একটু হেসে বললো বনহুর–ভাইজান জরুরি একটা কাজে বাইরে গেছেন। তিনি এজন্য অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন। তবে আপনার সম্বন্ধে ভাইজান আমাকে বিশেষভাবে বলে গেছেন। বসুন মিস শ্যামারাণী।
শ্যামার চোখেমুখে আনন্দের দ্যুতি, আসন গ্রহণ করে সে।
বনহুরও পাশের আসনে বসে পড়ে।
শ্যামা নিজকে সচ্ছ স্বাভাবিক করে নেয়, বলে–আমি তো আপনার সঙ্গেই আলাপ করতে এসেছি। উনি জরুরি কাজেই বাইরে গেছেন, তাতে দুঃখিত হবার কি আছে।
বনহুর হাতের মধ্যে হাত কচলায়–আপনি আমার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছেন, এ যে আমার পরম সৌভাগ্য।
কি যে বলেন, আমি আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে কত সে আনন্দিত হলাম। আসলাম আলীর কাছে আপনার গুণাগুণের প্রশংসা শুনে সত্যি আপনার সঙ্গে পরিচয় করার লোভ সামলাতে পারলাম না। আলী সাহেবের কাছে এই হোটেলের ঠিকানা জেনে নিয়েছি।
আমার প্রশংসা–কি যে বলেন!
দেখুন মিঃ মাসুম, আপনার গলার স্বরের সঙ্গে আপনার ভাইয়ের স্বরের অনেকটা মিল আছে। একই মায়ের সন্তান তো!
বনহুর শুধু হাসলো একটু, কোনো জবাব দিলো না।
বনহুর বললো–বলুন মিস শ্যামারাণী, আপনার জন্য আমি কি করতে পারি?
কিছু না। আপনার মহৎ ব্যবহারে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি।
বার বার ওসব মন ভোলানা কথা না বলে বলুন কি খাবেন–ঠান্ডা কিছু, না গরম?
যা আপনার ভাল লাগে।
বনহুর কলিং বেলে চাপ দিতেই বয় এসে দাঁড়ালো।
যে-কোনো ভাল মিষ্টি নিয়ে এসো আর কফি দু’কাপ।
উঁ হুঁ মিষ্টি নয়–ঝাল।
আচ্ছা, গরম বোম্বে সিংগারা আর দুটো রোষ্ট নিয়ে এসো।
বয় চলে যায়।
শ্যামা অল্পক্ষণে অত্যন্ত সহজ হয়ে এসেছে।
বনহুর জানে, চিত্রতারকারা এমনি হয়। অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করাই এদের কাজ।
অল্পক্ষণ পরেই খাবার এলো।
শ্যামা বললো–এতো?
নিন না, এতো আর কি, এই তো সামান্য!
খেতে খেতে অনেক গল্প হলো। শ্যামা যেন মাসুম ইরানীকে অল্পক্ষণে আপন করে নিলো।
খাওয়া শেষ হলো, শ্যামা বললো–কই খান বাহাদুর সাহেব এখনও তো এলেন না?
হয়তো কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। বললো বনহুর।
শ্যামা ইচ্ছা করেই যে বিলম্ব করছে তা বেশ বুঝতে পারলো বনহুর। এ কথা-সে কথার মাধ্যমে সময় বেড়ে চললো।
শ্যামা আর বনহুর যখন নির্জন কক্ষে আলাপ হচ্ছিলো, তখন কেশব আর ফুলমিয়া রাগে ফেটে পড়ছিলো, অবশ্য রাতটা তাদের ঐ অজানা-অচেনা তরুণীটির উপর। জাহাজে বাবু এক তরুণীর পাল্লায় পড়েছিলেন মিস নীহারের কবলে। কোনো রকমে খেসে এসেছেন বাবু। আবার এক ফ্যাসাদ এসে জুটলো। তবে কেশবের প্রবল বিশ্বাস আছে, তাদের বাবুকে কেউ ফাঁদে ফেলতে পারবে না।
বললো ফুলমিয়া–তুমি জানো না কেশব দাদা, মেয়েরা সব পারে।
কেশব বললো–বাবু তেমন লোক নয়।
ফুলমিয়া বললো–মেয়েদের পাল্লায় পড়লে সাধু-সন্ন্যাসীও নাকি চোর বনে যায়।
রেখে দে ফুলমিয়া ও সব কথা বাবু আমাদের মোম নয় যে গলে যাবে!
