এবার আশ্বস্ত হলো বনহুর, বললো–ডাকু তাহলে বোম্বে নেই! যাক্ কতকটা নিশ্চিন্ত হলাম।
বশির আলী বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বললেন–তার মানে! আপনি…
মানে, আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়াছিলাম কিনা। দেখুন, গত পরশুর পত্রিকায় একটি ঘটনা দেখেছি, কোনো এক হোটেলে গভীর রাতে একজন জমকালো পোশাক-পরা ব্যক্তি হানা দিয়ে সমস্ত ক্যাশ টাকা লুটে নিয়ে চলে গেছে।
আলী সাহেব বললেন–ঠিক বলছেন খান বাহাদুর সাহেব, বোম্বে শহরে কোনো এক ভয়ঙ্কর দুর্দান্ত ডাকুর আবির্ভাব ঘটেছে, যার বুদ্ধি-কৌশল আর শক্তি অসীম।
হাঁ, আমারও ঠিক সেই রকম মনে হয়। কথাটা এবার চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলো বনহুর ডাকুটি আর বোম্বে নেই জেনে সত্যি আমি অনেকখানি স্বস্তি লাভ করছি।
এমন সময় পাশের টেবিলে ফোন বেজে উঠে; আসলাম আলী উঠে গিয়ে রিসিভার হাতে উঠিয়ে নেন–হ্যালো স্পিকিং আলী সাহেব। কি বললেন, বোম্বে এরোড্রামে ডাকু ধরা পড়েছে?…হ্যালো হ্যালো, ডাকু ধরা পড়েছে? আচ্ছা এক্ষুণি ভাইজানকে পাঠাচ্ছি। আচ্ছা, ধন্যবাদ…রিসিভার রেখে এসে বসলেন আলী সাহেব। বললেন–ভাইজান, ডাকু ধরা পড়েছে।
শুনলাম। সত্যি আমার সৌভাগ্য।
আপনি এক্ষুণি এরোড্রামে চলে যান, সেখানে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আটক রেখেছে, আপনি সনাক্ত করবেন।
হাঁ, আমি ঠিক তাকে চিনে নেবো, কারণ তাকে আমি ভালভাবে দেখেছি।
বনহুরের মুখে হাসির আভাস ফুটে উঠলো, মনে মনে ভাবলো, না জানি কোন্ বেচারী ডাকু নামে গ্রেপ্তার হয়ে বসে আছে। প্রকাশ্যে বললো সে–বশীর আলী সাহেব, আপনার সৌভাগ্যই বটে। না হলে ডাকু এতো বুদ্ধিমান হয়েও পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায়? যান দেখুন, টাকাগুলো হয়তো এখনও তার হাতের এ্যাটাচীতেই রয়েছে।
আসলাম আলী বশীর সাহেবকে গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলেন। এবার আলী সাহেবের অফিস-রুমে বসে কাজ শুরু হলো। অফিস-রুমে আলী সাহেবের সহকারিগণ কাগজপত্র নিয়ে কাজ করছিলো। আলী সাহেব খান বাহাদুর শামস ইরানীর ছবি পরিচালনার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হলেন। খান বাহাদুর শামস ইরানী-বেশি বনহুর সম্পূর্ণ টাকা একযোগে আসলাম আলীকে প্রদান করলো।
আসলাম আলীর চোখেমুখে ফুটে উঠলো আনন্দোচ্ছ্বাস। কারণ কোনো প্রযোজক ছবি তৈরির পূর্বেই পরিচালকের প্রাপ্য সম্পূর্ণ বুঝিয়ে দেন না। আজ তার ব্যতিক্রম দেখে এবং এতোগুলো অর্থ একযোগে পেয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন।
বনহুর এবার তার ছবির জন্য নায়িকা শশীকে চুক্তিবদ্ধ করার জন্য আগ্রহ দেখালো।
