এদিকে হাশেম চৌধুরী দিল্লী থেকে বদলীর সময় হয়ে এসেছে। মনিরাকে নিয়ে মাসুমা চিন্তায় পড়লো, কারণ, মনিরা এমনভাবে বেঁকে বসলো তাকে কান্দাই রেখে না এলেই নয়। মাসুমা বান্ধবীকে অনেক করে বুঝাতে লাগলো, নিশ্চয়ই তোর স্বামী ফিরে আসবে, ওর জন্য কিছু ভাবিসনে বোন।
মাসুমার সান্ত্বনায় মনিরার অশ্রু কিছুতেই বাধ মানছিলো না–হ্যায়, কতদিন আর তার প্রতীক্ষায় বুক বেঁধে এই সুদূর দিল্লী নগরীতে পড়ে থাকবে। কোথায় গেছে সে, কেমন আছে, তাই বা কে জানে। মনিরা স্বামীর জন্য নতুন করে ভাবতে পারে না আর, কারণ আজ প্রথম নয় তাকে ছেড়ে কতদিন সে উধাও হয়েছে এমনিভাবে। কত যে চোখের পানি ফেলেছে মনিরা স্বামীর জন্য, কত যে ব্যথা অন্তরে চেপে তুষের আগুনে দগ্ধীভূত হয়েছে তার অন্ত নেই। তবু কিছুতেই স্বামীকে সে ধরে রাখতে পারেনি কোনোদিন।
অশ্রু মনিরার সাথী।
স্বামীকে ভালবেসে মনিরা পেয়েছে শুধু ব্যথা আর দুঃখ তবুও মনিরা স্বামী-চিন্তা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না। স্বামীই যে তার জীবনের আশা-ভরসা, স্বপ্ন-সাধ–সবকিছু।
মনিরা এবার দেশে ফিরে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, হাশেম চৌধুরী বা মাসুমার কোনো কথাই তাকে আর স্থির রাখতে পারলো না।
কান্দাই শহরে মনিরাকে রেখে আসার জন্য হাশেম চৌধুরী মনস্থির করে ফেললেন। ছুটির জন্য ব্যবস্থা করলেন তিনি।
স্বামীর চিন্তায় মনিরা যখন অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছে, তখন বনহুর নূরীকে উদ্ধার ব্যাপার নিয়ে নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে চলেছে। কৌশলে হাত করেছে পরিচালক আলী সাহবেকে, শ্যামাকেও হাতের মুঠায় এনে নিতে তার বিলম্ব হয়নি। নূরীর সঙ্গেও সাক্ষালাভ ঘটেছে, এখন তাকে বোম্বে থেকে সরাতে পারলেই নিশ্চিন্ত হবে বনহুর।
আজকাল প্রায়ই আসে বনহুর শ্যামার ওখানে, পরিচালক আলী সাহেবের উপর ভর দিয়েছে ছবির কাহিনী বেছে নেওয়ার জন্য। আসলাম আলী তাই আজকাল কাহিনী খুঁজে বেড়াচ্ছেন, মনের মত কাহিনী না পেলে ছবি করতে রাজি নন তিনি।
কাহিনী ব্যাপার নিয়ে আসলাম আলী যখন ব্যস্ত তখন বনহুর মাসুম ইরানী-বেশে ঘনিষ্ঠভাবে শ্যামা আর নূরীর সঙ্গে ভাব জমিয়ে বসেছে। আজকাল তাদের দুজনাকেই সঙ্গে করে এখানে সেখানে যাওয়া-আসা শুরু করেছে সে। তবে শ্যামার দিকেই প্রকাশ্য ভাবটা যেন বেশি দেখায় সেদিকে ছিলো বনহুরের বিশেষ লক্ষ্য। অবশ্য নূরী এর কারণ বুঝতো, সে এতে কোনো রকম অসন্তুষ্ট হতো না।
একদিন সুযোগ এলো, কেশব জানালো দিল্লীগামী প্লেনের টিকেট সে ক্রয় করে ফেলেছে। বনহুর, নূরী কেশব আর ফুলমিয়ার। চারখানা টিকেট বুক করে কেশবের আনন্দ আর ধরে না, এবার ফুলকে নিয়ে সরে পড়বে তারা।
সেদিন বললো বনহুর–কেশব, আজ রাতের প্লেনে আমরা রওয়ানা হবো, মনে আছে?
