চমকে উঠলো যেন শ্যামা–কেন?
আমার ভাইজান পছন্দ করেন না আমি কারো বাড়ি যাই।
হেসে বলে শ্যামা–ভয়, পাছে ভাইটিকে হারান, এই তো?
ঠিক তা নয়।
তবে?
তার স্বভাব, তিনি পছন্দ করেন না।
শ্যামার মুখখানা কালো হয়ে গেল যেন।
অন্ধকার হলেও বুঝতে পারলো বনহুর, শ্যামার মুখটা গম্ভীর হয়ে পড়েছে।
হেসে বললো বনহুরবাড়িতে না এলেও ঠিক আসবো। আমার কামরার ফোন নং ৫৫০০১, যখন ডাকবেন গাড়ি নিয়ে হাজির হবো।
ঠিক বলছেন তো? আনন্দে উপছে পড়ে যেন শ্যামা।
হা।
শ্যামা বলে উঠে এবার–এই তো সামনেই আমার বাসা।
ওঃ আমি ভুল করে যাচ্ছিলাম। বনহুর ব্রেক কষে গাড়ির মুখটা ফিরিয়ে নেয় দ্রুতহস্তে।
শ্যামার বাড়ির গেটে গাড়ি রাখতেই ড্রাইভার এগিয়ে আসে।
শ্যামা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলে–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে মিঃ মাসুম। ড্রাইভার, যাও উনাকে রেখে এসো।
বনহুর শ্যামার পরিত্যক্ত আসনে বসে, ড্রাইভার উঠে বসে তার স্থানে।
*
পরদিন।
বনহুর বাইরে বের হবার জন্য তৈরি হচ্ছে, আসলাম আলীর কাছে যাবে বলে। এখন সে খান বাহাদুর শামস ইরানী বেশে সজ্জিত হয়েছে। এমন সময় ফোন বেজে উঠলো, রিসিভার হাতে তুলে নিতেই ভেসে এলো মেয়েলি কণ্ঠ–হ্যালো, মিস শ্যামা বলছি। আপনি কি মাসুম সাহেব বলছেন?
হা, আমি মাসুম বলছি। সেই মুহূর্তে যদিও বনহুরের শরীরে খান বাহাদুর শামস ইরানীর ড্রেস ছিলো, একটুকরা হাসি ফুটে উঠে তার ঠোঁটের কোণে, বলে–হ্যালো মিস শ্যামারাণী, আসুন না, বড় একা লাগছে।
সত্যি বলছেন? খান বাহাদুর সাহেব নেই।
না, বাইরে গেছেন, হয়তো আপনার ওখানে কিংবা পরিচালকের কাছে। আসুন না দয়া করে, প্লিজ…
আচ্ছা আসছি। সত্যি আপনার ডাকে না গিয়ে পারবো না।
অপেক্ষা করবো?
নিশ্চয়ই।
তাহলে রেখে দি?
আচ্ছা ধন্যবাদ।
বনহুর রিসিভার রেখে দিলো, তারপর কেশবকে ডেকে বললো–কেশব, আমি বাইরে যাচ্ছি, কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবো, একটি যুবতী আসবে, মানে ঐ সেদিন যিনি এসেছিলেন, তাকে বসাবে বুঝলে?
আচ্ছা বাবু, বসাবো। বনহুর চলে যায়।
শ্যামা তখন হোটেল ফুলাগুতে আসার জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছিলো।
শ্যামা যখন সজ্জিত হচ্ছিলো তখন শশী এসে দাঁড়ায় তার পাশে কোথায় যাচ্ছো শ্যামাদি?
নূরীকে শ্যামা ছোট বোনের মত মনে করতো, সেজন্য নূরী ওকে শ্যামাদি বলে ডাকতো। শ্যামা আয়নায় নিজের যৌবন ঢলঢল দেহটার দিকে নিপুণভাবে লক্ষ্য করে বললো–অজানা বন্ধুর ওখানে।
নূরী বিমর্ষ মনে বললো–শীঘ্র এসো কিন্তু।
শ্যামারাণী যখন বেরুতে যাচ্ছিলো ঠিক ঐ মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করে খান বাহাদুর শামস ইরানী–হ্যালো মিস শ্যামা, কোথাও যাচ্ছেন বুঝি?
