শামস ইরানীর মুখে হাসি ফুটে উঠে, বলে সে সত্যি আপনাকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারছি না মিস শ্যামারাণী।
আবার হেসে উঠে শ্যামা–উপকার না করতেই আপনি দেখছি ধন্যবাদের ডালা উজাড় করে দিলেন। পরে কি দেবেন!
সেজন্য ভাবতে হবে না মিস শ্যামারাণী।
ওঃ তাই নাকি?
হাঁ। এই দেখুন মিস শ্যামারাণী, আজ আপনাদের দু’জনার জন্য সামান্য কিছু উপহার এনেছি। বনহুর হারের প্যাকেট দুটো বের করে শ্যামার সম্মুখস্থ টেবিলে রাখে।
ড্রইংরুমের উজ্জ্বল আলোকরশ্মিতে হাত দুটো ঝলমল করে উঠলো। হারের পাথরগুলো থেকে, যেন বিদ্যুৎ ছটা ঠিকরে বের হচ্ছে।
শ্যামারাণীর চোখ দুটো জ্বলে উঠলো চক চক করে, উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো–অপূর্ব!
নিন, আপনাদের জন্য এ দুটো এনেছি।
শ্যামা একটা হাত তুলে নিয়ে গলায় পরে নিলো। অপরটি নিয়ে ছুটলো ভিতর বাড়িতে।
বনহুর কান পেতে রইলো, শুনতে পেলো শ্যামার খুশিতে ডগমগ কণ্ঠস্বর–শশী, দেখো দেখো, খান বাহাদুর সাহেব আমাদের জন্য কি এনেছেন?
নূরীর কণ্ঠ শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে রইলো বনহুর কিন্তু কোনো শব্দই শোনা গেলো না বিপরীত পক্ষ থেকে। শ্যামার আনন্দ-ভরা গলার পর পর প্রতিধ্বনি–নে নে দেখি, বড় লাজুক মেয়ে তুই। ছবিতে অভিনয় করতে এসে অতো লজ্জা করলে চলে না, বুঝলি?
বনহুর বুঝতে পারলো, নূরী তার হারছড়া উপেক্ষা করছে।
একটু পরে ফিরে এলো শ্যামারাণী, বিমর্ষ তার মুখমন্ডল। হাতে হারছড়া, বললো সে– পারলাম না ওকে কিছুতেই এটা নেওয়াতে–আপনি চলুন, যদি গ্রহণ করাতে পারেন।
এটুকুই চাইছিলো বনহুর, অনুসরণ করলো সে শ্যামাকে। ভিতর কক্ষে প্রবেশ করে দেখলো বনহুর, নূরী একটা খাটের পায়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। আজ নূরীর দেহে কোনোরকম সাজ সজ্জার লেশ নেই। তবে একটা শাড়ি পরিপাটি করে বাঙালি প্যাটার্ণে পরা রয়েছে।
বনহুর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
শ্যামা বললো–কি হলো, আপনি দেখছি শশীর কাছে একেবারে বোবা বনে যান?
সম্বিৎ ফিরে পায় বনহুর, শ্যামার হাত থেকে হারছড়া নিয়ে এগিয়ে যায় শশীর দিকে–মি। শশীরাণী!
না না, ও হার আমি নেবো না। হঠাৎ বলে উঠে শশী।
তা হয় না, তোকে নিতেই হবে শশী। ভদ্রলোক যদি আজ উপহার দিতে এসে বিমুখ হয়ে ফিরে যান তাহলে আলী সাহেব তোকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। ভুলে যাসনে শশী, শুধু তিনি তোর অভিনয়ের জন্যই…
হঠাৎ শশী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে–থাক আর বলতে হবে না। দিন, ও মালা আমি নেবো।
বনহুর অবাক হয়, সর্প যেমন ঔষধের গন্ধে মুহূর্তে দমে যায় তেমনি শ্যামার ইংগিতপূর্ণ কথায় নূরীর ক্রুদ্ধভাব কোথায় যেন উবে যায় একেবারে। নূরী শামস ইরানীর হাত থেকে হারছড়া হাতে তুলে নেয়।
আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে শামস ইরানীর মুখ।
শ্যামার মুখেও হাসি ফোটে।
শামস ইরানীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয় শ্যামার। শ্যামা এবার নূরীর হাত থেকে হারছড়া নিয়ে পরিয়ে দেয় তার গলায়।
শামস ইরানী বলে উঠে–চমৎকার!