আছে মানে, খুব মনে আছে।
ফুলমিয়া ওপাশে দাঁড়িয়েছিলো, সরে এলো বনহুরের সামনে–স্যার, সব গোছানো হয়ে গেছে।
সব মানে?
মানে আমার জিনিস সব বেঁধে ঠিক করে নিয়েছি।
ওসব তো নেওয়া চলবে না ফুলমিয়া। জিনিসপত্রের মায়া ত্যাগ করে যেতে হবে আমাদের।
অবাক কণ্ঠে বললো ফুলমিয়া–এতো টাকার মূল্যবান জিনিসপত্র ছেড়ে যাবেন স্যার?
না গিয়ে তো কোনো উপায় নেই। হা শোন, গাড়িখানাও ছেড়ে যেতে হবে, কারণ আমরা যে বোম্বে শহর ত্যাগ করে চলে যাচ্ছি বা চলে যাবার মতলব আঁটছি, এটা যেন কেউ বুঝতে না পারে। এমনকি ফুলাগু হোটেলের মালিকও যেন টের না পায়।
কেশব বলে উঠলো-”বাবু, অতো টাকার গাড়িখানা…
হাসলো বনহুর–শুধু গাড়ির মায়াই ত্যাগ করতে হবে না কেশব, সব কিছু ত্যাগ করে আমরা নূরীকে উদ্ধার করবো।
বাবু সেই ভাল।
শোন কেশব, রাত এগারোটায় তোমরা দু’জন ভাল পোশাক-পরিচ্ছদ পরে এরোড্রামে অপেক্ষা করবে। আমি নূরীকে ঠিক সময় অনুযায়ী নিয়ে হাজির হবো, বুঝলে? হোটেলের মালিককে বলে যাবে আমাদের এক জায়গায় দাওয়াত আছে, ফিরতে রাত হবে। চাবিটা ফুলাগুর মালিককে দিয়ে যাবে।
আচ্ছা!
ঠিকভাবে কাজ করবে, কোনোরকম কেউ যেন টের না পায় যে আমরা আজ বোম্বে ত্যাগ করছি।
আপনার কথামতই কাজ করবে বাবু।
*
আজ খান বাহাদুর শামস ইরানীর ছবির মহরৎ অনুষ্ঠান বোম্বে স্টুডিওতে অনুষ্ঠিত হবে। পরিচালক আসলাম ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটোছুটি করছেন। ছবির একখানা গান আজ রেকর্ড করা হবে সুগায়িকা দেবীকা রাণীর কণ্ঠে। ছবির নাম রাখা হয়েছে আলেয়ার আলো।’ এ নামটা ইরানী নিজেই পছন্দ করে দিয়েছে।
রাত্রি আট ঘটিকায় মহরৎ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ছবিতে যে সব আর্টিষ্ট অভিনয় করবেন প্রায় সবাই এসেছেন অনুষ্ঠানে। ছবির উদ্বোধন করবে স্বয়ং খান বাহাদুর শামস ইরানী।
ছবির নায়িকার চরিত্রে থাকবে শশী। শ্যামাও থাকবে এ ছবিতে; কাজেই এরা উভয়েই এসেছে। মহরৎ অনুষ্ঠান শেষ হলো, দেবীকা রাণীর কণ্ঠে গানও রেকর্ড করা হলো একখানা।
শ্যামা অনেক করে বলা সত্ত্বেও আসেনি মাসুম ইরানী। শ্যামা তাই বার বার অনুযোগ করছিলো শামস ইরানীর কাছে–কেন এলেন না মাসুম সাহেব? আপনার ছবি–তিনি না আসার কারণ কি? এলেই তিনি ভাল করতেন, সবার সঙ্গে পরিচিত হতেন এবং তাকে আপনার ছবির হিরো করার চেষ্টা নিতে পারতেন।
খান বাহাদুর শামস ইরানী-বেশি বনহুর মাসুম ইরানীর জন্য শ্যামাকে ব্যস্ত হতে দেখে মনে মনে হাসলো।
