পথ নির্জন না হলেও জনসংখ্যা কমে এসেছে অনেক, যানবাহনও হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে শীতের রাত বারোটা বাজলে একেবারে শেষ রাত মনে হয়।
ঈশিকা জুয়েলার্সের লৌহকপাটগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সম্মুখে সামান্য একটু খোলা, মালিক। বেচারী চঞ্চল হয়ে পড়েছেন। ভদ্রলোক এসে নেকলেস ছড়া নিয়ে টাকাগুলো দিয়ে গেলেই দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যাবেন।
অন্যান্য কর্মচারী সবাই চলে গেছে, মালিক স্বয়ং রয়েছেন আর আছে তার একজন বিশিষ্ট কর্মচারী।
এমন সময় বনহুরের গাড়ি এসে থামলো জুয়েলার্সের দোকানের সম্মুখে। এখানে বনহুর নিজের গাড়ির নাম্বার প্লেট সরিয়ে ফেলেছে। বনহুর গাড়ি থেকে নামবার পূর্বে পকেটে রিভলভারের অস্তিত্বটা একবার অনুভব করে নিলো। দোকানে প্রবেশ করতেই মালিক শশব্যস্তে বললেন–এসেছেন, এতোক্ষণ ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।
বনহুর হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা নিচে নিক্ষেপ করে জুতো দিয়ে পিষে ফেললো, তারপর এগিয়ে গেলো সম্মুখে–কাজ সেরে ফিরতে বিলম্ব হয়ে গেলো! কথা বলার ফাঁকে একবার চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখে নিলো বনহুর।
দোকানের মালিক তখন নেকলেসখানা বের করে হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছিলেন। তার কর্মচারী লোকটিও পাশেই দাঁড়িয়েছিলো। দোকানের মধ্যে আর কোনো লোকজন নেই।
বনহুর ক্ষিপ্রহস্তে পকেট থেকে রিভলভারখানা বের করে চেপে ধরলো মালিকের বুকে, তারপর বললো–শীঘ্র ক্যাশের টাকাগুলো দিয়ে দিন। মুহূর্ত বিলম্ব করলে গুলী করবো।
সঙ্গে সঙ্গে দোকানের মালিক এবং তার কর্মচারীর মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠলো। হঠাৎ কিছু বুঝতে পারছেন না, সব যেন কেমন ঘোরালো লাগছে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছেন শুধু ওরা।
বনহুর বললো–চিৎকার করলেই আমি হত্যা করবো, কোনোরকম আপত্তি না করে শীঘ্র ক্যাশের সমস্ত টাকা আমাকে দিয়ে দিন।
এতোক্ষণে হুশ হলো যেন, কথা বললেন দোকানের মালিক–আপনি…আপনি ডাকু?
হাঁ, আমি ডাকুই বটে! বিলম্ব করবেন না, দিন?
ডাকু মালিকের বুকে রিভলভার চেপে ধরেছে, কোনোরকম উচ্চবাক্য বের হলো না তার সাথীর মুখে, সে ভয়-বিহ্বলভাবে তাকাচ্ছে শুধু।
মালিকের মুখ মরার মুখের মত বিবর্ণ হয়ে উঠেছে, কোনো উপায় নেই এর হাত থেকে উদ্ধার পাবার। অগত্যা মালিক তার কর্মচারীকে লৌহসিন্দুক খুলে সমস্ত ক্যাশ টাকা দিয়ে দিতে বললেন।
লোকটা মালিকের কথামত কাজ করলো–সিন্দুক খুলে হাজার হাজার টাকার বান্ডিল এনে রাখলো বনহুরের সম্মুখে।
বনহুর ডান হাতে রিভলভার ঠিক রেখে বাম হাতে টাকার বান্ডিলগুলো কোট আর প্যান্টের পকেটে ভরে নিলো। অত্যন্ত দ্রুতহস্তে কাজ শেষ করে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলো–তারপর আর তাকে কে পায়!
