হাঁ, অভিনেত্রী আমি নই। আমাকে ওরা জোর করে অভিনেত্রী করেছে। একটু থামলো নূরী, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো আবার–খান বাহাদুর সাহেব, আমি বড় অসহায়া, বড় হতভাগী, আমার জীবন কাহিনী অত্যন্ত করুণ, ব্যথা-ভরা।
অসুবিধা মনে না করলে আপনি বলুন, যদি কোনো উপকার করতে পারি। বসুন আপনি।
এতোক্ষণে নূরী যেন নিজের মধ্যে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে নিতে পারলো, খান বাহাদুরের কথায় অনেকটা আশ্বস্ত হলো সে, বসলো তার পাশের আসনে। তারপর বলে চললো সেই পর্বতের উপরে বনহুরের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ, কি করে আসলাম আলীর ছবিতে এসে পড়লো, তারপর আসলাম আলীর কুৎসিত মনোবাসনা থেকে নিজকে রক্ষা করার জন্য অভিনেত্রী জীবন বেছে নিলো, আরও বললো সে অভিনয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তবেই আমি আজও নিজের ইজ্জৎ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি..
বনহুরের মনে উদয় হলো আর একদিন শ্যামার কথা, বলেছিলো শ্যামা…ভদ্রলোক যদি আজ উপহার দিতে এসে বিমুখ হয়ে ফিরে যান তাহলে আলী সাহেব তোকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। ভুলে যাসনে শশী, শুধু তিনি তোর অভিনয়ের জন্যই…হঠাৎ শশী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলেছিলো–থাক, আর বলতে হবে না। দিন ও মালা আমি নেবো…আজ বনহুরের কাছে সেদিনের রহস্যপূর্ণ কথাগুলো সচ্ছ হয়ে গেলো। বুঝতে পারলো, নূরী নিজের ইজ্জৎ রক্ষার জন্যই বেছে নিয়েছে অভিনেত্রী জীবন। নিষ্পাপ ফুলের মত নূরীর অশ্রুসজল মুখখানার দিকে তাকিয়ে কিছুতেই বনহুরের মন স্থির রইলো না, সে নূরীকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে আবেগভরা কণ্ঠে ডাকলো–নূরী!
নূরী হঠাৎ খান বাহাদুরের এই অদ্ভুত আচরণে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলো; পরক্ষণেই তার অতি পরিচিত কণ্ঠে মধুর সম্ভাষণ ভরা ‘নূরী’ ডাক কানে প্রবেশ করতেই বিস্ময়ে অভিভূত হলো। অস্ফুট কণ্ঠে বললো–কে, কে আপনি?
বনহুর নিজের মুখের দাড়ি খুলে ফেললো–নূরী!
হুর তুমি–তুমি…নূরী বনহুরের বুকে মুখ রেখে আকুলভাবে কেঁদে উঠলো–হুঁর, কোথায় ছিলে তুমি এতোদিন?
নূরীকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে বললো বনহুর–নূরী, তোমাকে হারানোর পর থেকে আমি পাগলের মত কত জায়গায় না তোমার সন্ধান করে ফিরেছি। নূরী, তোমাকে যে ফিরে পাবো সে আশা আমার ছিলো না। নূরী–আমার নূরী!
এমন সময় বাইরে গাড়ির শব্দ হলো, বনহুর নূরীকে মুক্ত করে দিয়ে দ্রুতহস্তে দাড়ি-গোঁফ পরে নিলো।
নূরী আঁচলে চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, কিন্তু তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে অভূতপূর্ব এক আনন্দ দ্যুতি। তার চির সাধনার বনহুরকে পেয়েছে–এ যে কত খুশির কথা! নূরী নিষ্পলক নয়নে খান বাহাদুর শামস ইরানী-বেশি বনহুরের দিকে তাকিয়ে রইলো।
শ্যামা প্রবেশ করলো কক্ষমধ্যে। মুখোভাব তার খুব প্রসন্ন নয়, বেশ গম্ভীর মনে হচ্ছিলো তাকে।
শ্যামা কক্ষমধ্যে প্রবেশ করতেই বললো খান বাহাদুর শামস ইরানী–মিস শ্যামা, আমি কিন্তু আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি। এসে গেলেন, ভালই হলো।
কেন, শশীর সঙ্গে বুঝি আলাপ জমছে না?
উঁহু বড় নীরস মেয়ে।
হাঁ, শশীটা অমনি বটে।
আপনার কাজ হলো? প্রশ্ন করলেন শামস ইরানী।
বিষণ্ণ কণ্ঠে বললো শ্যামা–না।
বলে উঠলো শামস ইরানী–ওঃ হাঁ, আপনি চলে যাবার পরই আমার ছোট ভাই মাসুম ফোন করেছিলো আপনার কাছে।
মাসুম সাহেব ফোন করেছিলেন? আনন্দভরা গলায় উচ্চারণ করলো শ্যামা কথাটা। তার মুখমন্ডলে ছড়িয়ে পড়লো একটা প্রসন্ন ভাব। বললো সে–কি বললেন তিনি?
বললো শামস ইরানী–মাসুম সন্ধ্যায় এখানে আসবে, আপনি যেন তার জন্য অপেক্ষা করেন।
সত্যি?
হাঁ সত্যি। দেখুন, মাসুম এখানে এসে অবধি কারো সঙ্গে মিশবার সুযোগ পায়নি। সে বলেছিলো, আপনাকে নাকি তার খুব ভাল লেগেছে।
শ্যামার মুখে রক্তাভ আভা ফুটে উঠলো। লজ্জিতভাবে বললো সে–আপনি নাকি তাকে কোথাও আসতে দেন না, মানে কারো বাড়িতে যাওয়া পছন্দ করেন না?
সে কথা অবশ্য সত্যি। তবে আপনার বাড়ি এলে আমার তেমন কোনো আপত্তি নেই।
খান বাহাদুর সাহেব, আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব!
এতে আর ধন্যবাদের কি আছে মিস শ্যামারাণী!
আপনি যে আমাকে নিজের মনে করেন এজন্য আমি আনন্দিত। মাসুম সাহেবের বড় ভাই হিসেবে আপনি আমারও সম্মানিত জন।
আচ্ছা চলি আজকের মত মিস শ্যামা? অনেকক্ষণ শশী রাণীকে আটকে রেখেছিলাম, এজন্য আমি…
না না, শশী এতে কিছু মনে করেনি বরং সে খুশিই হয়েছে। কারণ একা একা তার বড় খারাপ। লাগতো।
খান বাহাদুর শামস ইরানী উঠে পড়লো।
*
সন্ধ্যার পূর্বে বনহুর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো, এখন তার দেহে স্বাভাবিক ড্রেস। দামী স্যুট পরে নিয়েছে সে, শ্যামার ওখানেই চলেছে বনহুর।
এদিকে শ্যামাও আজ সেজেছে নিখুঁতভাবে; মাসুম ইরানীকে সাদর সম্ভাষণ জানানোর জন্য উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করছে সে।
নূরী তখন শামস ইরানী-বেশি বনহুরকে তার ছোট ভাই সম্বন্ধে শ্যামার সঙ্গে আলাপ করতে দেখে অবাক হয়েছিলো, কারণ সে জানে, বনহুরের কোনো ভাই নেই। তবু মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ জেগেছিলো তার। নূরীও বিপুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে, সন্ধ্যায় নতুন। আগন্তুকটিকে দেখার জন্য।
শ্যামা বার বার হাতঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছে, কই এতক্ষণও মাসুম ইরানী তো এলো না? শ্যামার মধ্যে চঞ্চলতা যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
