বনহুর প্রথমে কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না, নূরীকে সে দিব্যচোখে দেখছে–এ যেন বাস্তব নয়। নূরী তো হারিয়ে গেছে সেই সুদূর পর্বতের উপরে। জংলিগণ তাকে হত্যা করেছে। না না, নূরী বেঁচে আছে–তার সম্মুখে দন্ডায়মান। বনহুর অতি কষ্টে নিজেকে সংযত রাখলো যদিও তার বুকের মধ্যে ভীষণ একটা আলোড়ন অনুভব করছিলো। কোনো কথা সে চট করে বলতে পারলো না।
আলী সাহেব পরিচয় দিলেন–এর নাম শশী।
বনহুর তখনও নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে, নূরীকে সে কোনোদিন এমন ড্রেসে দেখেনি। বন-দুহিতা নূরীকে আজ বনহুর দেখলো আধুনিক এক তরুণী বেশে। কুঞ্চিত কেশরাশি মাথার উপর ডালা করে বাঁধা! খোঁপার উপরে উজ্জল মতি-বসানো ক্লিপ আঁটা। কানে, গলায় এবং হাতের কব্জিতে সেট করা মূল্যবান গহনা। ফিকে আকাশী রং-এর শাড়ি, ব্লাউজ এবং পায়ের জুতা জোড়াও। সরু বাঁকানো ঠোঁট দুখানা লিপষ্টিকে রঞ্জিত। বাম হস্তের কব্জিতে রিষ্টওয়াচ-বনহুর নূরীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিপুণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলো। অভিনেত্রীর ড্রেসে নূরীকে অপূর্ব মানিয়েছে। কিন্তু পূর্বের সেই চঞ্চলতা কই নূরীর মধ্যে! এ যেন আর এক নূরী। ভয়-বিহ্বল চোখে একবার সে বনহুরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো।
আলী সাহেব বুঝতে পারলেন–শশীর রূপরাশি খান বাহাদুর শামস ইরানীর চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছে। হেসে বললেন–খান বাহাদুর সাহেব, শশীকে আপনার কেমন লাগছে?
বনহুর ছোট্ট করে গম্ভীর কণ্ঠে বললো–অপূর্ব!
সেইদিনই শশীকে বনহুর চুক্তিবদ্ধা করলো তার ছবির নায়িকা হিসাবে।
আজ এই পর্যন্ত কাজ হলো।
আলী সাহেব বলেছিলেন–খান বাহাদুর সাহেব, আপনি যখন খুশি আসবেন এবং শ্যামা ও। শশীর সঙ্গে আলাপ করে যাবেন।
খুশি হলো বনহুর, বললো সে নিশ্চয়ই আসবো, না এলে যে আমার চলবে না।
শ্যামা হেসে বললো–আপনার ছবির নায়িকা যখন শশী তখন সে এখন আপনারই।
বনহুরও হাসলো–আপনিও বাদ যাবেন না, আমার ছবিতে আপনিও থাকবেন বিশিষ্ট এক চরিত্রে।
ধন্যবাদ খান বাহাদুর সাহেব। বললো শ্যামা।
আলী সাহেব বললেন–নিশ্চয়ই শ্যামাও থাকবে।
বললো বনহুর–আপনাকেও আমি চুক্তিবদ্ধা করবো মিস শ্যামা।
সেদিনের মত বনহুর বিদায় গ্রহণ করলো।
*
বনহুরকে আজ বেশ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। হোটেল ফুলাগুর বেলকনিতে বসে তাকিয়ে আছে সে আলো ঝলমল বোম্বে নগরীর অপরূপ সৌন্দর্যের দিকে। কর্ম-কোলাহলমুখর রাজপথ, পথের দুধারে সুউচ্চ দালান-কোঠা। অসংখ্য দালান-কোঠার মধ্যে দিয়ে প্রশস্ত পথ এগিয়ে গেছে সম্মুখের দিকে। পথের উপর দিয়ে অসংখ্য গাড়ি চলেছে সারিবদ্ধভাবে।
বনহুর নূরীকে আজ স্বচক্ষে দেখতে পেয়েছে, বেঁচে আছে নূরী–এ যে তার কাছে কত বড় আনন্দের কথা!