কয়েক মিনিটের মধ্যেই বনহুর গাড়ি নিয়ে ফিরে এলো ফুলা হোটেলে। গাড়ি গ্যারেজে উঠিয়ে রেখে নিজের ক্যাবিনে প্রবেশ করলো। কেশব আর ফুলমিয়া চিন্তিত মুখে বসে আছে তার। প্রতীক্ষায়।
সিঁড়িতে ভারী জুতোর শব্দ শুনেই ওরা খুশিতে উছলে উঠলো, নিশ্চয়ই তাদের বাবু ফিরে এসেছেন।
বনহুর কামরায় প্রবেশ করে কেশব আর ফুলমিয়াকে জেগে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বললো–তোমরা এতো রাত জেগে আছো? ঘুমালেই পারতে।
কেশব বললো–নতুন জায়গা, রাত একটা অবধি বাইরে কাটাবেন,–আর আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাবো?
বলে উঠে ফুলমিয়া–এসব শহরে যা চোর-ডাকুর আড্ডা। কখন কোন্ ডাকুর হাতে পড়ে যাবেন স্যার!
হাসলো বনহুর, বললো–ভয় নেই ফুলমিয়া, ডাকু কি নেবে আমার কাছ থেকে? আমি তো আর টাকা পকেটে নিয়ে ঘুরি না। যাও, তোমরা এবার নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে যাও?
কেশব আর ফুলমিয়া চলে গেলো নিজেদের কামরায়, বনহুর দরজা বন্ধ করে দিলো ভিতর থেকে।
পরদিন খান বাহাদুর শামস ইরানীর বেশে সজ্জিত হয়ে বনহুর গাড়ি নিয়ে রওয়ানা দিলো পরিচালক আলী সাহেবের বাড়ির দিকে। যাবার সময় বেশ কিছু টাকা সে সঙ্গে নিলো।
গ্রীন হাউসে পৌঁছতেই আলী সাহেব সাদর সম্ভাষণ জানালেন, আজ আসলাম আলী চুক্তিবদ্ধ হবেন, শুধু তিনিই নন–শশীকেও চুক্তিবদ্ধ করা হবে শামস ইরানীর ছবির জন্য।
খান বাহাদুর শামস ইরানীকে নিয়ে হলঘরে প্রবেশ করলেন আসলাম আলী।
হলঘরে প্রবেশ করতেই বিস্মিত হলো বনহুর–গত রাতের সেই জুয়েলার্স–চোখেমুখে। বিষাদের ছাপ, রুক্ষ চুল, উদভ্রান্ত চেহারা।
কক্ষমধ্যে প্রবেশ করেই বললেন আলী সাহেব–ইনি আমার বড় ভাই বশীর আলী জুয়েলার্স। কাল রাতে এর চরম সর্বনাশ হয়ে গেছে!
বনহুর আসন গ্রহণ করে বললো–সর্বনাশ হয়েছে! কি সর্বনাশ?
হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলেন বশীর আলী সাহেব–গতরাতে আমার প্রায় লক্ষ টাকা ডাকু হরণ করে নিয়ে গেছে। আমার যথাসর্বস্ব গেছে…আমার যথাসর্বস্ব গেছে…
বনহুর বুঝতে পারলো, এই বশীর আলীই সেই জুয়েলার্স গতরাতে যার যথাসর্বস্ব সে লুট করে নিয়ে এসেছে। বেশ তো, এক ভাই-এর অর্থ আর এক ভাই-এর হাতে চলে আসবে। বনহুর মুখোভাবে বিস্ময় টেনে বললো–পুলিশে খবর দেননি?
হ দিয়েছি, কিন্তু কোনো ফল হবে না, ডাকু সম্পূর্ণ বিদেশী লোক।
কি করে আপনি জানলেন সে বিদেশী? বললো খান বাহাদুর শামস ইরানী-বেশি বনহুর।
বশীর আলী সাহেব গত রাতের সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন, আরও বললেন–ডাকু আজ ভোরের প্লেনেই বোম্বে ত্যাগ করেছে তাতে কোনো ভুল নেই।
