও বিয়ে হয়নি একথা ভুলে যেওনা।
বনহুর ক্ষণিকের জন্য স্থির নয়নে তাকায় নূরীর দিকে।
নূরী বলে–আমার কথা ভেবে দেখো হুর?
বনহুরের বাহুবন্ধন সামান্য শিথিল হয় বটে কিন্তু একেবারে ওকে মুক্ত করে দেয় না সে, বলে–নূরী লৌকিকতাপূর্ণ বিবাহ উৎসব আমাদের হয়নি, কিন্তু মনপ্রাণ দিয়ে তুমি কি আমাকে একদিন স্বামী বলে গ্রহণ করোনি?
করেছিলাম কিন্তু—
বনহুর নূরীর মুখে দক্ষিণ হস্তখানা চাপা দেয়–আর কিন্তু নয় নূরী। তুমি আমাকে বিমুখ করো না লক্ষ্মীটি।
নূরী পারলো না নিজকে কঠিন করতে, বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে বললো–আমি যে তোমারই হুর।
হা নূরী, তুমি আমার। শুধু আমারই–
কতক্ষণ যে নূরী বনহুরের বাহুতে আবদ্ধ ছিলো খেয়াল নেই নূরীর। হুঁশ হলো এবার, বললো–কেশব দা আর ফুলমিয়া কি ভাববে বলো তো?
দস্যু বনহুর কোনেদিন কারো ভাবাভাবি নিয়ে চিন্তা করে না–একথা তুমি আজ শুনছো? শোন নূরী, এবার তোমাকে কাজের কথা বলি।
বলো?
এবার তোমাকে সেই ড্রেস গ্রহণ করতে হবে, যে ড্রেসে তুমি একদিন সাপুড়ে সর্দারের কন্যা সেজে ছিলে।
তুমি যা চাও আমি তাই করবো হুর।
করবে? করবে নূরী। ব্যাকুল কণ্ঠ বনহুরের।
নূরী অস্ফুট কণ্ঠে বললো–হাঁ করবো।
নূরী, মনিরা আর তোমাকে নিয়ে কান্দাই ফিরে যেতে চাই।
বেশতো, এ আনন্দের কথা!
কিন্তু মনিরা আর তোমার মধ্যে আজও আসল পরিচয় ঘটেনি–
নূরী কোনো জবাব দেয় না।
বলে চলে বনহুর নূরী, যদিও কান্দাই-এ আমার আস্তানায় একবার মনিরার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ ঘটেছিলো সে ক্ষণিকের জন্য–মনিরা তোমাকে মোটেই চিনতে পারবে না। কাজেই তুমি তার কাছে নিজকে সাপুড়ে সর্দারের কন্যা বলে পরিচয় দেবে–
বেশ, তাই হবে।
এতে তুমি দুঃখ পাবে না তো?
দুঃখ আমার নেই। হুর, তুমি যাতে সুখী হও এটাই আমার কামনা।
নূরী, জানো তোমার মনি এখন মনিরার কাছেই আছে। কান্দাই ফিরে গেলেই তাকে কাছে পাবে।
সত্যি তাকে পাবো? আমার মনিকে পাবো?
হা পাবে।
নূরী কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললো–হুঁর, মনিরার কাছে আমাকে সাপুড়ের মেয়ে বলেই পরিচয় দাও। আমি যেন মনিকেই পাই।
আচ্ছা, তোমার আশাই পূর্ণ হবে নূরী। একটু থেমে বললো বনহুর–মনিরা এখন দিল্লী লালবাগের পুলিশ সুপার মিঃ হাশেম চৌধুরীর বাড়িতে তার বান্ধবীর নিকট অবস্থান করছে।
হাঁ, আমার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটেছিলো।
সে কথা আমি জানি; এটাও জানি, তোমার নাচ দেখে মনিরা আত্মহারা হয়ে নিজ গলার মালা তোমায় উপহার দিয়েছিলো।
এবং সেই মালা উপলক্ষ করেই তুমি খুঁজে পেয়েছিলে বোন মনিরাকে।
সব মনে আছে নূরী।
হুর, আমার আর এক মুহূর্ত এইসব দেশে কাটাতে ইচ্ছা হচ্ছে না। ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমার মনির কাছে–
আমার মনও চঞ্চল হয়ে উঠেছে নূরী, কতদিন আস্তানা ত্যাগ করে এসেছি। না জানি আস্তানার সবাই কেমন আছে। আমার অনুচরগণ কে কেমন আছে তাও জানি না। জানিনা আমার তাজের। অবস্থা এখন কি হয়েছে। আমার জন্য কেঁদে কেঁদে তাজ হয়তো শুকিয়ে গেছে, কতদিন তাজকে দেখি না, বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে বনহুরের গলা।
নূরী বনহুরের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। তার চোখ দুটোও তখন অশ্রু ছলছল করছিলো।
*
অনেক দিন পর স্বামীকে ফিরে পেয়ে মনিরার আনন্দ আর ধরে না। হাশেম চৌধুরী এবং মনিরার বান্ধবী মাসুমাও খুশিতে আত্মহারা হলো। কতদিনের আরাধনার পর ফিরে এসেছে তাদের। প্রতীক্ষিত জন।
কিন্তু মনিরার প্রথম আনন্দোচ্ছস কাটতেই স্বামীর সঙ্গে পূর্বের সেই সাপুড়ে কন্যাটিকে দেখে গম্ভীর হয়ে পড়লো। তাকিয়ে দেখলো নূরীর দেহে সাপুড়ে কন্যার ড্রেস–ঘাগড়া, ব্লাউজ, ওড়না। মাথায় চুলগুলো বিনুনী করে কাঁধের দু’পাশে ঝোলানো। চোখে কাজল, ললাটে সোনা পোকার পাখার টিপ। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে ওকে। কিছুক্ষণ নূরীর দিকে তাকিয়ে বললো মনিরা–ওকে সঙ্গে এনেছো কেন?
বনহুর স্বাভাবিক গলায় বললো–মনিরা, সে অনেক কথা, সব তোমাকে পরে বলবো। তবে কিছুটা শুনে রাখো, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা রওয়ানা দিয়েছিলাম তা সফল হয়েছে এবং এই সফলতা অর্জন করতে গিয়ে আমাদের অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো–শেষ পর্যন্ত আমাদের পথ প্রদর্শক সাপুড়ে বাবাজীকে হারাতে হয়েছে। জংলীরা তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। মনিরা, তাই নিহত সাপুড়ে সর্দারের অসহায়া কন্যা ফুলকে আমি সঙ্গে আনতে বাধ্য হয়েছি।