আচ্ছা দেখা যাবে। বললো ফুলমিয়া।
ভিতরে গল্প যত গভীরভাবে জমে উঠতে লাগলো ততই কেশব আর ফুলমিয়ার উৎকণ্ঠা বাড়তে লাগলো। মেয়েটা এলো–তা যায় না কেন? কি এতো কথা আছে যা ফুরাতে চায় না?
শ্যামার কণ্ঠ শোনা যায়–আপনি যদি আমাকে একটু পৌঁছে দিতেন, বড় উপকার হতো।
বনহুর হাতঘড়ির দিকে তাকায়ন’টা পঁচিশ। শীতের রাত, অল্পক্ষণ পর শহরটা ঝিমিয়ে পড়বে। শ্যামা ফাঁদ পাততে চেষ্টা করছে, মনে মনে হাসলো বনহুর, উঠে দাঁড়িয়ে বললো চলুন।
অনেক অনেক ধন্যবাদ মিঃ মাসুম। সত্যি আপনি না গেলে আমি ভয় পেতাম, কারণ পর পর দু’টো চাঞ্চল্যকর ডাকাতি শহরের বুকে লোকজনের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
চলুন আমি পৌঁছে দিয়ে আসি। বনহুর আলনা থেকে কোটটা গায়ে পরে নিয়ে পা বাড়ালো দরজার দিকে।
কেশবকে লক্ষ্য করে বললো ফুলমিয়া–দেখলে বন্ধু আমার কথা ঠিক কিনা? মেয়ে মানুষের পাল্লায় পড়েছেন, খসতে বিলম্ব হবে।
বনহুর আর শ্যামা সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো নিচে।
কেশব ফুলমিয়ার কথায় কোনো জবাব দিতে পারলো না। কারণ বাবুকে তো এমন কোনোদিন দেখেনি।
বনহুর আর শ্যামা গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালো।
শ্যামা বললো ড্রাইভার আসেনি কিনা তাই, নাহলে আপনাকে কষ্ট দিতাম না। আমার গাড়িতেই চলুন, ড্রাইভার আপনাকে পৌঁছে দেবে।
বনহুর কোনো কথা না বলে ড্রাইভ আসনে উঠে বসলো। শ্যামা তার পাশের আসনে বসেছে।
গাড়ি ছুটতে শুরু করলো।
শ্যামা কিছুক্ষণ নীরব রইলো বটে কিন্তু এক সময় হঠাৎ বলে উঠলো–মিঃ মাসুম, অভিনেত্রী বলে আপনি আমাকে ঘৃণা করছেন না তো?
মিস শ্যামা, আমার কাছে সব মানুষের একই রূপ–সে মানুষ। আমি কাউকে ঘৃণা করি না, ঘৃণা করা আমার স্বভাব নয়।
সত্যি মিঃ মাসুম, আপনার সঙ্গে একদিনের পরিচয়ে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছি। আপনার কথা কোনো সময় আমি ভুলবো না।
একটা নগণ্য মানুষ ছাড়া আমি তো এমন কিছু নই মিস শ্যামারাণী।
এই তো একটু পূর্বে বললেন মানুষ সে মানুষই, তার আবার গণ্য আর নগণ্য কি আছে! তাছাড়া আপনি যদি নগণ্য হন তাহলে এ পৃথিবীতে সবাই নগণ্য। মিঃ মাসুম, আপনাকে আমার অত্যন্ত ভাল লেগেছে।
নিজকে গৌরবান্বিত মনে করছি মিস শ্যামা।
আসবেন কিন্তু মাঝে মাঝে, বেড়াবো আমরা।
বনহুর গাড়ির সম্মুখে দৃষ্টি রেখে বলে–আসবো।
সত্যি বলছেন তো?
হাঁ, কিন্তু আপনার বাড়িতে নয়।