হঠাৎ চমকে উঠে নূরী, এ কণ্ঠস্বর যেন হৃদয়ে প্রচন্ড ধাক্কা দেয়। তার বনহুরের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি যেন সে শুনতে পায় প্রৌঢ় শামস ইরানীর গলায়।
শ্যামা বলে–খান বাহাদুর সাহেব, একদিন আপনার হোটেলে যাবো। আসলাম আলীর কাছে জানতে পারলাম, আপনার ছোট ভাই নাকি আপনার ওখানে থাকেন? অনেক প্রশংসা করলেন তিনি তার।
হ, আমার ছোট ভাই মাসুম ইরানী আমার কাছেই আছে।
আসলাম আলী বললেন–আপনার ছোট ভাইটি নাকি দেখতে অপূর্ব? হিরোর মত নাকি তার চেহারা?
হাসলো বনহুর হতে পারে।
আমি গেলে আপনার ভাই যদি অসন্তুষ্ট হন?
আমার ভাই আপনাকে পেলে খুশিই হবে কারণ বোম্বে এসে সে মিশবার জন্য কাউকে তার সাথী হিসেবে বেছে নিতে পারেনি এখনও।
সত্যি?
হা, মিস শ্যামারাণী।
তাহলে কালকেই আসলাম আলীর সঙ্গে হানা দেবো আপনার হোটেল ফুলাগুতে।
নিশ্চয়ই। কিন্তু মিস শশীকে যেন নিয়ে যাবেন না।
কেন? ওকে এতো ভয় কেন আপনার?
কি জানি আমার ছবির নায়িকা শেষে যদি…থাক পরে বলবো।
ওঃ বুঝতে পেরেছি, আপনার ভাইটিকে যদি পছন্দ করে বসে।
মিথ্যা নয়। হাসলো শামস ইরানী।
শ্যামাও হাসলো তার হাসিতে যোগ দিয়ে।
*
বনহুর একটা পত্রিকা নিয়ে মনোযোগ সহকারে পড়ছিলো, এমন সময় কেশব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে–বাবু, বাবু, একটি মেয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
পত্রিকা থেকে চোখ তুলে বললো বনহুর–ওঃ মিস শ্যাম? আচ্ছা নিয়ে এসো তাকে।
কেশব চলে গেলো।
ফুলমিয়াও অনুসরণ করলো কেশবকে। মেয়ে মানুষের কথা শুনে ফুলমিয়াও একটু হাবা বনে গিয়েছিলো, তবে কি সেই ফুল এসেছে?
কেশবের সঙ্গে যে মেয়েটি সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলো উপরে সে যে ফুল নয়–এ ব্যাপারে। নিঃসন্দেহ হলো ফুলমিয়া একটু পরেই, যখন কেশব এসে জানালো, এ আবার কে এসে জুটলো!
মেয়েটির আঁটসাট পোশাক এবং তার অত্যাধুনিক সাজসজ্জা ভাল লাগলো না কেশব আর। ফুলমিয়ার।
তরুণী অন্য কেউ নয়, চিত্রতারকা শ্যামারাণী।
শ্যামা কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে থমকে দাঁড়ালো, একবার চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিলো, তারপর দৃষ্টি সীমাবদ্ধ হলো সম্মুখস্থ যুবকটির উপর।
বনহুর যেন শ্যামাকে এই প্রথম দেখছে, মুখোভাবে এমনি ভাব টেনে বললো–আপনি বুঝি মিস শ্যামারাণী?
হা, কিন্তু খান বাহাদুর সাহেব কই?