আসলাম আলীর হৃদয়ে অপূর্ব অনুভূতি–শশী তাঁরই, কাজেই শশীর প্রাপ্য অর্থও তার। যদিও এখন সে শ্যামার ওখানেই আছে। আলী সাহেব বনহুরকে সঙ্গে করে শ্যামার ওখানে গেলেন।
সুসজ্জিত ড্রইংরুমে আসলাম আলী বনহুরকে বসিয়ে ভিতরে চলে গেলেন।
বিপুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো খান বাহাদুর শামস ইরানী-বেশি দস্যু বনহুর। আর একটু পরই সে তার নূরীকে দেখতে পাবে। আনন্দে স্ফীত হয়ে উঠলো তার বুক।
একটু পরে ফিরে এলেন আলী সাহেব, সঙ্গে তাঁর শ্যামা।
বনহুরের মন দমে গেলো, তাকিয়ে আছে সে নিশ্চুপ দৃষ্টি মেলে।
বললেন আলী সাহেব–এ আমার ছবির নায়িকা শ্যামা আর ইনি খান বাহাদুর শামস ইরানী। ইনার সম্বন্ধেই তোমাকে বলেছিলাম শ্যামা।
শ্যামা আদাব জানালো।
বনহুরও আদাব জানালো শ্যামাকে।
বললেন আবার আলী সাহেব–খান বাহাদুর, বড় দুঃখিত, শশীকে কিছুতেই আনতে পারলাম না।
শ্যামা ও তার কথায় যোগ দিয়ে বললো–আমরা অনেক করে বোঝালাম কিন্তু কিছুতেই ওকে…
বনহুরের মুখ মুহূর্তে কালো হয়ে উঠলো, গম্ভীর কণ্ঠে বললো সে–কিন্তু শশীকেই যে আমার ছবির নায়িকা করবো ভেবেই আমি…
আলী সাহেব শান্তভাবে বললেন–আমি জানি খান বাহাদুর সাহেব, কিন্তু…
কিন্তু বললে তো চলবে না, যত টাকা সে চায় আমি তাই দিতে রাজি আছি আলী সাহেব।
আলী সাহেব শ্যামার দিকে তাকিয়ে বললেন–শুনলে তো খান বাহাদুর সাহেবের কথা। শ্যামা, তুমিই আমার ভরসা। স্বয়ংবরাতে ওকে ক্যামেরার সম্মুখে আনতে আমি হিমসিম খেয়ে গিয়েছিলাম। এমন কি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ওর ব্যাপারে তুমিই আমাকে সহায়তা করেছিলে বলেই আমি কাজ শেষ করতে পেরেছি। এবারও তুমি ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না।
বনহুর তার নকল দাড়িতে হাত বুলিয়ে মিনতির সুরে বললো–মিস শ্যামারাণী, আপনি যান আর একবার চেষ্টা করে দেখুন। আমার খুব ইচ্ছা, তাকে আজই আমি আমার ছবির জন্য চুক্তিবদ্ধা করতে চাই।
অগত্যা শ্যামা আর আলী সাহেব পুনরায় ভিতর বাড়িতে প্রবেশ করলো।
বনহুর মনে মনে খোদাকে স্মরণ করতে লাগলো, নূরী যদি না আসে তাহলে তার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
মিনিটের পর মিনিট কেটে চললো, প্রায় ঘন্টা কেটে গেলো–বনহুর ক্রমেই অধৈর্য হয়ে পড়েছে। বার বার ব্যাকুল আঁখি মেলে তাকাচ্ছে ওদিকের দরজার মোটা পর্দাটার দিকে। সত্যি কি সে নূরীকে দেখতে পাবে?
বনহুর উঠে পায়চারি শুরু করে দিলো, মনের অস্থিরতা সে কিছুতেই যেন দমিয়ে রাখতে পারছিলো না। মুখমণ্ডলে চঞ্চলতার ছাপ ফুটে উঠেছে।
সামান্য একটু পর্দাটা নড়ে উঠলেই চমকে উঠছিলো–এই বুঝি এলো নূরী, এই বুঝি এলো–
সত্যি এবার পর্দা নড়ে উঠলো, কক্ষে প্রবেশ করলেন আলী সাহেব, শ্যামা আর তার আকাক্ষিতা নূরী।
