কেশব বললো–Kনচে অপেক্ষা করছেন।
আচ্ছা নিয়ে এসো। হা শোন, আমাকে এভাবে তিনি দেখেননি, কাজেই আলী সাহেবকে আমার নতুনভাবে পরিচয় দেবে, বলবে আমি খান বাহাদুর শামস ইরানীর ছোট ভাই মাসুম ইরানী–একটু চিন্তা করে বললো বনহুর–আচ্ছা তুমি ওকে নিয়ে এসো, যা বলতে হয় আমিই বলবো।
কেশব চলে গেলো।
বনহুর আসন গ্রহণ করলো, ভুল তারই কারণ সে নিজেই তো আলী সাহেবকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলো। হোটেলের ঠিকানাটাও তাকে দিতে ভুল করেনি বনহুর, কিন্তু এক্ষণে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে সব ভুলে গিয়েছিলো সে। ছিঃ ছিঃ এ কেমন ব্যাপার হলো! দ্রুত ছদ্মবেশ ধারণ সম্ভব নয়। যাক, কোনো রকমে ব্যাপারটা সহজ করে নিতে হবে।
বনহুর সিগারেট ধরালো।
এমন সময় কেশবসহ আসলাম আলী প্রবেশ করলেন কামরায়।
বনহুর যেন আলী সাহেবকে কোনদিন দেখেনি অবশ্য তার পরিচয় জানে, এমনি ভাব মুখে এনে উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে বললো–বসুন আলী সাহেব! আমি খান বাহাদুর শামস ইরানীর ছোট ভাই মাসুম ইরানী। ভাইজানকে বিশেষ জরুরি কাজে বাইরে যেতে হয়েছে তিনি আপনার সম্বন্ধে আমাকে সব বলে গেছেন।
আলী সাহেব আসন গ্রহণ করলেন, বিশেষ করে মাসুম ইরানীকে দেখে এবং তার ব্যবহারে অত্যন্ত মুগ্ধ হলেন তিনি। ইতিপূর্বে এমন সুদর্শন ব্যক্তি তাঁর নজরে কমই এসেছে, কিছুক্ষণ তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন, সহসা কোনো কথা তিনি বলতে পারলেন না।
বনহুর হেসে বললো–ভাইজান না থাকলেও আপনি আমাকে কোনোরকম সঙ্কোচ বোধ করবেন না যেন।
আলী সাহেবের সম্বিৎ ফিরে এলো, এতোক্ষণ ভাবছিলেন–এমনি একটি যুবককে তিনি যদি চলচ্চিত্র জগতে নায়ক হিসাবে পেতেন তাহলে সত্যিই সে ছবি বাজারে হিট না করে যেতো না। মাসুম ইরানীর কথায় তর চিন্তাধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, বলেন আলী সাহেব–না না, সঙ্কোচের কি আছে। খান বাহাদুর সাহেব যখন বিশেষ কারণে বাইরে গেছেন তখন পরে না হয় দেখা করবো আর একবার।
আচ্ছা তা মন্দ নয়। তবে এখন আপনি আমাদের অতিথি, আপনাকে তো ছেড়ে দিতে পারি না। কথাটা বলে বনহুর কলিং বেলে চাপ দেয়।
সঙ্গে সঙ্গে ফুলাগুর বয় প্রবেশ করে কুর্নিশ জানায়–স্যার।
বনহুর ফুলাগু হোটেলের বিশিষ্ট খাবারের জন্য অর্ডার দেয়।
আলী সাহেব অবশ্য অমত করেন কিন্তু বনহুর সে কথায় কান দেয়না।
অল্পক্ষণেই স্তূপাকারে খাবারে টেবিল পরিপূর্ণ হলো। নানা রকম আপত্তি সত্ত্বেও আসলাম আলীকে খেতে হলো বেশ কিছুটা। কেশব আর ফুলমিয়াকেও এ টেবিলে যোগ দিতে হলো। এ কথা-সে কথার পর আলী সাহেব বিদায় গ্রহণ করলেন।
বিদায়কালে বনহুর বললো–ভাইজান এলেই তাকে আপনার কথা বলবো এবং তিনি দরকার মনে করলেই যাবেন আপনার ওখানে।
আসলাম আলী খুশিমনে তখন বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