পাশেই বসে আছে দু’খানা আসনে কেশব আর ফুলমিয়া। শ্যামার ওখান থেকে ফিরে এসে সব খোলাসা বলেছে বনহুর কেশব আর ফুলমিয়ার কাছে। কেশবের খুশি আর ধরছে না। তার বোন ফুল জীবিত এ যে সে কল্পনা করতে পারেনি, আজও যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না যতক্ষণ ফুলকে সে নিজ চোখে না দেখেছে ততক্ষণ মনকে বোঝাতে পারছে না কেশব।
আর ফুলমিয়া–সে তো নূরীকে দেখেইনি, কেমন সে তাও জানে না, কাজেই ফুলমিয়া সম্পূর্ণ নীরব রয়েছে।
বনহুর গভীরভাবে কিছু চিন্তা করে বললো–কেশব, নূরীকে উদ্ধার করার আশায় আমাদের আরও কয়েক দিন বোম্বেতে কাটাতে হবে। তুমি এদিকে প্রস্তুত থেকো, বোম্বে থেকে কবে কখন কোন্ প্লেন দিল্লী অভিমুখে রওয়ানা দেয়, সেইভাবে আমাকে কাজ শেষ করতে হবে।
বাবু, আমি কালই এ সম্বন্ধে সংবাদ সংগ্রহ করে আনবো। ফুলমিয়াকে সঙ্গে নিয়েই যাবো।
বেশ, তাই যেও।
আরও কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা চলার পর বনহুর উঠে পড়লো।
কেশব আর ফুলমিয়াও সে রাতের মত চলে গেলো নিজেদের কামরায়।
পরদিন সকালে বাইরে গেলো বনহুর। একটা জুয়েলার্সের দোকান থেকে মূল্যবান দু’ছড়া হার কিনে নিলো। ফিরে এলো বনহুর হোটেলে। সমস্ত দুপুরটা বিছানায় শুয়ে কাটালো সে। বনহুরের দ্যপ্রাণ আজ একটি নারীর সংস্পর্শের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।
সন্ধ্যার পূর্বে বনহুর খান বাহাদুর শামস ইরানীর বেশে সজ্জিত হলো, তারপর গাড়ি নিয়ে। সোজা বেরিয়ে পড়লো শ্যামারাণীর বাস ভবনের উদ্দেশ্যে।
গাড়ি শ্যামারাণীর বাড়ির গেটে পৌঁছতেই একটি বয় এসে তাকে ড্রইংরুমে নিয়ে বসালো। তারপর চলে গেলো সে ভিতর বাড়িতে।
একটু পরেই শ্যামা বিচিত্র ড্রেসে সজ্জিত হয়ে ড্রইংরুমে প্রবেশ করলো, সসম্মানে অভ্যর্থনা জানালো সে খান বাহাদুর শামস ইরানীকে।
শামস ইরানী আসন গ্রহণ করে বললো–মিস শ্যামা, আমি আপনাদের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছি।
সেই কারণেই বুঝি আজ পদধূলি দিলেন?
ছিঃ ছিঃ কি যে বলেন। আপনাদের সাক্ষাৎ লাভের আশায় এসেছি মিস শ্যামা।
আমাদের, না শশীর সাক্ষাৎ কামনা করেন?
আপনাদের উভয়কেই আমি…
ধন্যবাদ। কিন্তু শশী যে কাল থেকে চরমভাবে বেঁকে বসেছে, কিছুতেই ওকে বাগে আনতে পারছি না!
তাহলে তো বড় মুশকিলের কথা মিস শ্যামা। বিমর্ষ কণ্ঠে কথাটা উচ্চারণ করলো খান বাহাদুর শামস ইরানী।
শ্যামা হঠাৎ হেসে উঠলো খিল খিল করে, তারপর হাসি থামিয়ে বলে সে ঘাবড়ে যাবেন না খান বাহাদুর সাহেব, কাজের বেলায় ঠিকই পাবেন। মনে রাখবেন–শ্যামা সব পারে।
