নূরী বিস্মিত হচ্ছিলো, না জানি কে সে মাসুম ইরানী? শ্যামার সঙ্গে কি তার সম্বন্ধ? বনহুরের ভাই-ই বা এলো কোথা হতে? নূরী শ্যামার মতই উন্মুখ হয়ে প্রতীক্ষা করছিলো।
এমন সময় একখানা গাড়ি এসে থামলো শ্যামার বাড়ির দরজায়।
শ্যামা ড্রইংরুমে অপেক্ষা করছিলো, মাসুম ইরানী-বেশি বনহুর গাড়ি থেকে অবতরণ করতেই। শ্যামা হাস্যোজ্জ্বল মুখে তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালো।
আড়াল থেকে নূরী লক্ষ্য করছিলো, গাড়ি থেকে তার হুরকে নামতে দেখে যেমন আনন্দে হৃদয়। তার নেচে উঠলো তেমনি বিস্মিত হলো। তবে কি বনহুর মিথ্যা বলেছিলো শ্যামার কাছে? নূরী বুঝতে পারলো, এটা বনহুরের একটা চালাকি।
একটু পরে শ্যামা বনহুরসহ প্রবেশ করলো নূরীর কক্ষে। নূরী তখন আড়াল থেকে নিজের বিছানায় গিয়ে বসেছিলো। পদশব্দে মুখ তুলতেই শামার পিছনে বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো, বনহুর চোখ টিপে তাকে ইংগিত করলো।
শ্যামা হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো–শশী, ইনি খান বাহাদুর শামস ইরানীর ছোট ভাই মাসুম ইরানী।
নূরী যেন এই প্রথম দেখছে মাসুম ইরানীকে, এমনিভাবে শ্যামা ও পরে বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো, কোনো কথা বললো না। বনহুর নূরীর দিকে তাকিয়ে বললো–ইনিই বুঝি শশী?
হাঁ, বড় লাজুক মেয়ে।
বনহুর বললো–দেখতেই পাচ্ছি।
যেমন লাজুক তেমন মিষ্টি মেয়ে শশী, কিন্তু ঝালও কম নয়। একটু রাগলে নাগকন্যার মত হয়ে যায়।
সর্বনাশ, তাহলে তো ভয়ানক কথা। সাবধানে চলতে হবে, কি বলেন?
তাতো নিশ্চয়ই।
বসুন মিঃ মাসুম। শ্যামা আসন গ্রহণ করে বলে আবার–শশী বসো। তিনজন মিলে গল্প করা যাক।
বনহুর বসে পড়ে, বলে সে–হাঁ, আজকের সন্ধ্যাটা বেশ কাটবে বলে মনে হচ্ছে।
শ্যামা বয়কে চা-নাস্তার জন্য বলে দেয়।
বয় চলে যায়।
শ্যামা বনহুরের পাশের আসনটায় উঠে এসে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে।
নূরী নতচোখে একবার দেখে নেয়।
শ্যামা বনহুরকে লক্ষ্য করে বলে–মিঃ মাসুম, আপনি চুপচাপ বসে বসে কি করে দিন। কাটান?
কেন? বললো বনহুর।
মানে বড় ভাই-এর উপর নির্ভর করেই কি চিরদিন কাটবে আপনার?
আমি ঠিক আপনার কথা বুঝতে পারছি না? বললো বনহুর।
শ্যামা একটু কৌশলে ফাঁদ পাতার চেষ্টা করলো। বললো–খান বাহাদুর সাহেব বললেন, আপনি নাকি এখন সম্পূর্ণ বসে বসেই কাটাচ্ছেন?
হাঁ, আপাততঃ কোনো কিছু করছি না। তা ভাইজান বুঝি কিছু বলেছেন আপনার কাছে?
ঠিক স্পষ্ট করে বলেননি, তবে তার কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম, আপনি এখন সম্পূর্ণ বড় ভাই-এর উপর নির্ভর করছেন।
হা, চাকরী-বাকরী যখন করছি না তখন একরকম তাই। কিন্তু হঠাৎ এ কথাটা বলার পিছনে কি আপনি কিছু বলতে চান?
চাই বইকি!
বলুন?
