উৎসব শেষ হবার অল্পক্ষণ বাকি আছে, এমন সময় হঠাৎ শশী অজ্ঞান হয়ে পড়লো। একি অঘটন, সমস্ত লোকজন উৎকণ্ঠা হয়ে পড়লেন। . উৎসবের কাজ এখনও বাকি আছে। মহরতের মিষ্টি বিতরণ এখনও হয়নি। পরিচালক এমন একটা দুর্ঘটনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। শশীকে নিয়ে সবাই যখন ব্যস্ত তখন খান বাহাদুর শামস ইরানী ডাক্তার আনতে ছুটলো। তার নিজের ছবির নায়িকা, কাজেই তার ব্যস্ত হবার কথাই।
একটু পরেই ডাক্তার নিয়ে ফিরে এলো শামস ইরানী।
ডাক্তার শশীকে পরীক্ষা করে বলেন, অত্যন্ত চিন্তায় হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছে, এখন সম্পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন।
কিন্তু এখনও যে ফাংশন শেষ হয়নি।
খান বাহাদুর শামস ইরানী স্বয়ং শশীকে তাদের বাসায় পৌঁছে দেবে রাজি হলো। সঙ্গে যাবে শ্যামা।
শশীর সংজ্ঞাহীন দেহটা কয়েকজন মিলে গাড়িতে উঠিয়ে দিলো। শ্যামা শশীর পাশে বসলো।
শামস ইরানী স্বয়ং বসলো ড্রাইভিং আসনে।
গাড়ি বোম্বে স্টুডিও ত্যাগ করলো।
রাত এখন দশটা দশ মিনিট বেজেছে। হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে স্পীডে গাড়ি ছাড়লো শাসম ইরানী।
এ পথ-সে পথ করে গাড়ি চলেছে।
শশীর মাথাটা শ্যামার কোলো ছিলো, এবার নড়ে উঠলো সে। বললো শশী–পানি, একটু পানি দাও।
শ্যামা বলে উঠে–শশী একটু অপেক্ষা করো, এই তো এসে গেলাম বলে।
শ্যামা যখন ঝুঁকে কথাটা জিজ্ঞাসা করছিলো, ঐসময় গাড়িটাও এক ঝাঁকি দিয়ে থেমে পড়ে।
চমকে উঠে শ্যামা–কি হলো খান বাহাদুর সাহেব?
ঐ মুহূর্তে শামস ইরানী পকেট থেকে একখানা রুমাল বের করে অকস্মাৎ চেপে ধরলো শ্যামার নাকের উপর।
কিছু স্মরণ করার পূর্বেই শ্যামা ঢলে পড়ে গাড়ির পিছন আসনে।
শামস ইরানী বেশি বনহুর এবার হেসে উঠে হাঃ হাঃ করে। তারপর হাসি থামিয়ে বলে– নূরী, তুমি ঠিক আমার কথামতই কাজ করেছ।
সত্যি আমি বড় ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ভাগ্যিস, ডাক্তার আমার অজ্ঞান সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেননি।
বললো বনহুর–ডাক্তার অন্য কেউ নয়, কেশব।
কেশব দা?
হাঁ, তাকেই আমি পূর্ব হতে ডাক্তার সাজিয়ে তৈরি রেখেছিলাম।
কোথায় তবে কেশব দা?
সে এখন বোম্বে এরোড্রামে চলে গেছে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে কেশব আর ফুলমিয়া।
ফুলমিয়া! ফুলমিয়া কে?
সেও কেশবের মত একজন। বনহুর আর মুহূর্ত বিলম্ব না করে গাড়ি নিয়ে শ্যামার বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা দিলো।
শ্যামার বাড়ির দরজায় গাড়ি পৌঁছতেই শ্যামার চাকর ছুটে এলো।
শামস ইরানীকে দেখে সালাম জানালো সে।
শামস ইরানী ব্যস্তকণ্ঠে বললো–শীঘ্র আমাকে সাহায্য করা, মিস শ্যামারাণী হঠাৎ ষ্টুডিওতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো।
চাকরতো অবাক হয়ে গেলো।
শামস ইরানী-বেশি বনহুর সংজ্ঞাহীন দেহটা হাতের উপর তুলে নিলো, তারপর তাকে অন্দর বাড়িতে নিয়ে সচ্ছন্দে শয্যায় শুইয়ে দিলো। চাকরকে লক্ষ্য করে বললো–ওর দিকে খেয়াল রেখো।
স্যার আপনি?