খান বাহাদুর শামস ইরানী সাহেবকে দেখে একটু ভড়কে গেলো যেন শ্যামা, ঢোক গিলে বললো–আপনি এসে গেছেন? আমি একটু বাইরে যাচ্ছি বিশেষ একটা জরুরি কাজ আছে কিনা। আপনি অবশ্য বসুন, শশীর সঙ্গে কথাবার্তা বলুন। আমি ওকে ডেকে দিচ্ছি।
মনে মনে হাসলো শামস ইরানী-বেশি বনহুর, জানে সে শ্যামা কোথায় চলেছে। মাসুম ইরানীর আকর্ষণে সে ছুটে চলেছে এখন ফুলাগু হোটেলে।
শ্যামা ততক্ষণে শশীকে নিয়ে এলো সঙ্গে করে–এর সঙ্গে গল্প করুন খান বাহাদুর সাহেব।
আচ্ছা ধন্যবাদ।
খান বাহাদুর শামস ইরানী ফিরে তাকায় তার সম্মুখে দন্ডায়মান শশীর দিকে। চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বলে–বসুন মিস শশীরাণী।
শশী সে কথায় কান না দিয়ে বলে–আমার সঙ্গে আপনার কি দরকার বলুন? আমি বেশিক্ষণ বিলম্ব করতে পারবো না।
কি বললেন, বেশিক্ষণ বিলম্ব করতে পারবেন না?
না। গম্ভীর কণ্ঠ শশীর।
বললো খান বাহাদুর শামস ইরানী–কিন্তু আপনি যে এখন আমার। মানে আমার ছবিতে কাজ করার জন্য আপনি চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। আপনার উপর আমার দাবি আছে। শামস ইরানী খপ করে হাত ধরে ফেলে শশীর।
না, আমি আপনার কোনো দাবি মানতে রাজি নই। ছেড়ে দিন, আমার হাত ছেড়ে দিন বলছি।
এবার বললো শামস ইরানী-আপনি আমাকে বিমুখ করবেন না মিস শশীরাণী। আপনি যা চান তাই দেবো, গাড়ি-বাড়ি-ঐশ্বর্য–যা চান।
ছেড়ে দিন, আমি কিছু চাই না, কিছু চাই না আমি। ছেড়ে দিন বলছি।
শামস ইরানী ছেড়ে দিলো শশীর হাত কিন্তু সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শশীর আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো, বললো–মিস শশী, এ পৃথিবীতে মানুষ কি চায়? কিসের জন্য মানুষ আজ উন্মাদ+অর্থ আর ঐশ্বর্য–আপনি কি এসবের জন্যই অভিনেত্রী বনে যাননি?
না না, আমাকে এরা জোর করে ধরে এনেছে, আমি এসবের কিছু চাইনি, এখনও চাই না।
বনহুর নূরীকে এতো কাছে পেয়েও নিজকে কঠিনভাবে সংযত রেখে ওকে পরীক্ষা করে চললো। এতোদিন নূরী এদের হাতের পুতুল হয়ে আছে। সে কেমন আছে কে জানে। মাঝে মাঝে বনহুরের মনে সন্দেহের দোলা লেগেছে, কিন্তু বেশিক্ষণ সন্দেহ তার মনে স্থায়ী হতে পারেনি। নূরী কোনোদিন অসতী হতে পারে না। তবু বনহুর নিজ মনকে সচ্ছ করে নেবার জন্যই ওকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চললো। বললো–আশ্চর্য মেয়ে আপনি! লোভ, মোহ আপনার কিছু নেই? এই সৌন্দর্য, এই ভরা যৌবন আপনি ব্যর্থ করে দেবেন?
আমার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, সব সখ মুছে গেছে। আমি আর কিছু চাই না, যা পাবার ছিলো পেয়েছি, এখন আর কোনো লোভ, মোহ নেই আমার।
তবে কি অভিনেত্রী জীবন আপনার মিথ্যা?