অলক্ষ্যে একবার নূরীর দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো বনহুর।
বললো শ্যামা–আসলাম আলী সাহেব বলেছিলেন যে, মাসুম ইরানী যখন বসেই আছেন, আর তার ভাইজান যখন ছবি করবেন মনস্থ করেছেন তখন, মানে আপনি আপনার ভাই-এর ছবিতে হিরোর রোলটা না হয় করলেন। অবশ্য এতে যদি আপনার মত থাকে…
একটু হাসলো বনহুর, বড় সুন্দর দেখালো ওকে।
শ্যামা অভিভূতের মত বলেই চললো–আপনার মত হিরো পেলে আলী সাহেবের ছবি অদ্ভুত রকম হিট করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
থামলো শ্যামা।
বনহুর আর নূরীর মধ্যে আর একবার দৃষ্টি বিনিময় হলো।
বনহুর বললো–কিন্তু অভিনয় করতে পারবো কিনা, এতেও তো সন্দেহ আছে?
শ্যামা হেসে উঠলো খিল খিল করে আলী সাহেবের কাছে শশীর মত মেয়ে যদি বাগে আসতে পারে আপনি তো পুরুষ মানুষ। সত্যি আপনি রাজি আছেন আলী সাহেবের প্রস্তাবে?
খুব খুব রাজি, ভাই-এর ছবিতে হিরোর রোল করবো এতে আবার আপত্তি!
শ্যামা বনহুরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো–আপনাকে ধন্যবাদ।
বনহুরও অগত্যা হাত বাড়িয়ে দিলো শ্যামার দিকে, শ্যামা ওর করমর্দন করলো। শ্যামার মনে একটা আনন্দ দোলা দিয়ে গেলো। বললো শ্যামা–চলুন না আজ স্বয়ংবরা’ দেখে আসি?
বনহুর তাকালো আবার নূরীর দিকে–মিস শশী যদি যান তাহলে তিনজন মিলে না হয় যাওয়া যেতো।
শ্যামা বললো–শশী বড্ড বেরসিক, ও ছবি দেখতে যাবে না! চলুন আমরা দু’জনাই যাই।
কিন্তু উনাকে রেখে…বললো বনহুর।
নূরী বলে উঠলো–আমি যাব না শ্যামাদি, তুমি যাও।
দেখলেন তো? চলুন মিঃ মাসুম…বনহুরের হাত ধরে টেনে উঠিয়ে নিলো শ্যামা।
বনহুরের কাছে এতোটা বড় খারাপ লাগছিলো–বিশেষ করে নূরীর সামনে, কিন্তু না গিয়ে পারলো না, নূরীকে উদ্ধার করতে হলে শ্যামাকে সন্তুষ্ট রেখে কার্যোদ্ধার করতে হবে।
নূরীকে ছেড়ে যেতে যদিও বনহুরের বাধছিলো তবুও যেতে হলো, শ্যামার পাশে ড্রাইভ আসনে উঠে বসে গাড়িতে ষ্টার্ট দিলো। হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো বেলকুনিতে, দেখলো নূরীর দু’টি দীপ্ত আঁখি লক্ষ্য করছে তাকে।
দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো গাড়িখানা, নূরীও ফিরে গেলো কক্ষমধ্যে। শ্যামার সঙ্গে বনহুর যন্ত্রণা তার বুকের মধ্যে আলোড়ন তুলছে।
এখানে নূরী যখন বনহুরের সাক্ষাৎলাভ করেও তাকে নিবিড় করে পাচ্ছে না, তখন দিল্লীর বুকে মনিরা স্বামীর জন্য চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছে। সেই যে সাপুড়ে সর্দারের সঙ্গে চলে গেলো আর সে ফিরে এলো না।
কান্দাই থেকে মরিয়ম বেগম বার বার চিঠি লিখছেন, মনিরা যেন এখন দেশে ফিরে আসে, বিশেষ করে তার শরীর দিন দিন ভেঙে পড়েছে। তাছাড়া নূরও অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে পড়েছে মায়ের জন্য। মনিরা তার মামীমার চিঠি পেয়ে অস্থির হয়ে পড়লো, নূরের কথা সব সময় মনে হতে লাগলো তার।