বনহুরের মাথার মধ্যে আবার চিন্তাজাল ছড়িয়ে পড়লো। সে ভাঁজ করা পত্রিকাখানা মেলে নিয়ে বসলো। কতক্ষণ মনোযোগ সহকারে পত্রিকাখানায় নজর বুলিয়ে নিয়ে উঠে পড়লো, হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো–এখন রাত্রি আটটা পঁচিশ।
বনহুর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো, একটা জুয়েলার্সের দোকানের সম্মুখে গাড়ি রেখে ভিতরে প্রবেশ করলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোকের সঙ্গে একটি তরুণী প্রবেশ করলো দোকানটার মধ্যে। তরুণীর হাতে ভ্যানিটী ব্যাগ।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক বোম্বাই-এর অধিবাসী তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ তাদের পোশাক পরিচ্ছদেই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক কন্যার ইচ্ছামত কতকগুলো মূল্যবান অলঙ্কার ক্রয় করলেন।
বনহুর ততক্ষণে একটি নেকলেস হার নিয়ে মাপযোক করছিলো এবং দোকানের বিক্রির আয় ব্যাপারে লক্ষ্য করছিলো। তরুণী এবং প্রৌঢ় ভদ্রলোক প্রায় দশ হাজার টাকা মূল্যের অলঙ্কার ক্রয় করে বিদায় গ্রহণ করলো। সেই মুহূর্তে অন্যান্য গ্রাহকও ঐ রকম মূল্যের অলঙ্কার খরিদ করছিলো।
বনহুর একটা নেকলেস হার পছন্দ করে ফেললো কিন্তু নেকলেসের ভিতরে বসানো একটি পাথর পাল্টে নেওয়ার জন্য সে অর্ডার দিয়ে পরে আসবে বলে গেলো। নেকলেস-খানার মূল্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় গ্রহণ করলো যাওয়ার সময় বলে গেলো যতক্ষণ সে ফিরে না আসে ততক্ষণ যেন দোকান খোলা রাখে কারণ সে ভোরের প্লেনেই বোম্বে ত্যাগ করবে। অন্যান্য কাজ ইতিমধ্যে সেরে নিয়ে এসে পড়বে, তবে ফিরতে একটু বিলম্ব হতে পারে।
বনহুর গাড়িতে বসে সিগারেট ধরালো। বোম্বে শহরে সবচেয়ে নামকরা জুয়েলার্স না হলেও একেবারে ছোটখাটো দোকান নয়। এ দোকানের বিক্রি দৈনিক প্রায় এক লক্ষের কম নয়। বনহুর আর একবার দোকানের সাইন বোর্ডের লেখাগুলো পড়ে নিলো। ইংলিশে বড় বড় অক্ষরে লেখা– ঈশিকা জুয়েলার্স, অক্ষরগুলো রঙিন টিউব বাল্বে জ্বলছে আর নিভছে। সাইন বোর্ডের চারপাশে নানা ধরনের রঙিন বাল্ব। সুন্দর ঝলমল করছে দোকানখানা। বনহুর গাড়িতে স্টার্ট দিলো–এখন দশটা বাজতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। ফিরে আসবে বনহুর বারোটার পূর্বে নয়–শুধু নেকলেস নিতেই সে আসবে না চাই, তার প্রচুর অর্থ। এভাবে অর্থ নেওয়ার মোটেই ইচ্ছা ছিলো না তার, কিন্তু না নিলেই যে নয়।
*
রাত বারোটা বেজে গেলো, ঈশিকা জুয়েলার্সের মালিক উদ্বিগ্নভাবে প্রতীক্ষা করছেন, ভদ্রলোক এতোক্ষণ আসছেন না কেন! তার দোকানের আশেপাশের দোকানগুলো প্রায় সবগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। সোনার দোকান-বেশি রাত অবধি খোলা রাখা নিরাপদ নয়, এ কারণেই এ দোকানগুলো সকাল সকাল বন্ধ হয়ে যায়। তবে রাত বারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে কোনো কোনোটা।