আমি শশীকে স্টুডিওতে পৌঁছে দিয়ে ডাক্তার নিয়ে ফিরে আসবো এক্ষুণি…আসুন মিস শশী রাণী।
বনহুর নূরীর হাত ধরে দ্রুত বেরিয়ে যায়।
গাড়ির দরজা খুলে ধরে বলে বনহুর নূরী উঠে পড়ো।
নূরী ড্রাইভ আসনের পাশের সিটে উঠে বসে বলে–কোথায় যাবে হুর?
এরোড্রামে। ড্রাইভ আসনে উঠে বসতে বসতে বললো বনহুর।
হুর, ভাবতে পারিনি তোমায় ফিরে পাবো। মনে হচ্ছে, আমি স্বপ্ন দেখছি!
বনহুর ক্ষণিকের জন্য ভুলে যায় সব কথা–এমন কি প্লেনের সময় আর বেশি নেই, একথাও বিস্মৃত হয় সে। নূরীকে গভীরভাবে কাছে টেনে নেয়, চুম্বনের পর চুম্বন দিয়ে আবেগভরা গলায় ডাকে–নূরী! সত্যি কি তোমায় পেয়েছি নূরী?
হুর, খেয়াল করো, খেয়াল করো হুর। হঠাৎ কেউ এসে পড়লে পালানো হয়তো সম্ভব হবে না। বনহুরের বলিষ্ঠ বাহুবন্ধন থেকে নিজকে মুক্ত করে নিতে চেষ্টা করলো নূরী।
কতদিন পর আজ নূরীকে ফিরে পেয়েছে একান্ত নির্জনে, বনহুর কিছুতেই নিজকে সংযত রাখতে সক্ষম হচ্ছিলো না। নূরীর কথা যে মিথ্যা নয় বেশ অনুমান করছিলো সে, কারণ এই মুহূর্তে যদি কেউ এসে পড়ে তাহলে হয়তো পালানো আর হয়ে উঠবে না।
বনহুরের সন্বিৎ ফিরে এলো নূরীর কথায়, এবার সে নূরীকে মুক্ত করে দিয়ে সোজা হয়ে বসলো, গাড়িতে স্টার্ট দিলো বনহুর।
নূরীর বুকটা আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠেছে। বনহুরের স্পর্শে তার মৃতদেহে যেন জীবন ফিরে এলো। নূরী মাথাটা রাখলো বনহুরের কাঁধে।
গাড়ি তখন উল্কা বেগে ছুটে চলেছে।
নূরী যেন স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করে ফিরছে, মনে তার অফুরন্ত আনন্দ। বনহুরকে পাওয়া তার যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার সমতুল্য।
এরোড্রামে পৌঁছতেই কেশব আর ফুলমিয়া এসে দাঁড়ালো, প্লেন ছাড়বার আর কয়েক মিনিট বাকি, বনহুর নূরসহ কেশব আর ফুলমিয়াকে নিয়ে প্লেনে উঠে বসলো।
ফুলমিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো নূরীর।
নূরীকে ফুলমিয়া প্রথম দেখলো, অবাক হলো সে নূরীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখে। এমন মেয়ে সে জীবনে কমই দেখেছে, নিষ্পলক নয়নে দেখতে লাগলো সে তাকে।
কেশবের আনন্দ আর ধরে না, কি করে তার বোন ফুলকে অন্তরের প্রীতি জানাবে ভেবে পায় না। কেশব বললো–ফুল, ভাল আছ তো?
আছি। তুমি কেমন ছিলে কেশব দা?
দেখতেই পাচ্ছো বোন।
এমনিভাবে কথাবার্তা হয় ওদের মধ্যে।
এখনও বনহুরের দেহে শামস ইরানীর ড্রেস–মাথায় আধা পাকা চুল, দাড়িতেও পাক ধরেছে, চোখে চশমা,মাথায় টুপি। নূরীর পাশের আসনে বসলো বনহুর।
